বৈরাম খান, অবিলম্বে গোলাবর্ষণ বন্ধ করতে বলেন। আমি আমার ছেলের জীবন নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না…জাহিদ বেগ, দূর্গপ্রাসাদ আর শহরের চারপাশে অবরোধ বজায় রাখতে পর্যাপ্ত সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেন কিন্তু আক্রমণকারী বাহিনীকে এই মুহূতে শিবিরে ফিরে যেতে বলেন।
তূর্যধ্বনি আর দামামার শব্দে তার সৈন্যরা তুষারাবৃত সমভূমির উপর দিয়ে নিজেদের তাবুর দিকে ফিরে যেতে আরম্ভ করতে, হুমায়ুন ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং কারো সাথে আর কোনো কথা না বলে নিজের দেহরক্ষী কিংবা সেনাপতি কারো সাথে কোনো কথা না বলে- সে মন্থর গতিতে তাবুর দিকে ফিরে যেতে থাকে। সূর্য এখন যদিও মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে, সরু ধুসর আলোরশ্মি আকাশ আলোকিত করতে শুরু করেছে, তার নিজের পৃথিবী এমন অন্ধকারের ভিতরে হারিয়ে গিয়েছে বলে তার আগে কখনও মনে হয়নি। সে সফলভাবে কিভাবে এই অভিযানের পরিসমাপ্তি টানবে। সে ফিরে গিয়ে হামিদাকে কি বলবে?
৩.৪ মধ্যরাতে অতিথি
১৮. মধ্যরাতে অতিথি
রুস্তম বেগ, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। বিদায় নেবার প্রসঙ্গ আপনি এখন কিভাবে বলতে পারলেন?
সুলতান, পৃথিবীর অধিশ্বর, আমার আত্মীয়-সম্পর্কিত ভাই শাহ তামাস্প, কাঝভিন থেকে রওয়ানা দেবার আগে আমাকে সুনির্দিষ্ট আদেশ দিয়েছিলেন যে যদি আপনার অভিযানের সাফল্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে- যদি ছয়মাস পরে আপনার সাফল্যের ব্যাপারে আমার মনে সন্দেহের জন্ম হয়। আমি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাহলে যেন স্বদেশে ফিরে যাই। আমি যথেষ্ট ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছি কিন্তু এখন সেই সময় সমাগত। আমরা পারস্য থেকে যাত্রা শুরু করার পরে ছয়মাস অতিক্রান্ত হয়েছে… দুই মাস হতে চলেছে আমরা বোমাবর্ষণ বন্ধ করে এই নিষ্ফল কাবুল অবরোধ আরম্ভ করেছি। তীব্র শীত আর বিরূপ পরিবেশে আমার লোকেরা কষ্ট পাচ্ছে, আর তারচেয়েও বড় কথা এর ফলে কি লাভ হবে? দূর্গপ্রাসাদ আর শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণ রসদ মজুদ রয়েছে প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপর থেকে আপনার ভাইয়ের সৈন্যরাই বরং আমাদের উত্যক্ত করে, আমাদের খাবারের লোভ দেখায়…সুলতান আমি দুঃখিত কিন্তু আমি নিরূপায়। শাহ্ তাঁর বাহিনীকে অন্য কোথায় কার্যকরভাবে মোতায়েন করার পথ নিশ্চয় খুঁজে পাবেন… রুস্তম বেগ তালু বাইরের দিকে রেখে হাত উপরে তুলে যেন তার নিয়ন্ত্রণের অতীত এহেন পরিস্থিতির উদ্ভাবন হওয়াতে সে নিজে ব্যক্তিগতভাবে অনুতপ্ত। কিন্তু হুমায়ুনের সাথে একান্তে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করে গত আধঘন্টা ধরে বরাবরের ন্যায় একই রকম বিনয়ের সাথে সে সবকিছু এগিয়ে গিয়েছে।
বিস্মিত আর হতবাক হুমায়ুন অবশ্য এখন দাঁতে দাঁত চেপে নিজের চরাচরগ্রাসী ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করে। আমি আপনাকে যেমন বলেছি, শাহ তাসাম্প সময়সীমা বা সময়সূচী সম্পর্কে আমাকে কিছুই বলেননি। তিনি নিজেকে আমার ভাই হিসাবে উল্লেখ করে আমার পুরুষানুক্রমিক স্বদেশ আর সেই সাথে হিন্দুস্তানের সিংহাসন পুনরুদ্ধারে আমাকে সাহায্য করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন…তিনি ভালো করেই জানতেন কাজটা সময়সাপেক্ষ। আমরা বিষয়টা একত্রে আলোচনা করেছি…
সুলতান আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি যদি আমার সৈন্যদের নিয়ে পারস্যে ফিরে না যাই তাহলে আমি আমার আদেশ অমান্য করবো। যা আমি করতে পারি না।
বেশ, আপনি যখন কাঝভিন পৌঁছাবেন তখন আপনার আত্মীয় সম্পর্কিত ভাইকে এটা বলবেন- যে আমি আমার লড়াই অব্যাহত রাখবো এবং যত সময়ই প্রয়োজন হোক আমি আমার শত্রুদের এমনভাবে পরাস্ত করবো তারা আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এবং আগ্রায় আমার সিংহাসনে যখন আমি পুনরায় অধিষ্ঠিত হব আমি এটা জেনে সন্তুষ্ট থাকবো যে এই অসামান্য গৌরবের অধিকারী মোগলরা এবং একমাত্র মোগলরা।
রুস্তম বেগের মুখাবয়বে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় না।
আপনি কখন বিদায় নিতে চান?
তিন কি চারদিন সুলতান আমার লোকেরা যত শীঘি যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে পারবে। আমি কামানগুলো আপনার কাছে রেখে যাব। কামানগুলো শাহ্ আপনাকে শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ দিয়েছেন।
রুস্তম বেগ যদি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা আশা করে তবে তাকে আশাহত হতে হবে, সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হয়েছে এটা বোঝাতে হুমায়ুন বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াবার সময় ভাবে। আপনি আর আপনার লোকেরা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে যেতে পারবেন বলেই আমি আশা করি। শাহকে বলবেন আমাকে তার দেয়া সহযোগিতার জন্য তাঁর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ এবং একটাই কেবল খেদ যে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সেটা বলবৎ ছিল।
সুলতান, আপনার বার্তা আমি তাঁকে পৌঁছে দেব। আর আশা করি আপনার প্রতি সৌভাগ্যের দেবী পুনরায় একদিন প্রসন্ন হবেন।
রুস্তম বেগ বিদায় নিয়ে চলে যাবার পরে, হুমায়ুন কিছুক্ষণ একাকী বসে থাকে। কোনো ধরনের আগাম হুশিয়ারি না দিয়েই পার্সী সেনাপতি নিজের অভিপ্রায় ঘোষণা করেছেন। এই বিপর্যয় মোকাবেলা করতে এবং এখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে চিন্তাভাবনার জন্য তার সময় প্রয়োজন। একটাই আশার কথা তার নিজের লোকদের সংখ্যা এখন পার্সী সৈন্যদের প্রায় সমান এবং তারা যেখানে লড়াই করছে সেটা তাদের নিজেদের এলাকা। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাদের কষ্টসহিষ্ণু করে তুলেছে এবং সমভূমিতে অরক্ষিত অবস্থার মতো অস্থায়ী শিবিরকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে যে তুষারপাত, বরফ আর তীব্র বায়ুপ্রবাহ সেসব কিছুই তাঁদের হতোদম করতে পারবে না। পার্সী সৈন্যদের বিদায় নেবার মতো হুমায়ুনকে যা প্রায় একই রকমের মনঃপীড়া দেয়, সেটা হল তার সাফল্য সম্বন্ধে রুস্তম বেগের হতাশাজনক মূল্যায়ন। অবরোধ শুরু করার প্রথম দিন থেকেই হুমায়ুন একদিনের জন্যও নিজেকে আশাহত হতে দেয়নি, প্রতিদিনই শত্রুকে পরাভূত করার পথ খুঁজে পাবার আশা করেছে… কামরানের অবস্থানের কোনো দূর্বলতা সনাক্ত করতে পারবে। তেমন কোনো কাঙ্খিত সাফল্যের দেখা না পেলেও, তাকে কেবল ধৈর্য ধারণ করতে হবে- কামরানের রসদ অনিবার্যভাবে একসময় শেষ হবেই।
