হুমায়ুনের মাথায় ধীরে ধীরে একটা পরিকল্পনা অবয়ব লাভ করতে শুরু করে। কামরানের সাথে আলোচনা শুরুর জন্য একটা উপায় তাঁকে খুঁজে বের করতেই হবে। সমঝোতার ধারণা যদিও তার মাঝে বিবমিষার উদ্রেক ঘটায়, সে ভালো করেই জানে তার জায়গায় তার মরহুম আব্বাজান থাকলে এই একই সিদ্ধান্ত নিতেন। বাবর কি নিজের অহঙ্কার জলাঞ্জলি দেননি এবং সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য সাইবানি খানের সাথে সমঝোতা করেননি? খানজাদাও তাঁকে ঠিক এই পরামর্শই দিত। ধৈর্য ধারণের, চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য সাময়িক ত্যাগ স্বিকারের গুরুত্ব সম্বন্ধে তার ধারণা যে কারো চেয়ে অনেক পরিশীলিত ছিল।
কিন্তু তার পক্ষে কথা বলার মতো যোগ্য কে আছে? তাঁর নিজের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। কামরান যদি তার সাথে দেখা করতে রাজিও হয়, তাঁরা যদি মুখোমুখি হতে পারে, তাদের ভেতরে পরস্পরের প্রতি ঘৃণার মাত্রা এতই প্রবল যে সেখানে হাত থাকতে মুখ নিপ্রয়োজন পরিস্থিতি অচিরেই সৃষ্টি হবে। কিন্তু কাশিম বা তার সেনাপতিদের একজনকে সে পাঠাতে পারবে না। পুরো বিষয়টার ভিতরে একটা পারিবারিক আবহ রয়েছে। মোগল রীতিতে বিদ্যমান আনুগত্য আর সম্মানের প্রতিটা মূলনীতি কামরান কিভাবে লঙ্ন করেছে, কিভাবে তাঁর উচ্চাশা বাবরের উত্তরাধিকারকে দুর্বল আর বিভক্ত করেছে, তাকে সেটা অবশ্যই বোঝাতে হবে।
হুমায়ুনের সফরসঙ্গীদের ভিতরে কেবল একজনই রয়েছে যিনি এসব বিষয় কামরানের সাথে উপস্থাপন করতে পারবেন, যার ধমনীতে তাঁর এবং আকবর উভয়ের রক্তই বইছে। মোগল রমনীরা প্রায়শই গোত্রের ভেতরে শান্তি স্থাপনকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে এবং সে তার যেকোনো পরামর্শদাতার সমান ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তার অধিকারী।
নিজেকে এভাবে জাহির করাটা যদিও অসম্মানজনক, তার সৎ-বোনের কোনো ক্ষতি করার কথা কামরান চিন্তাও করবে না এবং সে এমনকি শুনতেও রাজি হতে পারে এবং সে এমনকি শুনতেও রাজি হতে পারে- যদি তার ব্যত্তিগত অনুরোধে কাজ না হয়, হুমায়ুনের কাছ থেকে সে কি বার্তা বয়ে এনেছে সেটা নিদেনপক্ষে তারা উপস্থাপন করতে পারবে। আকবরের কোনো ক্ষতি না করে কামরান যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়, সে তাহলে আসকারি এবং তাঁদের সাথের লোকজন আর তাঁদের অস্ত্র নিয়ে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই বিদায় নিতে পারবে এবং সেই সাথে হুমায়ুনও তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেবে- তাদের আব্বাজান বাবরের নামে সে শপথ করছে তাদের পিছু ধাওয়া সে করবে না।
এখন কেবল একটা প্রশ্নই বাকি আছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান গুলবদন কি আদৌ স্বেচ্ছায় আরম্ভ করবেন। কিন্তু হুমায়ুন যখন ইশারায় তার সেনাপতিদের নিজ নিজ ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ঢাল বেয়ে পাহাড়ের উপরের দিকে উঠে নিজ নিজ বাহিনীর সাথে মিলিত হতে আদেশ দেয়, সে নিশ্চিত প্রশ্নের উত্তর সে ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছে।
*
সুলতান, গুলবদন বেগম ফিরে আসছেন।
হুমায়ুন তার নিয়ন্ত্রক তাবুর বাইরে চিৎকারের শব্দ শুনতে পেয়ে, সে যে টুলের উপরে বসে ছিল সেটা থেকে তড়াক করে উঠে এবং তাবুর আচ্ছাদন একপাশে সরিয়ে বাইরে দ্রুত ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার আলো আধারির মাঝে এসে দাঁড়ায়। হুমায়ুনের সেনাছাউনি আর দূর্গের মাঝে অবস্থিত উপত্যকার বুকের উপর দিয়ে মিটমিট করে জ্বলতে থাকা একসারি আলো ধীরে ধীরে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে- গুলবদনের প্রতিরক্ষা সহচর হিসাবে জওহরের সাথে সে প্রহরীদের যে দলটা পাঠিয়েছিল মশালগুলো তারাই বহন করছে, তারা গুলবদনকে বহনকারী শকটের সামনে আর পেছনে রয়েছে।
সাময়িক যুদ্ধবিরতির নিশান বহন করে সাত ঘন্টা আগে সে যাত্রা করেছিল। অন্ধকারের ভিতরে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকার সময়, হুমায়ুনের ক্ষণিকের জন্য মনে হয় যে গুলবদনের কোলে সে হয়ত আকবরকে দেখতে পাবে কিন্তু এমন অভিলাষী ভাবনা অচিরেই কাণ্ডজ্ঞানের কাছে পরাভব মানে। কামরানের মতো পাষণ্ডের কাছে আবেগের কোনো স্থান নেই। সে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আকবরকে আটকে রাখতে চেষ্টা করবে, যখন সে নিশ্চিত জানে হুমায়ুনের কথার বরখেলাপ হবে না।
সে যাই হোক, নিজের অস্থিরতাকে বশে রাখতে ব্যর্থ হয়ে, হুমায়ুন দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা স্থানটার দিকে দৌড়ে যায়, যেখানে ঘাস খাবার জন্য তার ঘোড়াকে বেঁধে রাখা হয়েছে। পর্যানের জন্য অপেক্ষা না করে, সে ঘোড়ার গলার দড়িকেই লাগাম হিসাবে ব্যবহার করে, প্রাণীটার কানে ফিসফিস করে আদেশ দেয়, দড়ি টপকে গিয়ে উপত্যকার মাঝ দিয়ে দৌড়ে যেতে। তাঁর হৃৎপিণ্ড এত জোরে স্পন্দিত হতে থাকে যে ক্ষণিকের জন্য তার মনে হয় নরম ঘাসের বুকে ধাবমান খুরের ধুপধুপ শব্দ বুঝি সেটার শব্দ। নিজের লোকদের সামনে নিজেকে পক্ষপাতহীন আর নিরুত্তাপ নেতা হিসাবে প্রমাণ করতে, হামিদার দিকে আত্মবিশ্বাসী, নিরুদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে গিয়ে নিজের অনুভূতিকে কতবার তাঁকে এভাবে চেপে রাখতে হবে। কিন্তু চারদিক থেকে ধেয়ে আসা অন্ধকারের মাঝে নিজের কাছে তার স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে যে কোনো সাধারণ মানুষের মতোই সে উৎকণ্ঠা আর ভয়ে আক্রান্ত হয়, বিশেষ করে যখন তার প্রিয়জনদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং সেটা নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্বের ভেতর পড়ে।
