যদি সত্যিই তুমি হামিদার কষ্ট লাঘব করার ভাবনা থেকে এখানে এসে থাকো তাহলে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। সে পুনরায় চুপ করে থাকে তারপরে নিজের গর্ব গলধঃকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। আমি যেমন বলেছি যে আমরা খোলাখুলি আলোচনা করবো সেই বাস্তবতা মেনে বলছি, আকবরকে হারাবার পর থেকে মানসিক শান্তি বা সত্যিকারের বিশ্রাম এই দুটি জিনিষ হামিদা ভুলেই গেছে…কিন্তু তুমি যখন সাহায্যের কথা বলেছে, তখন আসলে কি বোঝাতে চেয়েছো? কোনো ধরনের সফলতা ছাড়াই আমি আজ প্রায় চার মাসাধিক কাল ধরে দূর্গপ্রাসাদ অবরোধ করে রেখেছি। আমি আমার সেনাবাহিনীর সহায়তায় যা করতে পারিনি সেখানে তুমি একাকী কি করতে পারবে বলে মনে করো?
আমি কামরানের আস্থা অর্জন করে দূর্গপ্রাসাদে প্রবেশ করতে পারি। একবার ভেতরে প্রবেশ করতে পারলে আমি আকবরকে উদ্ধারের একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারবো।
কিভাবে? কামরান তোমাকে কেন আমার চেয়ে বেশী বিশ্বাস করবে?
আমি তাঁর আস্থা অর্জন করতে পারবো, কারণ আমি তাকে ভালো করে চিনি কারণ আমি তার দুর্বলতা সম্বন্ধে অবগত রয়েছি। সে আপনাকে ঘৃণা করে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে সেই আমাদের পরিবারের স্বাভাবিক প্রধান। নিজের সম্বন্ধে তাঁর আত্মগর্ব, তাঁর আত্মশ্লাঘা ব্যবহার করে আমি তাকে বোঝাব যে আমার বোধোদয় ঘটেছে এবং আমি পুনরায় তার মিত্র হতে আগ্রহী…আপনার বিরুদ্ধে বাবরের অন্যান্য পুত্রদের তার অধীনে একত্রিত করতে চাই। কিন্তু এসব নির্ভর করছে একটা বিভ্রম সৃষ্টি উপরে…
বলতে থাকো।
আপনাকে অবশ্যই প্রথমে অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে হবে যেন মনে হয় আপনি আপনার সৈন্যবাহিনী নিয়ে কাবুল ত্যাগ করছেন। পাহাড় থেকে আমার নিজের লোকদের নিয়ে আসবার জন্য তাহলে আমার সামনে একটা পথ খুলে যায় এবং কামরানকে আমি তাহলে মৈত্রীর প্রস্তাব করতে পারি…
তুমি বলতে চাইছো এত সপ্তাহ পরে আমি অবরোধ তুলে নেব, যখন আমি কামরানের উপরে অবরোধ আরও কঠোর করার কথা ভাবছি।
আপনাকে সেটাই করতে হবে। কাবুলের আশেপাশে আপনি শিবির স্থাপন করে অবস্থান করলে আমার পরিকল্পনা সফল হবে না। কামরানকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আপনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
তুমি বড্ডবেশী দাবী করছো। তোমার এতো সব ভালো কথার পরেও আমার বিশ্বাস তুমি ইতিমধ্যেই কামরানের সাথে সন্ধি করেছে এবং সেই তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে আমার সাথে চালাকির চেষ্টা করতে।
আমি আমাদের মরহুম আব্বাজানের স্মৃতির কসম করে বলছি এর মাঝে কোনো ধরনের ছলনা নেই… হুমায়ুনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিঃশঙ্কভাবে হিন্দালের তামাটে চোখ ফিরিয়ে দেয়।
বেশ মানলাম- ধরো আমি তোমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলাম, তারপরে তাহলে কি ঘটবে?
কামরানের মনে ধারণা জন্মাবে যে সে আপনাকে পরাস্ত করেছে। নিজের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সে তখন আমার গল্প আরো সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকবে- যে স্বয়ং আপনার পক্ষেও যখন তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি, আমি তাকে আমাদের পিতার প্রকৃত উত্তরাধিকারি হিসাবে মেনে নিতে এবং তার অধীনস্ত থাকতে প্রস্তুত আছি।
তোমার আসলেও মনে হয় সে তোমার কথা বিশ্বাস করবে?
নিজেকে নিয়ে তাঁর আত্মগর্বকে মোটেই ছোট করে দেখবেন না। আর তাছাড়া, সে কেন আমাকে অবিশ্বাস করবে? আমি কেন পাহাড়ে পলাতক পাহাড়ী জীবনের বদলে মোগল যুবরাজের বিচ্ছুরিত গৌরবের একটা অংশের অধিকারী হতে চাইব না যার সৌভাগ্যের সূর্য উদীয়মান যখন আপনি ভাগ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আর আমার সাথে আগত অতিরিক্ত লোকদের সাহায্য লাভ করে সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। তারপরে একবার দৃর্গপ্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারলে আমি আকবরকে কাবুল থেকে গোপনে বের করে আনবার একটা পথ ঠিকই খুঁজে পাবো…কিন্তু এজন্য একটু সময় প্রয়োজন। আমাকে যে কেবল কামরানের আস্থাই অর্জন করতে হবে তা নয় আমাকে সেই সাথে উপযুক্ত সুযোগও খুঁজে পেতে হবে…
কামরানের আম্মাজান গুলরুখের কি খবর? সে তাঁর সন্তানের মতোই ধূর্ত সম্ভবত তাঁর সন্তানের চেয়েও ধূর্ততর। সে যদি কামরানের সাথে থাকে তাহলে তাঁকে সহজে প্রতারিত করতে পারবে না।
হিন্দালকে বিস্মিত দেখায়। গুলরুখ মারা গিয়েছে। কাবুল থেকে কান্দাহারে আগমনের সময় তাঁকে বহনকারী গরুর গাড়িটি দরীতে পড়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়ত খবরটা শুনেছেন।
না। হুমায়ুন ধাক্কাটা হমজ করে। নিজের সন্তানের উচ্চাকাঙ্খ চরিতার্থ করতে যে মহিলা তাঁকে আফিম আর সুরার নেশায় আসক্ত করেছিল তার জন্য সে সামান্যই দুঃখবোধ করে। তারপরেও তুমি নিজেকে ভীষণ বিপদের সম্মুখীন করতে চাইছে। আচ্ছা ধরে নিলাম তোমার উদ্দেশ্য সফল হল, তুমি বিনিময়ে আমার কাছে কি আশা কর?
কিছু না। আমি যা কামনা করতাম আপনি তাঁর পুরোটুকুই ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং আপনার পক্ষে সেটা ফিরিয়ে দেয়া অসম্ভব…
দুই ভাই মুহূর্তের জন্য নিরবে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন যখন সে হিন্দালকে আবার সামনে পেয়েছে, হুমায়ুন অনুধাবন করে নিজের অপরাধবোধ সম্বন্ধে, তাকে আহত করার কারণে নিজের খেদ সম্বন্ধে কতকিছু সে তাকে বলতে চায়। কিন্তু তার সৎ-ভাই তার কথা বিশ্বাস করবে না এবং তাছাড়া কোনভাবেই আর বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা সম্ভব না হামিদাকে হুমায়ুন এতো প্রবল আবেগ দিয়ে ভালোবাসে অন্য কোনো রমণীর জন্য যা সে কখনও অনুভব করেনি। সে যদি আবারও সুযোগ পায় তাহলে হামিদাকে পাবার জন্য তার সংকল্প আগের মতোই নির্মম হবে।
