আপনি ঠিকই বলেছেন- আমি আসলে হতাশা থেকে এসব আবোলতাবোল কথা বলেছি। আমি নিজের মনকে বুঝিয়েছিলাম যে দুই কি একদিনের ভিতরে আমি আকবরকে নিজের কাছে পাবো। আমারই বোকামি হয়েছে এভাবে আশা করা।
সেটাই স্বাভাবিক। আমিও নিজেকে সেইরকম প্রবোধই দিয়েছিলাম। আমাকে এখন অবশ্যই ধৈর্য আর একাগ্রতার পাঠ নিতে হবে। আমরা পরস্পরকে মানসিক শক্তি যুগিয়েই টিকে থাকবে এবং সফল হব।
কয়েক মিনিট পরে, হুমায়ুন নিজের নিয়ন্ত্রক তাবুতে ফিরে এসে, একটা নীচু টুলের উপরে বসে, এক টুকরো কাগজ নিয়ে তার উপরে কয়েকটা বাক্য লিখে। তারপরে, যদিও তখন অনেক রাত হয়েছিল সে তার যুদ্ধকালীন মন্ত্রণা পরিষদকে সমবেত হবার আদেশ দেয়।
আহমেদ খান, আমি চাই কান্দাহারে আমার সৎ-ভাই আসকারির কাছে আজ রাতেই এই চিঠিটা পৌঁছে দেবার জন্য আপনি একদল সৈন্য পাঠাবেন। তাঁর প্রতি আমার বক্তব্য একেবারেই সাদামাটা। আগামীকাল সকালে আমার সৈন্যবাহিনীর পুরোভাগে অবস্থান করে আমি তোমার তোরণদ্বারের সামনে উপস্থিত হব। আমাদের বোনের কাছে তুমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেই মোতাবেক তুমি যদি আমার জন্য তোরণদ্বার খুলে দাও, তোমার প্রাণ সংশয় হবে না, যদিও তুমি আমার বন্দি হিসাবে থাকবে। আমার সাথে প্রতারণা করার সামান্যতম প্রয়াসও যদি তুমি নাও, তোমার এবং সেই সাথে তোমার লোকদের জীবনের নিরাপত্তা আমি দিতে পারবো না। পছন্দ করার এক্তিয়ার এখন তোমার।
আহমেদ খান চিঠিটা নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাবু থেকে বের হয়ে যাবার পরে হুমায়ুন তার অন্যান্য সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়।
আগামীকাল, আমার সৎ-ভাই যদি তাঁর কথা রাখে তাহলে কান্দাহার আমাদের করায়ত্ত হবে। বৈরাম খান, আমি আপনাকে অনুরোধ করবো দূর্গে রক্ষীসেনা হিসাবে মোতায়েন করার জন্য, আপনার লোকদের ভেতর থেকে দুই হাজার জনকে নির্বাচিত করতে- যাদের নেতৃত্বে থাকবে আপনার সবচেয়ে বয়োজ্যোষ্ঠ আর বিশ্বস্ত সেনাপতিরা।
বৈরাম খান মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আমি আমার তীরন্দাজ আর তবকিদের ভেতর থেকে সৈন্য বাছাই করবো এবং আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে দূর্গের আশেপাশের এলাকায় টহল দেবার জন্য আমি এদের সাথে একটা অশ্বারোহী বাহিনীও সন্নিবেশিত করবো।
বৈরাম খান, দারুন একটা পরামর্শ দিয়েছেন। কান্দাহার রক্ষার জন্য আমাদের রক্ষীসেনা মোতায়েন করার কাজ শেষ হলেই আমরা কাবুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। কষ্টকর পাহাড়ী এলাকার ভিতর দিয়ে যদিও এটা একটা দীর্ঘ যাত্রা হবে, আমাদের অবশ্যই দ্রুত এবং অনমনীয় ভঙ্গিতে ভ্রমণ করতে হবে। অতিক্রান্ত প্রতিটা দিন আমার সৎ-ভাইকে অন্যদের সাথে মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তোলার এবং সেখানে নিজের অবস্থান সুসংহত করার জন্য অতিরিক্ত সময় দান করবে।
আমাদের রসদবাহী বহরের কি হবে? এটা আমাদের অগ্রযাত্রার গতি শ্লথ করে দেবে, জাহিদ বেগ জানতে চায়।
আমাদের সাথে আমরা কেবল সেটাই রাখবো যা আমরা বহন করতে পারবো এবং আমাদের মালবাহী আর রসদের বহর যার ভিতরে আমাদের কামানগুলোও রয়েছে রক্ষার জন্য একটা ছোট কিন্তু চৌকষ দলকে দায়িত্ব দেয়া হবে, তারা তাঁদের পক্ষে যতটা দ্রুত গতিতে সম্ভব আমাদের অনুসরণ করবে। কিন্তু এখন অনেক রাত হয়েছে। সুবেহ সাদিকের এক ঘন্টা পূর্বে আমরা আবার মিলিত হব, কাবুলের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে।
*
উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত ধুসর পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে অবস্থিত, চওড়া উপত্যকা, যেখানে হুমায়ুনের টকটকে লাল নিয়ন্ত্রক তাবু সূর্যকেন্দ্রে রেখে রশ্মির ন্যায় অস্থায়ী তাবুর সারি চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক তাবুর ডানপাশে তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ আধিকারিকদের তাবুগুলো অবস্থিত, সেখানে বৈরাম খানের তাবুর উপরে উজ্জ্বল লাল রঙের একটা নিশান বাতাসে সগৌরবে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। বামপাশে চামড়ার ফালি দিয়ে বাঁধা কাঠের তিরস্করণীর মাঝে রয়েছে হারাম তাবুগুলো যেখানে মেয়েরা তাদের নিভৃত বাসস্থানের বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। হামিদা আর গুলবদন মালামাল বহনকারী শ্লথ বহরের চেয়ে হুমায়ুনের সাথেই ভ্রমণের বিষয়ে বেশী আগ্রহী ছিল এবং দুজনের একজনও দিনে চৌদ্দ ঘন্টার আবশ্যিক অগ্রগমন নিয়ে একবারের জন্যও অভিযোগ জানায়নি।
কিন্তু তাঁদের সবার আন্তরিক প্রয়াস সত্ত্বেও এখনও তারা কাবুল থেকে দেড়শ মাইল উত্তরপূর্বে অবস্থান করছে এবং তাঁদের অগ্রগমনের গতি বৃদ্ধির ব্যাপারে হুমায়ুনের আর খুব বেশী কিছু একটা করণীয় নেই। যাত্রাপথের পুরোটা সময় জুড়েই শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। এখন যদিও অক্টোবর মাসের গোড়ার দিক, ইতিমধ্যেই দমকা বাতাসের সাথে তুষারকণার দেখা পাওয়া যাচ্ছে। কিছুদিনের ভিতরেই পুরোদস্তুর শীত পড়বে।
একটা কেবল আশার কথা যে সে কাবুল অভিমুখে যাত্রা শুরু করার পর থেকে তাঁর সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা নতুন সৈন্যের আগমনে ফুলেফেঁপে উঠেছে। আহমেদ খান তাঁকে এইমাত্র জানিয়ে গেল যে কামরানের বাহিনী থেকে আরেকদল স্বপক্ষত্যাগী তাঁর অস্থায়ী শিবিরে উপস্থিত হয়ে তাঁর প্রতি নিজেদের আনুগত্যের কথা প্রকাশ করেছে। হুমায়ুন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের দলনেতাকে তার সামনে হাজির করার আদেশ দিয়েছে।
