অনেকসময়, অবশ্য, যুদ্ধযাত্রার মতোই ধৈর্য ধারণ করতেও আত্মসংযমের পরিচয় দিতে হয়। দূর্গপ্রাকারে নিজের শিশু সন্তানের স্মৃতিই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দূর্গপ্রাসাদ আক্রমণ করা থেকে হুমায়ুনকে বিরত রেখেছে। নিজের সন্তানের জন্য তার এই অনুভূতি কামরানের ধাপ্পাবাজি বন্ধ করতে তাঁর অনীহা- রুস্তম বেগ সম্ভবত তাঁর দূর্বলতা ভেবে বসেছে। বেশ, তবে তাই হোক। একাকী লড়াই চালিয়ে যেতে- এইমাত্র রুস্তম বেগকে সে ঠিক যা বলেছে- যদি সে বাধ্য হয়, সে তাই করবে।
তাবুর পর্দার ফাঁক দিয়ে যা তখনও আধখোলা অবস্থায় ঝুলছিল, হুমায়ুন বাইরে তাকিয়ে দেখে শীতের আলোয় খুব দ্রুত অন্ধকার মিশে যায়। সে শীঘ্রই তার সেনাপতিদের ডেকে পাঠাবে কি ঘটেছে তাঁদের বলতে। পার্সীদের বিদায় নিতে দেখলে বোধহয় তারাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। পারস্য থেকে হুমায়ুনের নেতৃত্বে তার বাহিনী অভিযান শুরু করার প্রথমদিকে যে সৌহার্দ্য বিদ্যমান ছিল কাবুলের আশেপাশের এলাকায় বসবাসরত গোত্রের লোকজন বর্ধিত সংখ্যায় তাঁর দলে যোগ দিতে শুরু করলে সেটা ততই হ্রাস পেতে শুরু করেছিল। তিনদিন আগেই, পার্সী আর তাঁর লোকদের ভিতরে সংঘটিত এক সহিংতার কথা জাহিদ বেগ তাঁকে জানিয়েছিল। এক তাজিক গোত্রপতি, কয়েকজন পার্সি তাঁর রসদ চুরি করেছে বলে ধারণা করে, তাদের শিয়া সারমেয় বলে গালি দেয়। বচসার এক পর্যায়ে তাজিকদের একজন মুখে চাকুর পোচ খায় আর পার্সীদের একজনের দেহের একপাশ আগুনে মারাত্মকভাবে ঝলসে যায়, বেচারাকে জ্বলন্ত কয়লার পাত্রের উপর ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। এটা সম্ভবত উভয়পক্ষের জন্যই ভালো হল যে খিজিল-বাঁশ রা- লাল-টুপির দল হুমায়ুনের লোকেরা পার্সীদের শিয়া ধর্মমত ঘোষণা করতে তাঁদের মাথার চোঙাকৃতি টুপি আর এর পেছনদিকে ঝুলন্ত টকটকে লাল কাপড়ের ফালির জন্য তাঁদের এই নাম দিয়েছে- বিদায় নিচ্ছে। সে অবিলম্বে শিয়া ধর্মমতের প্রতি তাঁর স্মারক আনুগত্যের বিষয়টাও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করবে। তার লোকেরা এটা দেখেও উদ্দীপিত হবে।
হুমায়ুনের নিয়ন্ত্রক তাবুর বাইরে থেকে গলার স্বর ভেসে আসতে তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। তারপরেই তাবুর পর্দা সরিয়ে দিয়ে জওহর মাথা নীচু করে ভেতরে প্রবেশ করে। সুলতান, বৈরাম খান আপনার সাথে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।
চমৎকার!
বৈরাম খান তাবুর ভিতরে আসতে হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে তার গলার ক্ষতস্থানটা এখনও গোলাপি আর জায়গাটা কুঞ্চিত হয়ে আছে এবং নতুনের মতো দগদগ করছে। লোকটা একজন পোড় খাওয়া যোদ্ধা আর চতুর সমরবিদ। রুস্তম বেগ পার্সী সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হলেও, প্রায় শুরুর দিন থেকেই হুমায়ুনের মনে হয়েছে বৈরাম খানই পার্সীদের আসল নেতা আর সেনাপতি। তার খারাপই লাগছে এমন একজন যোদ্ধাকে হারাতে হবে বলে।
বৈরাম খান, আপনি কি কিছু বলতে চান?
বৈরাম খান স্বভাব বিরুদ্ধ ভঙ্গিতে ইতস্তত করে, যেন সে যা বলতে চায় সেটা বলাটা মোটেই সহজ কোনো কাজ নয়। তারপরে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে নীল চোখে হুমায়ুনের দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে থেকে, কথা শুরু করে। রুস্তম বেগ আপনাকে কি বলেছে আমি সেটা জানি…আমি দুঃখিত।
আপনাকে এজন্য কেউ দোষ দেবে না। আমি যেজন্য দুঃখিত সেটা হল যে আপনার সহযোগিতা থেকে আমি বঞ্চিত হব।
সুলতান, বৈরাম খান তাঁর সহজাত ভদ্রতার বিপরীতে কথা বলে উঠে, আমার কথাটা আগে একটু শোনেন। কাবুলে আসবার পথে গিরিকরে আমরা যখন অতর্কিত হামলার সম্মুখীন হয়েছিলাম তখন আপনি আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। আমি সারা জীবনে যতবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি কোনোবারই মৃত্যুকে এত কাছে থেকে অনুভব করিনি…আমি মানসপটে ততক্ষণে দেখে ফেলেছি সেই নির্জন প্রান্তরে আমার কবর খোঁড়া হচ্ছে। কিন্তু আপনি দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয়ে আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমাকে আপনার এই ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ দেবার জন্য আমি অনুরোধ করছি।
বৈরাম খান, তুমি ঋণী নও। একজন মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সহযোদ্ধা বন্ধুর প্রাণসংশয় হয়েছে দেখতে পেলে সে যা করতো আমি ঠিক সেই কাজটাই করেছি।
আমি রুস্তম বেগের সাথে পারস্যে ফিরে যাবার চেয়ে আপনার সাথেই থাকেতে বেশী আগ্রহী আর আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে আপনার এই অভিযানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আপনি কি আমাকে আপনার সেনাবাহিনীতে একটা সুযোগ দেবেন?
হুমায়ুন কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ায় এবং সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বৈরাম খানের দুবাহু আকড়ে ধরে তার চোখের দিকে তাকায়। সমগ্র পার্সি সেনাবাহিনীতে একজনও মানুষ, নেই যাকে আমি আমার পাশে লড়াই করার জন্য চাই কেবল…
*
সুলতান…সুলতান…উঠুন। তার কাঁধ ধরে কেউ একজন আলতো করে নাড়া দিচ্ছে… নাকি পুরোটাই কেবল একটা স্বপ্ন? হুমায়ুন তার পাশেই শুয়ে থাকা তন্দ্রাচ্ছন্ন হামিদার দেহের কোমল উষ্ণতার আরও কাছাকাছি নিজেকে সরিয়ে আনে। কিন্তু ঝাঁকিটা ক্রমেই আরো প্রবল হয়ে উঠছে। হুমায়ুন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে হাতে তেলের একটা প্রদীপ নিয়ে জয়নাব তাঁদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দপদপ করতে থাকার আলোর প্রেক্ষাপটে, সে দেখে জয়নবকে উত্তেজিত দেখাচ্ছে, তার মুখের জন্মচিহ্নটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী গাঢ় মনে হয়।
