সুলতান আসছেন! জওহর চিৎকার করে বলছে, সে শুনতে পায়। সে গুলবদনকে বহনকারী শকট থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে ঘোড়ার মুখটা একপাশে সরিয়ে এনে প্রাণীটাকে দাঁড় করিয়ে পিছলে তার পিঠ থেকে মাটিতে নামে। জওহরও ইতিমধ্যে তাঁর বাহন থেকে নেমে এসেছে এবং বিনা বাক্য ব্যয়ে হুমায়ুনকে গুলবদনের গাড়ির দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। জওহরের হাতে ধরা মশালটা নিয়ে হুমায়ুন গাড়ির ঝালর একপাশে সরিয়ে ভেতরে অবস্থানরত নিজের সৎ-বোনের দিকে তাকায়।
তুমি নিরাপদে ফিরে এসেছে দেখে আমি ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞ। কামরান কি বলেছে? আমার শর্ত কি সে মানতে প্রস্তুত?
গুলবদন আলোর দিকে খানিকটা ঝুঁকে আসে তার কিশোরী মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়। হুমায়ুন, আমি দুঃখিত। কামরান সেখানে ছিল না। কেবল আসকারির সাথে দেখা হয়েছে। আপনার অগ্রযাত্রার খবর শুনে কয়েক সপ্তাহ আগেই সে সদলবলে কাবুল রওয়ানা হয়েছে যার মানে আপনার কবল থেকে সে শহরটাকে রক্ষা করতে চায়।
আর আকবর?
কাবুল যাবার সময় কামরান তাকেও সাথে নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু হুমায়ুন এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। আসকারি আমাকে নিশ্চিত করেছে, যে আকবর সুস্থ আছে এবং মাহাম আগা তার সাথেই রয়েছে…
আমি কিভাবে আসকারির কথা বিশ্বাস করি, যখন সে এমন একজন মানুষের প্রতি অনুগত যে একটা শিশুকে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত?
আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটা নিয়ে আসকারিও মনে মনে লজ্জিত। সেই সাথে তাঁর কথা শুনে আমার মনে স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে, সে মনে করে কামরান তাকে এখানে কান্দাহারে অবস্থানের আদেশ দিয়ে রেখে গিয়েছে আপনার ক্রোধের অনলে দগ্ধ হতে।
আসকারি কি কান্দাহার আমার কাছে সমর্পন করতে রাজি আছে?
সে সমর্পন করবে। আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তার এবং তাঁর লোকদের জীবন আপনি বখশ দিবেন।
হুমায়ুনের ঠোঁটের কোণে বিষণ্ণ একটা হাসির রেখা ফুটে উঠে। তার এবং তার লোকদের প্রাণ সংশয় হবার কোনো কারণ এখন ঘটেনি কিন্তু আকবরের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের শর্তেই আমি তাঁদের এখান থেকে যেতে দেব। আমার সন্তানকে খুঁজে পাওয়া এবং কামরানের সাথে আমার বোঝাঁপড়া না হওয়া পর্যন্ত অন্তত আসকারিকে আমার জিম্মায় থাকতে হবে। হিন্দালের কি খবর? তার ভাগ্য সম্পর্কে কি তুমি কিছু জানতে পেরেছো?
আমার ভাবনায় সবসময়েই আমার ভাইজান উপস্থিত আছে এবং তার ভাগ্যে কি ঘটেছে- সেটা জানার জন্য আমি আসকারিকে রীতিমতো চাপ দিয়েছি… সে আমাকে বলেছে যে কামরান আদেশ দিয়েছিল তাঁকে জালালাবাদের দূর্গে নিয়ে গিয়ে সেখানে তাঁকে বন্দি করে রাখতে। কিন্তু সেখানে যাবার পথে সে কোনোভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। সেটাও প্রায় বেশ কয়েকমাস আগের কথা এবং আসকারি জানে না সে পালিয়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে… আশা করি আমার ভাই নিরাপদেই আছে।
আমিও সেটাই চাই। আমাদের ভিতরের মতবিরোধের জন্য আমার উপরেও খানিকটা দায় বর্তায় এবং অন্যদের চেয়ে তাকেই আমার নিজের ভাই বলে বেশী। মনে হয়। কিন্তু গুলবদন, তুমিই হলে আমার সত্যিকারের আপন বোন এবং হামিদার বিশ্বস্ত বন্ধু। তুমি আজ খুব কঠিন একটা কাজ করেছে এবং সেজন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
বাবরের সন্তানদের মাঝে এমন রক্তক্ষয়ী বিভেদের বিষয়টা মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর। ধীর পদক্ষেপে নিজের ঘোড়র কাছে ফিরে যাবার সময় বিষণ্ণতা আর হতাশার একটা শেকল হুমায়ুনকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে। অস্থায়ী শিবিরে ফিরেই সে সরাসরি হামিদার সাথে দেখা করতে যায়। সে জেনানাদের জন্য স্থাপিত তাবুর ভেতর অপেক্ষা করেছিল এবং হুমায়ুনের চোখে মুখে বিষণ্ণতার গাঢ় দেখে তাঁর কালো চোখের মণি থেকে আশার শেষ রশ্মিটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কামরান তাহলে আপনার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছে?
সেটা করলেই বোধহয় ভালো হত। সে এখানেই নেই। হামিদা- সে আকবরকে কাবুলে নিয়ে গিয়েছে…
হামিদার চোখে ধীরে কান্নার বারিধারা জমে উঠতে, হুমায়ুন তাকে নিজের কাছে টেনে আনে। আমার কথা শোন। আমাদের হতাশ হলে চলবে না। আসকারি এখনও কান্দাহারেই আছে এবং গুলবদনকে সে আশ্বস্ত করে বলেছে যে আকবর সুস্থ আছে। এটা অন্তত একটা সুখবর।
কিন্তু এখান থেকে কাবুল অনেক দূরে…।
এখান থেকে কাবুলের দূরত্ব তিনশ মাইল এবং আমাদের সন্তানকে উদ্ধারের জন্য আমি তিন হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে প্রস্তুত। তুমি জান সেটা…
আমি জানি কিন্তু কাজটা কঠিন। আমি সারাটা দিন কেবল আকবরের কথাই ভাবি এবং তার ভাগ্যে কি ঘটতে পারে, এমনকি আমি যখন ঘুমাতে চেষ্টা করি তখনও আমার স্বপ্নে কেবল এসব ফিরে ফিরে আসে। আমি যখন গর্ভবতী ছিলাম এবং মালদেবের নাগাল থেকে আমার পালাচ্ছিলাম, আমার গর্ভ থেকে জীবন্ত অবস্থায় তাকে আলাদা করার অনুভূতি কেমন হবে, আমি চেষ্টা করেও নিজেকে সেই কল্পনা করা থেকে বিরত রাখতে পারিনি। নিজের দেহে আমি ইস্পাতের ফলার শীতল স্পর্শ যেন অনুভব করতে পারতাম। দুশ্চিন্তাটা এতোই প্রবল ছিল…ঠিক অনেকটা শারীরিক যন্ত্রণার মতো। আমি জানি না আর কতদিন আমি এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবো।
আর কিছুদিন মনটাকে শক্ত রাখো… আমাদের সন্তানের স্বার্থেই তোমাকে শক্ত হতে হবে, মালদেব যখন আমাদের বিনাশের পরিকল্পনা করেছিল তখন তুমি যেমন শক্ত ছিলে। আসকারি কান্দাহার আমার কাছে সমর্পনের প্রস্তাব করেছে। আমি যত শীঘ্রি সম্ভব এখানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো, তত দ্রুত আমরা কাবুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব। হামিদার দেহের আড়ষ্ঠতা সামান্য শীথিল হয়েছে, সে টের পায় এবং হুমায়ুনের কাছ থেকে সে এবার এক পা পেছনে সরে আসে।
