সুলতান, শহরটার কি হবে? বৈরাম খান জানতে চায়। তার ক্ষতস্থানসমূহ খুব দ্রুত শুকিয়ে আসছে, যদিও সে এখনও তার ঘাড় নাড়াতে পারে না, যার চারপাশে এখনও মোটা পট্টি বাঁধা রয়েছে। আরেকটা পৌরুষদীপ্ত ক্ষতচিহ্ন লাভ করার ব্যাপারে সে মোটামুটি নিশ্চিত।
সুলতানের সৎ-ভাই, অবশ্যই, এর প্রহরায় রক্ষীসেনা মোতায়েন করেছে, জাহিদ বেগ মন্তব্য করে। দেয়ালের উপর থেকে শহর রক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যরা আমাদের উদ্দেশ্যে গুলি বর্ষণ করতে পারে বলে আমাদের অবশ্যই তাদের নিশানা ভেদ করার দূরত্বের বাইরে অবস্থান করতে হবে এবং আমাদের নিজেদের শিবিরের চারপাশে নিরাপত্তা পরিখা খনন করে পাহারার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
কিন্তু এই বাহিনীর মতো বিশাল একটা বাহিনীকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে শহরের রক্ষীসেনা অভিনিষ্ক্রমণের কথা বিবেচনা করলে বোকামীর পরিচয় দেবে, বৈরাম খান নিজের মতামত জানান।
হুমায়ুন এতোক্ষনে কথা বলে। সেইসাথে, শহরের অধিবাসীরাও হয়ত তাঁদের সমর্থন করে না। কাবুলের অধিবাসীরা ব্যবসা করেই তাদের সম্পদ অর্জন করেছে। তাঁরা যুদ্ধ নয়, শান্তি আর সমৃদ্ধি চায়। যদিও তারা হয়ত আমার প্রতি বিশেষ কোনো প্রকার আনুগত্য অনুভব করে না, তারা যদি মনে করে আমি- কামরান নয় শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হব, আমার অনুগ্রহ লাভের আশায় তারা হয়ত তার সৈন্যদলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, আমার আব্বাজানের জন্য তার শত্রুর বিরুদ্ধে তাঁরা আগেও যেমন করেছিল। পুরো শহরটা বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন কর। কিন্তু দূর্গপ্রাসাদের বিষয়ে আমাদের কি করণীয়, আমাদের কামানগুলো আমরা কোথায় মোতায়েন করবো যার ফলে আমাদের প্রেরিত আত্মসমর্পণের প্রস্তাব আমার সৎ-ভাই যদি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তাৎক্ষণিক আক্রমণের জন্য সেগুলো প্রস্তুত থাকে?
জাহিদ বেগ সমাধান দেয়। দূর্গপ্রাসাদ অভিমুখী রাস্তা দিয়ে কামানগুলো উপরের দিকে নিয়ে গিয়ে আমরা সেগুলোর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক অগ্রবর্তী স্থান খুঁজে বের করবো, যেখানে আমাদের গোলন্দাজেরা গোলাবর্ষণের সময় দূর্গপ্রাসাদের দেয়াল তাদের লক্ষ্য করে সরাসরি তীর কিংবা মাস্কেটের গুলি বর্ষণ করা অসম্ভব।
আমি একমত। হুমায়ুন মাথা নেড়ে বলে। আমার মনে হয়, দূর্গপ্রাসাদের প্রবেশদ্বারের আগে রাস্তাটা শেষবারের মতো যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে ঐ পাথুরে শিলাস্তরটা একটা অবস্থান হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারে। সেইসাথে, আমাদের লোকেরা যদি সেখানে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারে, তাহলে আমাদের লোকদের উপরে গোলা বর্ষণের জন্য কামরানের নিজস্ব গোলন্দাজ বাহিনীর পক্ষে তাদের কামানগুলোর নল যথেষ্ট পরিমাণে নীচু করাটা একটা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের নিশানা হবে প্রধান প্রবেশদ্বারগুলো। প্রবেশদ্বারগুলো ধাতব পাত দিয়ে বাধান এবং লোহার ভারী গরাদ দ্বারা সুরক্ষিত হলেও তাঁদের পক্ষে অবিরাম বোমাবর্ষণের ধাক্কা সামলান অসম্ভব। তাদের সরাসরি ডানের বৰ্হিদেয়ালকেও আমাদের নিশানা করতে হবে। আমার যতদূর মনে পড়ছে, ঐ দেয়ালটা বেশ পুরাতন এবং বাকী দেয়ালগুলোর মতো পুরু নয়।
আপনার প্রস্তাবিত অবস্থান থেকে জোরালভাবে গোলাবর্ষণ করা সম্ভব কিনা সেটাই হবে আমাদের প্রধান সমস্যা, জাহিদ বেগ মন্তব্য করে।
রুস্তম বেগ, আপনার কি মনে হয়? হুমায়ুন জানতে চায়। আপনার গোলন্দাজেরা ঐ দূরত্ব থেকে কাঙ্খিত ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারবে?
প্রবীণ পার্সি সেনাপতি উত্তরের জন্য তার সহযোগীর দিকে তাকান। সুলতান, আশা করি কোনো সমস্যা হবে না, বৈরাম খান জবাব দেয়, গাঢ় নীল চোখ চিন্তিত অভিব্যক্তি। আমাদের কামানগুলো ক্ষুদ্রাকৃতির এটাই একমাত্র আফসোসের বিষয়। কাঝভিন থেকে যদি আমরা বড় কামানগুলো নিয়ে আসতে পারতাম, প্রতিরক্ষা দেয়ালগুলো তাহলে আমরা অনায়াসে গুঁড়িয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমাদের কাছে অন্তত পর্যাপ্ত পরিমাণে বারুদ আর পাথরের গোলা রয়েছে।
চমৎকার। আমি জানি কামানগুলোর সময় লাগবে নিজেদের প্রভাব জানান দিতে, কিন্তু আমরা কার্যকর ফাটল সৃষ্টি করতে পেরেছি সেটা প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথে, আমি আমাদের সৈন্যদের প্রস্তুত দেখতে চাই- দূর্গপ্রাসাদে প্রবেশ করার জন্য আমাদের তীরন্দাজ আর তবকিদের গুলিবর্ষণের ছত্রছায়ায় ঢালুপথ দিয়ে ঢেউয়ের মতো ধেয়ে গিয়ে আক্রমণ করছে। বৈরাম খান আর জাহিদ বেগ আমি আপনাদের উপরে আক্রমণের প্রশিক্ষণের জন্য সৈন্যবাহিনী আর তাঁদের নেতৃত্ব দেবার লোকদের নির্বাচনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দূর্গপ্রাসাদ থেকে কেউ পালাবার চেষ্টা করলে তাদের পিছু ধাওয়া করার জন্য সবসময়ে যেন অশ্বারোহী বাহিনীর কয়েকটা দল প্রস্তুত অবস্থায় থাকে। আমার সৎ-ভাইকে কোনমতেই পালিয়ে যাবার বা আমার ছেলেকে আমার নাগালের বাইরে পাঠিয়ে দেবার অনুমতি দেয়া হবে না।
*
কামরান যদি গুলবদনের অনুরোধ সাথে সাথে নাকচ করে দিত, তাহলে এতোক্ষণে সে ফিরে আসতো, আসতো না? হামিদা জানতে চায়। কনকনে তীব্র শীত আর আকস্মিক তুষারপাত সত্ত্বেও, গুলবদন দুটো খচ্চর দ্বারা টেনে নেয়া পর্দাঘেরা একটা শকটে উঠে বসার পরে, এবং সন্ধির পতাকা হাতে উপস্থিত জওহরের সামনে অবস্থান করে ঢালু পথ দিয়ে দূর্গপ্রাসাদের দিকে রওয়ানা হবার পর থেকেই সে কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের মূল তোরণদ্বারের দিকে মেয়েদের তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে। পাঁচমিনিট পরেই একটা তোরণদ্বার খুলে যেতে সে ভেতরে ঢুকে হারিয়ে যায়।
