কি ব্যাপার? তার পাশে শুয়ে থাকা হামিদা ঘুম ভরা চোখ খুলে জানতে চায়।
আধঘন্টা আগে একজন আগত শিবিরে প্রবেশে চেষ্টা করে। প্রহরীরা তাঁকে থামিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে, সে নিজের পরিচয় না দিয়ে তাঁকে জাহিদ বেগের কাছে নিয়ে যেতে বলে। জাহিদ বেগ তার সাথে কথা বলার পরে, আপনি সুলতানার সাথে জেনানাদের তাবুতে অবস্থান করছেন জানা থাকায়, তিনি আমাকে ডেকে পাঠান এবং আমাকে আদেশ দেন আপনাকে ডেকে নিয়ে যেতে।
এতো তাড়াহুড়ো করার কারণ? সকাল পর্যন্ত কি সে অপেক্ষা করতে পারতো না?
জাহিদ বেগ আমাকে কিছুই বলেনি…কেবল বলতে বলেছে যে আপনি যেন এখনই সেখানে দর্শন দেন…
বেশ, চলো দেখা যায়। হুমায়ুন শয্যা ত্যাগ করে এবং ভেড়ার চামড়ার আস্তরন দেয়া একটা লম্বা আলখাল্লা দেহের চারপাশে ভালো করে মুড়ে নিয়ে তাবুর বাইরে হিমশীতল বাতাসে বের হয়ে আসে। লোকটা কে হতে পারে? কামরান সম্ভবত কোনো বার্তাবাহক প্রেরণ করেছে কিন্তু এভোরাতে সেটা সে কেন করতে যাবে এটা অবশ্য একটা রহস্য। জ্বলন্ত কয়লার একটা ধাতবদানি ব্রাজিয়ার যাকে বলে সেখান থেকে নির্গত আলোয় সে জাহিদ বেগকে লম্বা, চওড়া কাঁধের এক লোকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটা পরণে গাঢ় রঙের আলখাল্লা যার মস্ত কাবরণী সামনের দিকে টেনে দিয়ে সে নিজের মুখটা আড়াল করে রেখেছে। কামরানের প্রেরিত কোনো গুপ্তঘাতক কি লোকটা… কিংবা পারস্যের শাহের অনুগত ঘাতক?
জাহিদ বেগ লোকটা কি সশস্ত্র?
না, সুলতান। লোকটা তাকে তল্লাশি করার সময় আমাদের সহযোগিতাই করেছে।
হুমায়ুন লোকটার কাছাকাছি এগিয়ে যেতে, লোকটা ধীরে, ইচ্ছাকৃতভাবে মস্ত কাবরনী পিছনের দিকে সরিয়ে দেয়। ব্রাজিয়ারের আবছা আলোয় হুমায়ুন সাথে সাথে চিনতে পারে যে লোকটা হিন্দাল, চওড়া মুখে ঘন দাড়ির জঙ্গল কিন্তু তার সৎ-ভাইকে এখনও তার চিনতে ভুল হয় না। এক মুহূর্তের জন্য, দুই ভাই নির্নিমেষ ভাবে নিরবে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতোকিছু ঘটনা ঘটে যাবার পরেও, হুমায়ুনের মনে সহসা হিন্দালের স্মৃতি পুনরায় জাগরুক হয়ে উঠে- মাহামের কোলে শিশু হিন্দাল, কিভাবে ছোট ভাইকে সে প্রথমবারের মতো ঘোড়ায় চড়তে শিখিয়েছিল, প্রথমবারের মতো খরগোশ শিকার করে হিন্দালের সেই উল্লসিত অভিব্যক্তি; তারপরে পরবর্তী সময়ের স্মৃতি হিন্দালের বিদ্রোহের সময় তার মুখের অভিব্যক্তি, মালদেব আর মির্জা হুসেনের কাছে নির্বাসিত হুমায়ুনের প্রথমবার যাত্রার সময় কিভাবে বিশ্বস্ত তার সাথে সে হুমায়ুনের সঙ্গী হয়েছিল; তারপরে সবকিছু ছাপিয়ে যায় তাঁদের শেষবার দেখা হবার স্মৃতি হামিদার কারণে কিভাবে তারা একে অপরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং কিভাবে হুমায়ুনের পায়ের কাছে থুথু ফেলে রক্তাক্ত, চোখে মুখে কালশিরে পড়া কিন্তু তখনও উদ্ধত হিন্দাল ঘোড়া নিয়ে চলে গিয়েছিল।
আমাদের একটু একা থাকতে দাও, আর দেখবে কেউ যেন আমাদের বিরক্ত না করে। জাহিদ বেগ অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত হুমায়ুন অপেক্ষা করে, পুরোটা সময় সে তীক্ষ্ণ চোখে হিন্দালের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপরে জিজ্ঞেস করে, এখানে তুমি কেন এসেছো? এবং এভাবে আমার সামনে নিজেকে কেন একাকী সমর্পন করেছো?
গত কয়েকমাস যাবত কামরানের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার পরে কাবুলের উত্তরপূর্বে জাগিশের উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে আমার শেষ বিশ্বস্ত বন্ধুদের আশ্রয়ে ছিলাম আমি। কিন্তু সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও খবর পৌঁছে যায়। কামরান কি করেছে জানতে পারি- আপনার কামানগুলো যখন কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের প্রাচীরে গোলাবর্ষণ করছিল তখন সে কিভাবে আকবরকে এর দূর্গপ্রাকারে উন্মুক্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। তার কীর্তিকলাপ দেখে আমি শিউরে উঠি- সবকিছুই আমাদের যোদ্ধার রীতিনীতির প্রতি একটা চরম অবমাননা আর আমাদের পরিবারের সম্মানে কলঙ্ক লেপন করেছে।
চমৎকার অনুভূতি, কিন্তু তুমি এখনও আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি। আমরা পরস্পরের সাথে এসো খোলাখুলি আলোচনা করি। তুমি কেন এখানে এসেছে?
আকবরকে উদ্ধারে সাহায্য করতে।
হুমায়ুন এতোটাই চমকে যায় যে কিছুক্ষণের জন্য সে বাকরুদ্ধ হয়ে ব্রাজিয়ারের উপরে শান্তভাবে নিজের বিশাল দুটো হাতে ওম পোহাতে থাকা তার সৎ-ভাইয়ের অবয়বের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
আমি জানি আপনি কি ভাবছেন। নিরবতা ভঙ্গ করে হিন্দাল কথা বলে উঠে। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করছেন যে কেন আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাইবো। ব্যাপারটা সহজ। রক্তে বাঁধন যা আমৃত্যু আমরা বহন করবো তারপরেও আপনার আর আমার ভিতরে কোনোমতেই সমঝোতা হওয়া অসম্ভব। এটা অপরিবর্তনীয়। আজ রাতে আমি হামিদা কেবলমাত্র হামিদার কথা ভেবেই এসেছি…তার কাছে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে তার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে…সে নিশ্চয়ই অসম্ভব মনোকষ্টে…।
হুমায়ুন আড়ষ্টভঙ্গিতে দেহের ভর বদলায়, হামিদা প্রসঙ্গে হিন্দালের সাথে আলোচনা করতেই তাঁর অস্বস্তিবোধ হয় এবং তার চেয়েও বড় কথা হামিদার সন্তানকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে কিভাবে সে হামিদাকে আশাহত করেছে, সেসব নিয়ে তো সে হিন্দালের সাথে আরও কথা বলতে চায় না।
