সবসময়ে সেটা অপরিহার্য নয়। কামরান যদি আকবরকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও থাকে, তাহলেও উত্তরের জন্য তাঁকে আর আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রেখে মজা দেখার মতো বিদ্বেষপরায়ন কামরান, হুমায়ুন উত্তর দেয়।
ঠিকই বলেছেন। সে যদি নিজের উচ্চাকাঙ্খ চরিতার্থ করতে মায়ের কোল থেকে তার সন্তানকে ছিনিয়ে নেবার মতো বদমায়েসী করতে পারে, তাহলে তাকে দিয়ে যেকোনো খারাপ কাজ সংঘটিত হতে পারে।
কিন্তু এমনও হতে পারে তারা হয়ত আকবরের জিনিষপত্র একত্রিত করছে। হামিদাকে সান্ত্বনা দিতে হুমায়ুন একটা স্তোকবাক্য আউরায়- যা সে নিজেই বিশ্বাস করে না।
দেখেন, তোরণদ্বার পুনরায় খোলা হচ্ছে, মেঘের আড়াল ভেঙে সদ্য বের হওয়া সূর্যের আলো বরফের উপর পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে চোখ আড়াল করে রুদ্ধশ্বাসে হামিদা বলে। রৌদ্রজ্জ্বল পারিপার্শ্বিক হয়ত একটা শুভলক্ষণ।
সম্ভবত, হুমায়ুন উত্তর দেয়। তোরণদ্বারের ভেতর থেকে প্রথমে জওহর তার ধুসর ঘোড়াটা নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসবার মিনিটখানেকের ভিতরে গুলবদনকে বহনকারী শকটটি বের হয়ে, ধীর গতিতে ঢালু পথ বেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করে।
ঝালরগুলো এখনও বন্ধ করে রাখা। আকবর সম্ভবত ভেতরে রয়েছে, হামিদা বলে।
সম্ভবত, হুমায়ুন আবারও বলে। তাঁর কথার মাঝেই সূর্য আবার মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
দশমিনিট পরে ক্ষুদে কাফেলাটা মেয়েদের তাবুর সামনে এসে উপস্থিত হয়। খচ্চর টানা শকটটি পুরোপুরি থামার আগেই গুলবদন ঝালর সরিয়ে দিয়ে নীচে নামতে যায়। তাকে কোনো কথা বলতে হয় না। তার থমথমে মুখ আর সেখানে ফুটে থাকা কঠিন অভিব্যক্তি দেখে হুমায়ুন আর হামিদা বুঝে নেয় ভেতরে আকবর নেই এবং তার চেয়েও খারাপ খবর যে তাকে দ্রুত ফিরে পাবার যে আশা তারা মনের ভেতর লালন করছিল, কামরানের উত্তর সেটাও ব্যর্থ করে দিয়েছে। অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করে হামিদা; ভেজা, শীতল তুষারের উপর হাটু মুড়ে বসে পড়ে। হুমায়ুন তাঁকে আলতো করে দাঁড় করিয়ে শক্ত করে তাঁকে ধরে রাখে।
আপনাদের অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি।
না, তুমি মোটেই বুঝতে পারছে না, হামিদা ফুঁপিয়ে উঠে। একজন মা কেবল সেটা বুঝতে পারবে। এক মোচড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে জেনানাদের বরফাবৃত তাবু লক্ষ্য করে সে ছুটে যায়। ক্রোধ আর হতাশায় কাঁপতে কাঁপতে, হুমায়ুন তাঁর ছুটে যাওয়াটা তাকিয়ে দেখে তারপরে, সে গুলবদনের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে নিজের তাবুতে নিয়ে আসে। তাবুর ভেতরে প্রবেশ করে সে তাঁদের সমস্ত পরিচারক আর পরিচারিকাদের ইশারায় বাইরে যেতে বলে। সে ঠিক কি বলেছে? সবাই বের হয়ে যাবার পরে তাবুর ভেতরে যখন কেবল তাঁরা দুজনে রয়েছে সে জিজ্ঞেস করে।
সামান্যই। দীর্ঘ সময় কামরান আমাকে অপেক্ষা করিয়ে রেখেছিল… সে একাই ছিল শেষ পর্যন্ত সে যখন আমাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়, আমাদের আব্বাজানের গিল্টি করা সিংহাসনে উপবিষ্ট- কাবুলের রাজসিংহাসন। সে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানাবার কোনো চেষ্টাই করেনি। আপনার চিঠিটা আমি তাঁর হাতে তুলে দিতে, সে চিঠিটার দিকে একপলক তাকিয়ে থাকে। তারপরে, আপন মনে হাসতে হাসতে সে এটা লিখেছে। গুলবদন হুমায়ুনের দিকে ভাঁজ করা একটা কাগজ এগিয়ে দেয়। সে চিঠিটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কেবল এটুকুই বলে, তাকে গিয়ে এটা দেবে এবং তাকে বিদায় হতে বলবে। আমি তার কাছে মিনতি করি, নাছোড়বান্দার মতো তাকে বলি, আপনার জন্য না হোক তার মা আর আমার খাতিরে হলেও, আকবরকে মুক্তি দিতে। সে কেবল এটাই বলে, আমাকে কি তোমার আহাম্মক মনে হয়? তোমার যদি আর কিছু বলার না থাকে, তাহলে তুমি এবার বিদায় নিতে পার। আমি আর একটা কথাও না বলে ঘুরে দাঁড়াই এবং কক্ষ থেকে বের হয়ে আসি। আরও মিনতি কিংবা কান্নাকাটি করে নিজেকে তাঁর সামনে আরও অপদস্থ করার সম্ভষ্টি আমি তাকে পেতে দেব না।
তুমি ঠিক কাজই করেছো, গুলবদনকে জড়িয়ে ধরে হামিদা কথাগুলো বলতে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি আর কাঁদব না এবং আপনিও না। হুমায়ুন, কামরান চিঠিতে কি লিখেছে? আমাদের নিশ্চিত হতে হবে সে আবার নতুন কোনো ধূর্ততার আশ্রয় নেয়নি।
হুমায়ুন চিঠির ভাঁজ খুলে এবং অসহিষ্ণু আঁকাবাঁকা হাতে লেখা যা তাঁদের ছেলেবেলা থেকেই হুমায়ুনের পরিচিত, চিঠিটা জোরে জোরে পড়ে।
আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই এলাকা ত্যাগ করে পারস্য যাবেন কিন্তু আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন এবং ভিনদেশী একদল সৈন্য নিয়ে আমাকে হুমকি দেবার জন্য ফিরে এসেছেন। আমার নিজের বাহুবলে গড়া রাজ্য থেকে আমাকেই নিরাপদ সঞ্চারণের প্রস্তাব দেবার ধৃষ্টতা দেখান- আপনি, যে নিজে ব্যর্থ হয়েছে খাইবার গিরিপথের ওপাশে আমাদের আব্বাজানের বিজিত ভূখণ্ড নিজের দখলে রাখতে, আপনি, যে আমাদের আব্বাজানের সৃষ্ট সবকিছু হারিয়েছে। তার সিংহাসনে এখন আমার অধিকার। আপনিই এখানে পরাধিকারপ্রবেশক, আমি নই। ফিরতি পথে পারস্যে এবং নির্বাসনে নিজের যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেন।
হামিদাই প্রথম নিরবতা ভঙ্গ করে। মেয়েদের বিনীত নিবেদনে বা আপনার যৌক্তিক আর ক্ষমাপূর্ণ প্রস্তাবে সে কর্ণপাত করবে না। নিজের ঔদাসীন্য আর নিষ্ঠুরতার মূল্য তাকে রক্ত দিয়ে শোধ করতে বাধ্য করুন।
