তাদের পিছু ধাওয়া কর, হুমায়ুন চিৎকার করে জাহিদ বেগকে আদেশ দেয়। তোমার পক্ষে যতজনকে হত্যা কিংবা আটক করা সম্ভব, কর কিন্তু সাবধান সামনে অন্যরা হয়ত অতর্কিত হামলার জন্য ওত পেতে রয়েছে। সে ঘোড়া থেকে নেমে বৈরাম খানের দিকে দৌড়ে যায়, যে নিজের পর্যানের উপরে উপুড় হয়ে রয়েছে। অকুতোভয় পার্সী যোদ্ধা ঘোড়ার উপর থেকে একপাশে টলে পড়ার আগেই সে তার পাশে পৌঁছে যায়। হুমায়ুন তাকে আলতো করে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে, নিজের মুখ ঢাকার লাল রুমালটা দিয়ে তার ক্ষতস্থানের রক্তপাত বন্ধ করতে চেষ্টা করে। সুলতান, আপনাকে ধন্যবাদ। আমার জীবন বাঁচাবার জন্য আমি আপনার কাছে ঋণী… আমি এর প্রতিদান আপনাকে দেব, ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে বৈরাম খান বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে।
জাহিদ বেগ আর তার লোকেরা পুনরায় যখন গিরিকন্দরে নেমে আসে ততক্ষণে তুষারপাত বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং শীতের ধুসর সূর্য যুদ্ধক্ষেত্রের বুকে লম্বা ছায়ার সৃষ্টি করে, পশ্চিমের চূড়াগুলোর আড়ালে অস্ত যেতে শুরু করেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন বৈরাম খানের এবং অন্যান্য আহত যোদ্ধাদের শুশ্রূষার তদারকি করছে। হুমায়ুন খেয়াল করে দেখে আগুয়ান অশ্বারোহীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দি নিজেদের ঘোড়ার পর্যানে বেকায়দা ভঙ্গিতে লাফাচ্ছে, তাদের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা এবং প্রত্যেকের হাটুজোড়া তাদের ঘোড়র পেটের নিচ দিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
জাহিদ বেগ, বন্দিদের কেউ কি কথা বলতে আগ্রহী? তারা কি বলতে চায়?
কেবল এটুকুই যে তারা আসলে ঝটিকা আক্রমণে এসেছিল- যাদের সংখ্যা কোনোমতেই দেড় হাজারের বেশী হবে না এবং অধিকাংশই স্থানীয় গোত্রের লোজন। তারা যদি সাফল্য লাভ করে তাহলে আপনার ভাই তাঁদের প্রচুর বখশিশ দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশেষ করে তারা যদি আপনার কাটা মাথা তার কাছে নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের আরও আক্রমণের বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। আরো প্রহরী মোতায়েন কর। আমরা আসছি কামরান এখন জানতে পারবে এবং সেই সাথে কখন আর কোনদিক থেকে।
*
বাইশ বছর পূর্বে তাঁর আব্বাজানের সাথে হিন্দুস্তান অভিযানে রওয়ানা হবার পরে এই প্রথম হুমায়ুন তাঁর চোখের সামনে নিজের জন্মস্থান দেখতে পায়। কাবুল শহর রক্ষাকারী দেয়াল আর তোরণদ্বার, মাত্র আধ মাইল দূরে, বরফাবৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেয়ালের উপর দিয়ে শহরের সরাইখানার উঁচু খিলানাকৃতি প্রবেশ পথের কেবল শীর্ষদেশ সে দেখতে পায় যা হাজার হাজার বণিকের দলকে, যাঁরা চিনি, কাপড়, ঘোড়া, মশলা আর রত্নপাথরের মতো তাদের বিভিন্ন পণ্য দ্রব্য নিয়ে শহর অতিক্রম করার সময়, আশ্রয় দেয়, কাবুলের জন্য যা সমৃদ্ধির বারতা বয়ে আনে।
দূর্গপ্রাসাদটা একটা পাথুরে উচ্চভূমিতে অবস্থিত যেখান থেকে শহরটা দেখা যায়। দূর্গপ্রাসাদটার সাথে যদিও তার অনেক সুখকর স্মৃতি রয়েছে, হুমায়ুন সেগুলো এই মুহূর্তে দূরে সরিয়ে রেখে, শহরের চওড়া মাটির দেয়ার আর পোক্ত গম্বুজগুলো আবেগহীন, হানাদারের চোখে জরিপ করে। তাঁর বাল্যের স্মৃতি বিজড়িত বাসস্থান এটা এখন আর না, যার দেয়ালের পাশে দিয়ে সে ঘোড়া দাবড়েছে এবং বাজপাখি নিয়ে শিকার ধরেছে বরং এটা এখন তাঁর শক্রর সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি এবং তার সন্তানের বন্দিশালা। কান্দাহারের মতো এখানেও সে একই বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়। তাঁর সন্তান আকবর ইতিমধ্যে যে ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছে, তাকে তার চেয়ে আরও বেশী বিপন্ন না করে কিভাবে উদ্ধার করবে এবং নিজের শত্রুদের পরাস্ত করবে? হুমায়ুনের গুপ্তদূতেরা যদিও অনেক সময় তাঁদের সৈন্যবহরকে অনুসরণরত অশ্বারোহীদের দেখেছে যারা কামরানের লোকই কেবল হতে পরে এবং তাঁদের ধাওয়া করে তাড়িয়েছে। কামরান আর কোনো আক্রমণ করার আগ্রহ দেখায়নি। সে নিশ্চয়ই মনে করছে যে কাবুলে পর্যাপ্ত পরিমাণ রসদ মজুদ রয়েছে এবং অবরোধ মোকাবেলায় প্রস্তুত।
হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নেয় সে আরো একবার যুক্তি আর উপদেশ দিয়ে তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করবে, যদিও দুটোর প্রতিই কামরান নিজের সংবেদনশীলতা সামান্যই প্রকাশ করেছে। আজ রাতে কাবুলের বাইরে বরফাবৃত প্রান্তরের বুকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে স্থাপিত তার অস্থায়ী শিবিরে বসে সে আরো একটা চিঠি লিখবে যা তার সৎ-বোন শত্রুশিবিরে বহন করে নিয়ে যাবে। এবং আরো একবার, খুবই সহজসরল হবে তাঁর প্রস্তাব। কামরান যদি আকবরকে মুক্তি দেয় এবং কাবুল তাঁর হাতে সমর্পন করে, সে আর তার লোকেরা নিরাপদ অতিক্রমনের প্রতিশ্রুতির সাথে শহর ত্যাগ করতে পারবে। হুমায়ুন বিবেচনা করে দেখে, কান্দাহারে আসকারির কাছে গুলবদন যখন যুদ্ধ অনিবার্য এই মর্মে লেখা তাঁর চরমপত্র পৌঁছে দিয়েছিল, অন্তত তার চেয়ে এখন তার অবস্থান অনেকবেশী শক্তিশালী। সে কাবুলের যত নিকটবর্তী হয়েছে, উপজাতিয় লোকজন আরও বেশী সংখ্যায় তাঁর সাথে যোগ দিয়েছে। তাঁর নিজের বাহিনী এখনও যদিও পার্সি যোদ্ধাদের সমকক্ষ হয়ে উঠেনি, তাঁদের সংখ্যা এখন প্রায় আট হাজার।
হুমায়ুন তাঁর দাস্তানাবৃত হাত দিয়ে উষ্ণতার জন্য নিজের দুপাশে চাপড় দিতে দিতে, তাঁর লাল নিয়ন্ত্রক তাবুর দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তার জন্য তাঁর যুদ্ধকালীন পরিষদমণ্ডলী অপেক্ষা করছে। আমার ভগিনী বেশ সাহসী। সে আরো একবার আমার প্রতিনিধি হতে রাজি হয়েছে। কিন্তু কামরান যদি আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধপ্রাসাদ আক্রমণের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের কামানের গর্জন এবার সে শুনতে পাবে।
