আমি এবার সেটাই করবো, হুমায়ুন প্রতিজ্ঞা করে এবং তাবুর প্রবেশ পথের দিকে হেঁটে যায়। প্রবেশ পথে ঝুলে থাকা পর্দার একটা তুলে সে পা যুক্ত ঝুড়িতে রাখা জ্বলন্ত কয়লার কাছে ওম পোহাতে থাকা জওহরকে ডাকে। জওহর আমার ভাইয়ের কাছ থেকে আমরা আমাদের জবাব পেয়ে গেছি। যুদ্ধ এড়াবার আর কোনো পথ নেই। আমার পরামর্শদাতাদের ডেকে পাঠাও। আগামী কাল সকালেই আমরা আক্রমণ শুরু করবো।
*
গতকাল দিনে আর রাতের বেলার বেশীর ভাগ সময়ে যে তুষারপাত হয়েছিল এবং হুমায়ুনের পার্সী গোলন্দাজেরা যখন তাঁদের কামানগুলোকে নিজ নিজ অবস্থানে মোতায়েন করার সময়ে তাঁদের জন্য একটা আড়াল তৈরী করেছিল গোলন্দাজের দল তাদের গোলাবর্ষণ শুরু করতেই বরফ গলতে শুরু করে। গোলন্দাজদের থেকে পঞ্চাশ গজ পেছনে আরেকটা পাথুরে শিলাস্তরের আড়ালে হুমায়ুন তার নিয়ন্ত্রক অবস্থান থেকে দলবদ্ধ লোকগুলো তাদের কাজ শুরু করতে সেদিকে তাকিয়ে। থাকে। প্রতিটা কামানের জন্য পাঁচজন- প্রত্যেকের পরণে রয়েছে চামড়ার তৈরী আঁটসাট জামা, পাতলুন এবং মাথায় সূচালো অগ্রভাগযুক্ত শিরোস্ত্রাণ, বারুদ ভর্তি সুতির তৈরী থলেগুলো তোলার সময় একটা ঘোঁতঘোঁত শব্দ হয় এবং তারপরে ব্রোঞ্জের নলের ভেতরে পাথরের গোলাগুলো প্রবিষ্ট করিয়ে সেগুলোকে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে নীচের দিকে ঠেলে দেয়। তারা তারপরে তাঁদের সঙ্গের বেধনিকার ধারাল ধাতব কীলক বারুদের থলে ফুটো করতে সংবেদনশীল-গর্তের ভেতরে প্রবেশ করায় এবং গর্তের মুখের চারপাশে সাবধানে সামান্য পরিমাণে আরেকটু বারুদ ছিটিয়ে দেয়। অবশেষে, দলের সবাই বেশ খানিকটা পেছনে সরে এসে দাঁড়াতে, প্রতিটা দল থেকে একজন নিজ নিজ কামানের দিকে এগিয়ে যায়। তাঁর হাতে একটা লম্বা আকর্ষিযুক্ত দণ্ডের একপ্রান্তে তেলে ভিজানো সরু দড়ি লাগানো যার অগ্রভাগে আগুন জ্বালানো রয়েছে এবং ধিকিধিকি করতে থাকা লালচে-কমলাভ অগ্রভাগ দিয়ে সে সংবেদনশীল গর্তের মুখে অগ্নি সংযোগ করেই দ্রুত লাফিয়ে পেছনে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসে।
পুরো প্রক্রিয়াটা যদিও দৈহিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য- হুমায়ুন দূর থেকে শীতল বাতাসে তাঁদের দেহের ঘাম বাস্পের মতো মিশে যেতে দেখে লোকগুলোর দক্ষতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটা, বিস্ফোরক মাত্রার বারুদে অগ্নি সংযোগ হতে উজ্জ্বল আলোর ঝলকানির সাথে বারুদ আর গোলার যুগলবন্দি থেকে সৃষ্ট মন্দ্র গর্জনের কারণে, সাবলীল আর দ্রুত দেখায়। হুমায়ুনের চোখের সামনে তারা একের পর এক গোলা বর্ষণ করতে থাকে। প্রথম কয়েকটা গোলা লক্ষ্যবস্তু থেকে খানিকটা পশ্চিমে এবং দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ে কিন্তু বৈরাম খানের লোকেরা দ্রুত কামানবাহী শকটের সামনের চাকার নীচে কাঠের গোঁজ খুঁজে- কামানের নলের নতির প্রয়োজনীয় সংশোধন সাধন করে আর বারুদের পরিমাণ হ্রাস বৃদ্ধি করে বিচ্যুতি শুধরে নেয়। অচিরেই অধিকাংশ গোলা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে শুরু করে তোরণদ্বার আর মাটির দেয়ালে আছড়ে পড়তে শুরু করলে, সেখান থেকে অবিরামভাবে লালচে-খয়েরী রঙের ধূলার মেঘ সৃষ্টি হতে শুরু করে।
দূর্গপ্রাসাদের প্রাকার থেকে কামরানের কয়েকজন গাঁদাবন্দুকধারী তবকিকে গোলন্দাজদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে দেখা যায়, কিন্তু কামানগুলোকে রক্ষাকারী পাথরের দেয়ালে আঘাত করা থেকে বিরত থাকতে তাঁদের প্রাকারের উপর অনেকখানি ঝুঁকে এসে গুলি করতে হয় এবং নিজেদের অস্তিত্ব পুরোপুরি প্রকাশ করতে হয়। প্রথমদিকে যদিও তারা হুমায়ুনের বেশ কয়েকজন গোলন্দাজকে আঘাত করতে সক্ষম হয়, তার নিজের তবকিরা ইতিমধ্যে অগ্রবর্তী অবস্থানে পৌঁছে যেতে সেখান থেকে তারা এবার প্রাকারের উপরে কামরানের লোকেরা গুলি করার পায়তারা করলেই পাল্টা গুলি করা আরম্ভ করে। তারা শত্রুপক্ষের দুজনকে গুলিবিদ্ধ করতে সক্ষম হয়, যাঁরা তাঁদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে প্রাকারের উপর থেকে উল্টে পড়ে বাতাসে খাবি খেতে খেতে নীচের পাথুরে ভূমিতে এসে আছড়ে পড়ে। বাকি যোদ্ধারা এরপরে আড়ালে থাকাই শ্রেয় মনে করে এবং তারা গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখলেও সেগুলো তড়িঘড়ি করে ছোঁড়া যা লক্ষ্যবস্তুর অনেক দূর দিয়ে চলে যায়।
হুমায়ুন একটা চওড়া ছাতিঅলা সাদা ঘোড়ায় চড়ে জাহিদ বেগকে আস্কন্দিত বেগে উপরের দিকে উঠে আসতে দেখে। সুলতান, শহরের পরিস্থিতি শান্ত বলেই মনে হচ্ছে, গাঁদাবন্দুকের গমগম করতে থাকা আওয়াজ ছাপিয়ে সে চিৎকার করে বলে। সৈন্যরা শহর প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাছ থেকে দূর্গপ্রাসাদ লক্ষ্য করে আমাদের গোলাবর্ষণ প্রত্যক্ষ করছে কিন্তু কেউ শহর অবরোধ করে অবস্থানরত আমাদের সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলি করেনি বা শহর থেকে বের হয়ে এসে পেছনদিক থেকে আমাদের আক্রমণ করার কোনো চেষ্টা করেনি। আপনি যেমন ধারণা করেছিলেন আদতে তাই হয়েছে- এহেন প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সাহস তাঁদের নেই। কিন্তু তারা যেখানে লুকিয়ে রয়েছে সেই শহর প্রতিরক্ষা দেয়াল বিশেষ করে দূর্গপ্রাসাদের প্রতিরক্ষা দেয়ালগুলো খুবই মজবুত। তাদের পরাস্ত করতে আমাদের সময় লাগবে আর নিরবিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে।
