আধঘন্টা পরের কথা, হুমায়ুনকে তাঁর পায়ের সামনে, কুর্নিশ আনুষ্ঠানিক অভিবাদনজ্ঞাপনের রীতি অনুযায়ী, দুহাত প্রসারিত অবস্থায় শুয়ে থাকা লোকটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে থাকতে দেখা যায়। লোকটার পায়ের কালো নাগরার উপরে লাল তারকার নকশা দেখে, যা তার গোত্রের স্মারকচিহ্ন, হুমায়ুন আন্দাজ করে লোকটা কাফিরদের একজন গোত্রপতি, যাঁরা কাবুলের চারপাশে অবস্থিত কোটালে, সুউচ্চ, সংকীর্ণ গিরিপথগুলোতে বসবাস করে। কাফিররা স্বার্থের খাতিরে পক্ষত্যাগের জন্য কুখ্যাত। হুমায়ুন যখন ছোট ছিল তখন, তাঁর আব্বাজান কাফিরদের কোনো এক গ্রামের কিছু লোককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছিল যারা তাঁর প্রতিনিধিকে খুন করেছিল, তিনি তাঁদের কাবুলের প্রতিরক্ষা দেয়ালের সামনে শূলবিদ্ধ করেছিলেন, যাতে করে তাদের রক্তে মাটি লাল হয়ে যায়।
উঠে দাঁড়াও। তুমি একজন কাফির, তাই না?
জ্বী, সুলতান। আবহাওয়ার কারণে পর্যুদস্ত, পা ভাঁজ করে উবু হয়ে বসে থাকা লোকটা দেখতে কৃশকায় এবং তাঁর পরণের ভেড়ার চামড়ার তৈরী আঁটসাট পোষাকটারও বেহাল অবস্থা।
তুমি আর তোমার লোকজন এখানে কেন এসেছো?
সুলতান, আমরা এসেছি আপনাকে সহায়তা করার প্রস্তাব নিয়ে।
কিন্তু তোমরা আমার সৎ-ভাই কামরানকে সহায়তা করতে, তাই না?
কাপিল লোকটা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
তোমরা কেন তার পক্ষ ত্যাগ করেছো?
তিনি তার কথার বরখেলাপ করেছেন। তিনি আমাদের স্বর্ণমুদ্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি কিছুই দেননি। আমার দুইজন লোক এবিষয়ে অভিযোগ জানালে কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের দেয়ালের উপর থেকে তিনি তাদের নীচে ছুঁড়ে ফেলার আদেশ দেন।
এটা কবেকার ঘটনা?
তিন সপ্তাহ পূর্বের। এই ঘটনার কয়েকদিন পরে, আপনার ভাই ঘোড়ার বিচালির খোঁজে আমাদের যখন পাহাড়ে পাঠান, আমরা তখন আর কাবুলে ফিরে না গিয়ে আপনার খোঁজে রওয়ানা হই।
তোমরা কাবুল থেকে আসবার আগে সেখানের পরিস্থিতি কেমন ছিল?
আপনার ভাই দূর্গপ্রাসাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছিলেন এবং অবরোধ মোকাবেলার জন্য রসদ মজুদে ব্যস্ত ছিলেন- সে কারণেই তিনি অনেকের মতো আমাদেরও ঘোড়ার বিচালির খোঁজে পাহাড়ে প্রেরণ করেছিলেন। সুলতান, তিনি আপনাকে ভয় পান। পুরো কাবুলের অধিবাসীদের ন্যায়, তিনি নিজেও জানেন যে বিশাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আপনি এগিয়ে আসছেন…যে আপনার অধীনে পারস্যের সৈন্যরাও রয়েছে এবং দুনিয়ার কাছে সে নয়, আপনিই হলেন পাদিশাহ…
হুমায়ুন লোকটার মুখের মোসাহেবি অভিব্যক্তি উপেক্ষা করে। আমার নবজাতক সন্তানের কথা কি তুমি কিছু জানো? কাবুলে কি তুমি তাঁকে কখনও দেখেছো?
লোকটার চোখে মুখে একটা অনিশ্চিত ভাব ফুটে উঠে। না, সুলতান। আমি জানতামই না যে তিনি সেখানে রয়েছেন…
তুমি নিশ্চিত- কান্দাহার থেকে রাজপরিবারের এক সন্তান আর তাঁর দুধ-মাকে নিয়ে আসবার ব্যাপারে তুমি কিছুই শোননি?
না, সুলতান, এমন কিছুই আমার কানে আসেনি।
হুমায়ুন কাফির গোত্রপতির দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কারও প্রতি বা কোনো কিছুর প্রতি এই লোকটার বিন্দুমাত্র আনুগত্য নেই। কার কাছে ধনসম্পদপূর্ণ সিন্দুক রয়েছে কেবল সেটা তাঁর কাছে বিবেচ্য বিষয়। আর সে কামরানের বাহিনীতে কাজ করেছে। হুমায়ুনের সহজাত প্রবৃত্তি তাকে বলে যে এই মুহূর্তে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই লোকটাকে তার সঙ্গীসাথীসহ শিবির থেকে তাড়িয়ে দেয়া উচিত। কিন্তু তাহলে অন্য যেসব গোত্রের লোকেরা তাঁর সাথে যোগ দেবার কথা ভাবছে, তারা হয়ত এরফলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। একটা কঠিন আর দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং এই সময় সম্ভাব্য প্রতিটা সৈন্যের সহায়তা লাভ করাটা তার জন্য জরুরী। তাঁর নিজের আব্বাজানও বর্বর পাহাড়ী গোত্রগুলোর ভয়ঙ্কর লড়াকু ক্ষমতা খুব ভালোমতো যুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন, যদিও তিনি তাদের সবসময়ে কঠোর হাতে শাসন করেছেন।
তুমি আর তোমার লোকেরা আমার বাহিনীতে যোগ দিতে পারো, কিন্তু তাঁর আগে একটা বিষয় ভালোমতো শুনে রাখে। কিন্তু কোনো ধরনের অবাধ্যতা আর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তোমরা যদি আমার অধীনে একজন খাঁটি যোদ্ধার ন্যায় আচরণ কর তাহলে কাবুলের পতন হবার পরে সেজন্য তোমাদের যথোচিতভাবে পুরস্কৃত করা হবে। আমার এই শর্ত তোমরা মানতে রাজি আছো?
জ্বী, সুলতান।
হুমায়ুন তাঁর প্রহরীদের দিকে তাকায়। এই লোকটাকে জাহিদ বেগের কাছে নিয়ে যাঁর যাতে তিনি একে আর এর সঙ্গীসাথীদের কি দায়িত্ব দেয়া যায় সেবিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অস্তগামী সূর্যের কিরণে পুরো উপত্যকায় একটা বেগুনী ছায়া ছড়িয়ে যেতে এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, আরো একবার নির্জনতার জন্য হুমায়ুনের ভেতরে একটা আর্তি জেগে উঠে, নিজের উপরে চেপে বসা দায়িত্বের বোঝা থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার একটু মুক্তি প্রয়োজন। দেহরক্ষীদের বিদায় করে সে তার গায়ের আলখাল্লাটায় নিজেকে ভালোমতো ঢেকে নিয়ে, সারিবদ্ধ তাবুর ভিতর দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করে, সেখানে সেনাছাউনির সীমানা বরাবর সে কিছুক্ষণ একলা পায়চারি করতে চায়। কিন্তু সেনাছাউনির সীমানার কাছে পৌঁছাবার পরেও সে সেখানে না থেমে বেষ্টনী অতিক্রম করে হাঁটতেই থাকে অন্ধকারের মাঝে ক্রমশ মিশে যাওয়া দূরের পাহাড়ের আবছা অবয়বের দিকে সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় এগিয়ে যেতে থাকে।
