*
সুলতান, গোলন্দাজেরা দূর্গপ্রাসাদের প্রাকারে একটা ফাটল সৃষ্টি করেছে। হামিদার পাশে শুয়ে থাকা অবস্থায় জয়নব ঝাঁকি দিয়ে হুমায়ুনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে। বৈরাম খান বাইরে অপেক্ষা করছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠার মাঝেই হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো খুশীর একটা আমেজ হুমায়ুনকে আপুত করে। কাবুলে এবার নিশ্চিতভাবেই তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আকবরকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। সে দ্রুত এবং অমনোযোগী ভঙ্গিতে নিজেকে পোষাক সজ্জিত করে এবং রাতের কনকনে শীতের ভিতরে টলতে টলতে তাবু থেকে বের হয়ে আসে। বৈরাম খান, প্রতিরক্ষা প্রাচীরের কোথায় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে?
প্রধান তোরণদ্বারের ডানপাশে আপনার মতামত অনুযায়ী যেখানে প্রতিরক্ষা প্রাচীর সবচেয়ে দূর্বল হবার কথা।
কত বড় ফাটল?
বেশী বড় না কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা যদি এখনই সক্রিয় হই, আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে। আমি ইতিমধ্যে আমাদের তবকি এবং তীরন্দাজদের সাথে সাথে গোলন্দাজদেরও ব্যাপকভাবে গোলাবর্ষণ করতে বলেছি যাতে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত কেউ প্রাচীরের ফাটল মেরামত করার আগ্রহ না দেখায়। আর দেড় ঘন্টার ভিতরেই সকালের আলো ফুটবে এবং আপনি যদি আদেশ দেন তাহলে এই সময়ের ভিতরে আমি একদল সৈন্যকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত করতে পারবো।
প্রস্তুত করেন।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করার সময়টায় শীতের সূর্য নীচুতে ভেসে থাকা কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আর কনকনে শীতল বাতাস বইতে থাকে আর যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হুমায়ুনকে দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখে উঠে যাওয়া ঢালু পথটার পাদদেশে আক্রমণকারী যোদ্ধাদের মাঝে দাঁড়িয়ে উজ্জীবিত ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যায়।
এখানে যারা উপস্থিত রয়েছে তাঁদের সবার সাহসীকতা আর আনুগত্য সম্বন্ধে অবগত আছি এবং তোমাদের পাশে নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করছি বলে আমি গর্বিত। নিজের রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়ের সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা আর হয় না কিন্তু আমার কুচক্রী সৎ-ভাই কামরান অন্যায়ভাবে আমার সিংহাসন দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, আমার নির্দোষ সন্তানকে চুরি করে রক্তের সম্পর্ক আর সম্মানের প্রচলিত সব রীতি লঙ্ঘন করেছে। সে এসব করে মোগল অহমিকা কলঙ্কিত করেছে। কিন্তু আমরা সবাই একসাথে এই অপমানের প্রতিকার করতে এবং জবরদখলকারীকে শাস্তি দিতে পারি। কোনো কথা নয় আর এবার যুদ্ধ!
বৈরাম খানকে পাশে নিয়ে হুমায়ুন তার লোকদের একেবারে সামনের সারিতে অবস্থান করে আক্রমণের উদ্দেশ্যে ঘোড়া হাকায়। দূর্গপ্রাসাদের তোরণদ্বার লক্ষ্য করে ছোঁড়া কামানের গোলার সাদা ধোয়ার মাঝে বরফ জমে থাকা ঢালু পথের উপর দিয়ে ঘোড়া দুটো তাদের সাধ্যমতো দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাকে, দুটো প্রাণীর পাজর হাপরের মতো উঠানামা করতে থাকে, মাঝে মাঝে যদিও তারা বরফের উপরে পা হড়কায়। তার নিজের সৈন্যদের গাদাবন্দুক আর কামানের শব্দে তার কানে প্রায় তালা লেগে যায় কিন্তু বোয়ার ভিতরে একটা ফাঁকা স্থান দিয়ে সে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে, তোরণদ্বারের ডানপাশের দেয়ালে আসলেই একটা আঁকাবাঁকা ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। তার আত্মা প্রফুল্ল হয়ে উঠে। পর মুহূর্তেই সে বিস্মিত হয়ে অনুধাবন করে যে দূর্গপ্রাকারের প্রাচীরের কাছ থেকে পাল্টা গুলি খুব সামান্যই ছোঁড়া হচ্ছে।
সে বিমূঢ় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকার মাঝেই সহসা কুণ্ডলীকৃত ধোয়ার মাঝের আরেকটা ফাঁকাস্থান দিয়ে তোরণদ্বারের ঠিক উপরের প্রাকারে একটা কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ্য করে। কামরান কি আত্মসমর্পনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টা তার বিশ্বাস করতে কষ্টই হয়। সে তার গোলন্দাজ আর তকিদের চিৎকার করে গুলিবর্ষণ বন্ধ করতে বলে, তারপরে বিষয়টা ভালো করে পর্যবেক্ষন করতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। বারুদের তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত ধোঁয়া ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করতে সে দেখে যে দূর্গ প্রকারের উপরে কামরানের সৈন্যরা কাঠের তৈরী সূচালো দণ্ডের মতো কিছু একটা স্থাপণ করছে। তারপরে দীর্ঘকায় একটা অবয়বকে নিজেদের সামনে ঠেলতে ঠেলতে, সেখানে আরও সৈন্য এসে উপস্থিত হয়ে, সকালের ধুসর আকাশের প্রেক্ষাপটে যার মাথার লম্বা খোলা চুল আবছাভাবে দেখা যায়। হুমায়ুন সামনের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করে যতক্ষণ না সে দেখতে পায় যে অবয়বটা একজন মহিলার এবং তার হাতে কিছু একটা ধরা রয়েছে। এমন একটা কিছু যা ছটফট করছে আর মোড় খাচ্ছে- একটা শিশু।
হুমায়ুনের দেহের রক্ত যেন নিমেষে জমাট বরফে পরিণত হয়। সৈন্যরা যখন মেয়েটাকে কাঠের খুঁটির সাথে বাধছে তখন সে স্বপ্নবিষ্ট মানুষের মতো তাকিয়ে থাকে, তারা মেয়েটার সারা শরীর দড়ি বা শেকলের মতো দেখতে কিছু একটা দিয়ে পেঁচিয়ে বাধে কেবল তার হাতের প্রাণবন্ত বোঝাটা ধরে রাখার জন্য হাত দুটো খোলা রাখে। ঐ ক্ষুদে পুটলিটা, হুমায়ুনের মনে সন্দেহের সামান্যতম কোনো অবকাশ থাকে না, তার সন্তান তারই দুধ-মা মাহাম আগা তাকে দুহাতে জড়িয়ে রয়েছে।
একটা অসহায় কান্না তার গলা চিরে বের হয়ে আসে। না! জাহিদ বেগ আর বৈরাম খান ইতিমধ্যে তার পাশে এসে উপস্থিত হয়েছে, রক্ত মাংসের জীবন্ত লক্ষ্যবস্তু হিসাবে প্রাচীরের উপরে প্রদর্শিত মহিলা আর শিশুটির অপার্থিব দৃশ্যপটের দিকে হুমায়ুনের মতো তারা নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। অবশেষে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা থেকে বহুকষ্টে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে হুমায়ুন দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে। নিজের সৎ-ভাইয়ের কুটিলতাকে সে আরো একবার ছোট করে দেখেছে। কামরানের এই প্রত্যুত্তরের অর্থ প্রাঞ্জল আর দ্ব্যর্থহীন- আক্রমণ অব্যাহত রাখলে নিজের সন্তানের ঘাতক তুমি নিজেই হবে।
