সে কিছুক্ষণের জন্য ছাগলের পাল ব্যবহার করে এমন খাড়া হয়ে উপরের দিকে উঠে যাওয়া একটা পথ ধরে হাঁটতে থাকে। সে নীচের দিকে তাকাতে কয়েকশ অগ্নিকুণ্ডের কমলা আলো দেখতে পায় তার লোকেরা তাদের রাতের খাবার রান্না করছে। কয়েক মিনিটের ভিতরে হামিদার এবং গুলবদনের সাথে হারামের তাবুতে রাতের খাবারের পালা শেষ করার জন্য তাকেও ফিরে যেতে হবে, কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশের এই পরম স্তব্ধতার মাঝে এমন কিছু একটা রয়েছে যা তাঁকে অমোঘ আকর্ষণে টানছে। হুমায়ুন আকাশের দিকে তাকিয়ে তারকারাজি পর্যবেক্ষণ করে। দিগন্তের কাছে খুব নীচুতে ভেসে রয়েছে ক্যানোপস- তার আব্বাজান কাবুল যাবার পথে যে উজ্জ্বল আর মাঙ্গলিক তারাটা দেখেছিলেন এবং যে তারাটা তাকে ভরসা যুগিয়েছিল। এখন সে আশা করে তারাটা বুঝি তার জন্যও জ্বলজ্বল করছে।
৩.৩ আবেগ আর অনুভূতি
১৭. আবেগ আর অনুভূতি
পাহাড়ে শীতকালটা খুব দ্রুত জাকিয়ে বসে। তিন সপ্তাহ পূর্বেও, বাতাসের ঝাপটানিতে অস্থির তুষারকণা মাটিতে সামান্যই থিতু হতে পারতো কিন্তু এখন কাবুলের উত্তরপশ্চিমে বরফাবৃত পাহাড়ের মাঝে একটা সংকীর্ণ গিরিকন্দরের ভিতর দিয়ে হুমায়ুন যখন তার বাহিনী নিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে, বাতাস তখন প্রায় আনুভূমিকভাবে তুষারকণা তাঁদের দিকে পরিচালিত করছে। গিরিকন্দরের ভিতরে দিয়ে ভ্রমণের কষ্ট ক্রমশ খারাপ হতে থাকা পরিস্থিতির সাথে মিলিত হয়ে প্রবল হয়ে উঠেছে। হুমায়ুন তাঁর মূল মালবাহী বহর এসে পৌঁছান পর্যন্ত অপেক্ষা করাটাই শ্রেয় মনে করে। এরফলে যদিও কয়েকটা দিন নষ্ট হবে কিন্তু শীতের এই আবহাওয়ায় কামান আর অন্যান্য ভারী উপকরণ থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার ঝুঁকি নেয়াটা বিচক্ষণতার পরিচায়ক বলে মনে করে না সে।
সামনের আঁকাবাঁকা পথ জরিপ করার জন্য হুমায়ুন মাথা তুলে সামনের দিকে তাকাতে স্ফটিকাকার বরফের কণা তার মুখে হুল ফোঁটায়। এমনকি তুষারঝড়ের হাড়কাঁপান শীতলতার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সিদ্ধান্ত নেয়া ভঙ্গিতে চোখ কুচকে সামনে তাকিয়ে সে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না, বিশেষ করে বরফাবৃত উঁচুনীচু চূড়ার শীর্ষদেশ কিংবা গিরিকরটা যার অংশ এবং তাঁর ধারণা অনুযায়ী তাদের সামনে পৌনে এক মাইলের ভিতরে রয়েছে সেই গিরিপথের শীর্ষদেশ কিছুই গোচরীভূত হয় না।
আহমেদ খান শীঘ্রই ফিরে আসবে। সে কয়েকজন লোক দিয়ে তাঁকে সামনে পাঠিয়েছে, একটা বিষয় নিশ্চিত করতে যে এমন তীব্র আবহাওয়ায় তার বাহিনীর মতো একটা বাহিনীর পক্ষে গিরিকরটা অতিক্রম করা সম্ভব এবং সেই সাথে একটা স্থান নির্বাচন করে আসতে- সম্ভবত নিম্নগামী ঢালের কোনো অংশে যেখানে তারা বাতাসের আক্রমণ এড়িয়ে অস্থায়ী ছাউনি স্থাপন করতে পারবে।
সহসা, তুষারঝড়ের গর্জন এবং তাঁর মুখের নিম্নাংশ জড়িয়ে থাকা লাল পশমের কাপড়ের কারণে সৃষ্ট চাপা প্রভাব সত্ত্বেও, হুমায়ুনের মনে হয় সামনে কোথাও বরফের ভিতর থেকে সে একটা কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছে। সম্ভবত পুরোটাই বাতাসের একটা কারসাজি বা কোনো নেকড়ের কান্না, সে পুনরায় সামনের দিকে তাকিয়ে এবং শব্দটা ভালোমতো শোনার জন্য মুখের কাপড়টা সরিয়ে সেয়ার সময় সে ভাবে। সে যখন এসব সাতসতেরো ভাবছে, সে কাছেই আরেকটা চিৎকারের শব্দ শোনে এবং নিশ্চিতভাবেই মানুষের সামনে শত্রু রয়েছে!
সে ঠিক এরপরেই উড়ন্ত তুষারকণার মাঝে অস্পষ্ট এক অশ্বারোহীর অবয়ব দেখতে পায়, বরফাবৃত পথের উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে তাঁর দিকে ছুটে আসছে, বরফ কিংবা তার নীচে চাপা পড়া পাথরে হোঁচট খাবার তোয়াক্কা না করে। ঘোড়সওয়াড় আরেকটু কাছে আসতে হুমায়ুন দেখে লোকটা আর কেউ না আহমেদ খান, পাগলের মতো নিজের ঘোড়ার পাঁজরে গুতো মারতে মারতে ক্রমাগত চিৎকার করে বলছে, হুশিয়ার, সামনে শত্রু! সামনে শত্ৰু, হুশিয়ার! তার গুপ্তদূতদের দুজন তার ঠিক পেছনেই রয়েছে। সহসা তাঁদের একজন তার ঘোড়র উপর দিয়ে সামনের দিকে ছিটকে পড়ে, সাদা বরফের উপরে গড়াবার সময় নিজের রক্ত দিয়ে এর উপরে লাল আল্পনা এঁকে দিয়ে যায়, তাঁর পিঠ থেকে দুটো তীরের শেষপ্রান্ত বের হয়ে রয়েছে। মুহূর্ত পরে, দ্বিতীয় গুপ্তদূতের খয়েরী রঙের ঘোড়াটা হোঁচট খায় এবং পেছনের পায়ে বেশ কয়েকটা তীরের আঘাত নিয়ে বরফের উপরে লুটিয়ে পড়ে। হতভাগ্য ঘোড়াটার সওয়ারী পর্যান থেকে পিছলে নেমে এসে হাটু পর্যন্ত গভীর বরফের ভিতর দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে, তবে দশ পা এগোবার আগেই সে নিজেও বরফে আছড়ে পড়ে, কালো পালকযুক্ত একটা তীর তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
হুমায়ুন এরপরেই বরফের ভিতর দিয়ে অচেনা অশ্বারোহীদের কালো অবয়ব আবির্ভূত হতে দেখে, তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে, তাঁদের কেউ নিজেদের ঘোড়ার গলার উপর ঝুঁকে থেকে, তরবারি কিংবা বর্শা সামনের দিকে বাড়িয়ে রেখেছে এবং বাকিদের হাতে রয়েছে মৃত্যুবর্ষী ধনুক। বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে হুমায়ুন বৈরাম খানের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠে। মালবাহী শকটগুলোকে তোমার পক্ষে যতটা সুচারুভাবে সম্ভব একটা নিরাপত্তা ব্যুহ তৈরী কর- যেসব শকটে মহিলারা রয়েছে তাঁদের ব্যুহের ভেতরে নিয়ে যাও। শকটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তোমার সেরা যোদ্ধাদের পর্যাপ্ত সংখ্যায় মোতায়েন করে বাকিদের নিয়ে আমায় অনুসরণ কর।
