হুমকির মুখোমুখি হতে হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাজরে গুতো দেয় সামনে এগোবার জন্য এবং সেই সাথে তার ঠিক পেছনেই অবস্থানরত অশ্বারোহী তীরন্দাজদের একটা দলকে তাঁর পক্ষে যতটা জোরে চিৎকার করা সম্ভব, সে চিৎকার করে বলে, তীর ছুঁড়তে শুরু কর! তীরন্দাজেরা, যাঁরা ঠিক এমন অতর্কিত আক্রমণের কথা মাথায় রেখেই ধনুকের ছিলা টানটান করে বেঁধে রেখেছিল ইতিমধ্যেই পিঠ থেকে নিজেদের জোড়া ধনুক নামিয়ে এনে, ঘোড়ার রেকাবে দাঁড়িয়ে উঠে কামরানের লোকদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত তুষারকণার ভেতর দিয়ে এক পশলা তীর নিক্ষেপ করে। আগুয়ান বেশ কয়েকটা ঘোড়া টলমল করে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং পিঠের সওয়ারীদের ছিটকে ফেলে দেয়। বরফের উপর আছড়ে পরার সময় একজন তার মাথার চূড়াকৃতি শিয়োস্ত্রাণ হারায় এবং তার কামান মাথা বরফের ভিতর বের হয়ে থাকা একটা পাথরের সাথে বেমক্কা ধাক্কা খেলে, তার খুলি ফেটে গিয়ে আশেপাশের মাটি রক্ত আর মগজে মাখামাখি হয়ে যায়।
অবশ্য, কামরানের অবশিষ্ট অশ্বারোহীরা ঠিকই ধেয়ে আসে, হানাদারের দল হুমায়ুনের অশ্বারোহীদের প্রথমসারির সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার আগে, গিরিকরের নিম্নমুখী ঢাল তাদের আক্রমণে বাড়তি গতি যোগ করে, হুমায়ুনের অশ্বারোহীরা তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার আগে কেবল নিজেদের মধ্যবর্তী দূরত্ব বৃদ্ধি করে তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। ভেড়ার চামড়ার মোটা আলখাল্লা পরিহিত কামরানের এক যোদ্ধা, মাথার উপরে কাঁটাযুক্ত স্তনী ভীমবেগে ঘোরাতে ঘোরাতে হুমায়ুনের দিকে ধেয়ে আসে। সংঘর্ষের সম্ভাবনার কারণে তুঙ্গস্পর্শী উত্তেজনার মাঝে, হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার মাঝেই লক্ষ্য করে তার প্রতিপক্ষের ঘোড়ার কেশরে তুষারকণা কিভাবে আবৃত করে রেখেছে। হুমায়ুন তার শত্রুকে লক্ষ্য করে সামনে এগোতে লোকটার কস্তনীর শেষ প্রান্তে যুক্ত কাঁটাযুক্ত গোলকটা তাঁর পাশ নিয়ে নির্বীষভাবে অতিক্রম করে কিন্তু তাঁর তরবারির আঘাত ঠিকই লোকটার ভেড়ার চামড়ার পুরু আলখাল্লার এক জায়গা পুরু করে চিরে ফেলে।
উভয় যোদ্ধাই নিজ নিজ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং পুনরায় পরস্পরের দিকে ধেয়ে আসে, শীতল বাতাসে তাদের ঘোড়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস বাস্পের ন্যায় ছড়িয়ে যায়। দুজনেই পুনরায় পরস্পরকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানায় কিন্তু পুনরায় দুজনেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। হুমায়ুনের প্রতিপক্ষ যখন প্রাণপনে লাগাম টেনে ধরে তৃতীয়বারের মতো হুমায়ুনকে আক্রমণের প্রয়াসে ব্যস্ত, বরফের উপরে তাঁর ঘোড়ার পা পিছলে যায়। লোকটা যখন প্রাণপনে চেষ্টা করছে পর্যানে কোনোমতে বসে থাকতে, হুমায়ুন তীক্ষ্ণ এক মোচড়ে তাঁর বাহনের মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং প্রতিপক্ষ তার হাতের কস্তনী দিয়ে আঘাত হানার মতো সুস্থির হবার আগেই তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হুমায়ুন সপাটে তাঁর তরবারি চালনা করে এবং লোকটা যদিও একটা ঝাঁকি দিয়ে তার দেহের উপরের অংশ সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় কিন্তু তরবারির ফলা তার আক্রমণকারীর উরুর নিম্নাংশে ঠিক হাটুর উপরে কামড় বসায়, মাংসপেশী কেটে গিয়ে একেবারে হাড়ে গিয়ে থামে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে লোকটা হাতের কনী ফেলে দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে। লোকটা ভুলের সুযোগ নিয়ে হুমায়ুন তাকে লক্ষ্য করে পুনরায় তরবারি চালায়, এবার লক্ষ্যস্থল কণ্ঠনালী। শীতল বাতাসে নিখুঁত ফোঁটায় রক্ত ছিটকে উঠে এবং লোকটা মাটিতে আছড়ে পড়ে।
হুমায়ুনের চারপাশে তার লোকেরা প্রতিপক্ষের সাথে প্রাণপনে লড়াই করছে, যাদের চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে তারা সংখ্যায় বেশী। হুমায়ুন অবশ্য লক্ষ্য করে যে তিনজন শত্রুসেনা বৈরাম খানকে ঘিরে ফেলায় সে তার বাকি লোকদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে তাঁদের দিয়ে এগিয়ে যায়। বৈরাম খান তাঁর মাথার শিরোম্রাণ হারিয়েছে এবং তুষার ঝড়ের কারণে তার মাথার লম্বা কালো চুল তার পেছনে নিশানের মতো উড়ছে। নিজের বিশালাকৃতি কালো ঘোড়াটাকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে দক্ষতার সাথে তার আক্রমণকারীদের পর্যায়ক্রমে মোকাবেলা করে সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে নিজেকে রক্ষা করতে। সে অবশ্য তারপরেও চাপের ভিতরে রয়েছে এবং ইতিমধ্যে বাম কানের নীচে থেকে তার বুকের বর্মের উপরে যেখানে তাঁর গলা শেষ হয়েছে সেখান পর্যন্ত প্রসারিত একটা গভীর ক্ষতস্থান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে।
বৈরাম খানের আক্রমণকারীদের একজন হুমায়ুনের তরবারির এক মোক্ষম আঘাতে পর্যান থেকে ছিটকে পড়ার পরেই কেবল তাঁরা হুমায়ুনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয় এবং দ্বিতীয়জন যে বৈরাম খানের অরক্ষিত পার্শ্বদেশে তাঁর হাতের আয়ুধ প্রবিষ্ট করার পায়তারা করছিল, পরবর্তী এক কোপে তার তরবারি ধরা হাত কাঁধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তৃতীয়জন রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাবার জন্য দাঁড়ায় কিন্তু সে পালাতে গেলে বৈরাম খান পেছন থেকে তাকে ধাওয়া করলে, সে নিজের প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলেও পেছনে তুষারের উপরে রক্তের একটা ধারা তার পলায়নের সাক্ষী হয়ে থাকে। কামরানের বাকি সব যোদ্ধারা যারা নিজেদের লড়াই থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় তাঁরা সবাই তাকে অনুসরণ করে। আক্রমণটা যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনই সহসা সমাপ্ত হয়। পুরো খণ্ডযুদ্ধটা আধঘন্টারও কম সময়ে মিটে যায়।
