জাহিদ বেগ হুমায়ুনের বাম পাশে অবস্থান কিন্তু তার ডান পাশে রয়েছে পার্সী সেনাপতি রহিম বেগ। লম্বাটে, নিখুঁত মুখাবয়বের অধিকারী বয়স্ক এক লোক, তিনি শাহের আত্মীয়-সম্পর্কিত ভাই যিনি হুমায়ুনের যুদ্ধকালীন মন্ত্রণাসভায় পার্সী কবিদের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি করতে পছন্দ করেন কিন্তু নিজের বাহিনীর দৈনন্দিন কর্ম-তৎপরতা দেখাশোনার দায়িত্ব বৈরাম খান নামে এক সহকারীর উপরে ন্যস্ত করেছেন। শেষোক্ত এই যোদ্ধাটিকে এখনও তরুণই বলা চলে- চৌত্রিশ কি পঁয়ত্রিশের বেশী তাঁর বয়স হয়নি। কিন্তু দৈহিক কাঠামোয় স্কুলত্বের একটা ধাঁচ থাকায় এবং মুখের ডানপাশে একটা পুরাতন ক্ষতচিহ্নের কারণে তাঁকে অনেক বেশী বয়স্ক বলে মনে হয়। একজন পার্সীর তুলনায় তাঁর চোখের মণির রঙ একটু বিচিত্রই বলতে হবে- গাঢ় প্রায় ধূম্রনীল- এবং চূড়াকৃতি শীর্ষদেশ বিশিষ্ট ইস্পাতের শিরোম্রাণের নীচ দিয়ে তার লম্বা কালো চুলের বেনী উঁকি দিচ্ছে, শিরোস্ত্রাণের সাথে ধাতব শৃঙ্খল নির্মিত বর্মের একটা ঝালর রয়েছে গলা এবং মুখাবয়বের উভয়পার্শ্বকে সুরক্ষিত রাখতে আর শিরোস্ত্রাণের উপরে একটা সুদৃশ্য ময়ূরের পালক শোভা পাচ্ছে।
কাঝভিন ত্যাগ করার পরে শুরুর দিকে হুমায়ুন কোনো প্রশ্ন করা ছাড়া বৈরাম খানকে কদাচিৎ কথা বলতে দেখা যেত। অবশ্য যতই দিন যাচ্ছে ততই তাঁর মিশুক স্বভাব বিকশিত হচ্ছে। যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করেই সে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করে এবং হুমায়ুনের সেনাপতিদের বক্তব্য সে একই সৌজন্য আর বিচক্ষনতার সাথে শ্রবন করে। যার ফল আখেরে ভালো হয়। রুস্তম বেগ যদি নিজেকে বেশী মাত্রায় সক্রিয় করার প্রয়াস নিতেন এবং বৈরাম খান মাত্রাতিরিক্ত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতেন তাহলে সেটা হুমায়ুনের মুষ্ঠিমেয় সৈন্য আর তাঁদের চেয়ে সংখ্যা অনেকবেশী পার্সীদের মাঝে নিশ্চিতভাবেই একটা মতবিরোধের জন্ম দিত। অবশ্য সে রকম কিছুই হয় না, দুটো দলই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে। হুমায়ুনের শিয়া মতাবলম্বী হবার বিষয়টা- যা ছিল সময়ের দাবী অনুযায়ী একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, তার লোকেরা আপাত নিস্পৃহ ভঙ্গিতে গ্রহণ করেছে দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারা কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে যেখানে স্বয়ং শাহ্ নিজে তাঁর মাথায় রক্তলাল রঙের তাজ পরিয়ে দেয়, হুমায়ুনের মতো তারা অনুধাবন করতে পেরেছে যে তাঁদের সবার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য এটা জরুরী।
হুমায়ুন সামনের দিকে তাকিয়ে অশ্বারোহীদের একটা ছোট দলকে আস্কন্দিত বেগে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে, তাঁদের চারপাশের বাতাসে একটা ধূলিঝড় জন্ম নিয়েছে। দলটায় দুজন গুপ্তদূতসহ আহমেদ খান এবং রুস্তম বেগের মনোনীত দুজন পার্সী অশ্বারোহী রয়েছে যাদের পথপ্রদর্শক হিসাবে পাঠান হয়েছে।
সুলতান, আমরা হেলমান্দ নদী থেকে পনের মাইল দূরে অবস্থান করছি।
চমৎকার। হুমায়ুনের ঠোঁটের কোণে হাসির একটা হাল্কা রেখা ফুটে উঠে। আর দুইদিন- খুব সম্ভবত আগামীকালই- সে পুনরায় হেলমান্দের বরফশীতল পানি আরো একবার পার হবে এবং এবার তাকে অনুসরণ করে অমিত শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনীও নদী অতিক্রম করবে।
*
খয়েরী-বেগুনী পর্বতমালার তীক্ষ্ণ অভিক্ষিপ্ত অংশের প্রেক্ষাপটে কান্দাহার দূর্গের চওড়া পাথুরে দেয়াল এবং সরু জানালাযুক্ত গম্বুজকে ভয়ানক দূর্ভেদ্য মনে হয়। এখন যদিও কেবল সেপ্টেম্বর মাস চলছে, দূর্গ থেকে আধ মাইল দূরে একটা জঙ্গলাকীর্ণ পাথুরে টিলার উপরে একটা নিম্নমুখী ঢালের কাছে হুমায়ুন আর তাঁর সেনাপতির দল তাদের রোকের অবস্থান থেকে দূর্গ পর্যবেক্ষণের কালে হিম শীতল বাতাসে তারা রীতিমতো কাঁপতে থাকে।
আকবর ঐ দূর্গের অভ্যন্তরে কোথায় রয়েছে? হুমায়ুন খুব ভালো করেই জানে আর কিছুক্ষণের ভিতরে সে যে সিদ্ধান্ত নেবে, তার উপরেই তাঁর সন্তানের বাঁচামরা নির্ভর করছে। কামরানকে মূর্খ ভাবার কোনো কারণ নেই। হুমায়ুনের অগ্রাভিযান নিশ্চয়ই তার গুপ্তচরদের নজরে এসেছে এবং সে ইতিমধ্যে অবশ্যই জেনে গিয়েছে যে- হুমায়ুনকে পোড় খাওয়া পার্সী সৈন্যদের একটা বিশাল দল সহায়তা করায় শক্তির পাল্লা এবার তার দিকেই ঝুঁকে আছে। আক্রমণ কিংবা অবরোধ করে যেভাবেই হোক কান্দাহারের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। এমন পরিস্থিতিতে কামরানের কাছ থেকে কি আশা করা যায়? হুমায়ুন যদি অবরোধ তুলে না নেয় তাহলে সে আকবরের ক্ষতি করার হুমকি দিতে পারে? কামরানের দ্বারা এটা সম্ভব। অন্যদিকে হুমায়ুন নিজেকেই আবার নিজকে প্ৰবোধ দিতে চেষ্টা করে যে তার সৎ-ভাই খুব ভালো করেই জানে যে আকবরকে হত্যা করলে- সে দরকষাকষি করার টেবিলে তাঁর সবচেয়ে কার্যকরী সস্তার কাউন্টারের সুবিধা সে হারাবে…
বৈরাম খান এবং রুস্তম বেগ দূর্গের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এবং আক্রমণের জন্য সম্ভাব্য দুর্বল স্থান আর দূর্গের আক্রমণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নিয়ে নিবিষ্ট মনে আলোচনা করছে। নাদিম খাজাও দূর্গের বহিরঙ্গের দিকে একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে রয়েছে। কান্দাহারের মাথার উপরের পর্বতমালা থেকে আগত একজন গোত্রপতি কারণে তার কাছে দূর্গটা একটা পরিচিত দৃশ্যপট কিন্তু হুমায়ুনের মতো তার ভাবনারও একটা বিরাঠ অংশ জুড়ে রয়েছে নিজের পরিবারের জন্য তাঁর উৎকণ্ঠা। তাঁর স্ত্রী মাহাম আগা এবং তাদের আপন সন্তান, আকবরের মতোই, দূর্গের দেয়ালের অভ্যন্তরে বন্দি অবস্থায় রয়েছে। নাদিম খাজার কাঁধে হুমায়ুন কিছুক্ষণের জন্য নিজের হাত রাখে এবং পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁরা দুজনেই বুঝতে পারে যে তাঁদের মনের ভিতর একই আবেগ মথিত হচ্ছে। তাঁরা দুজনেই চৌকষ যোদ্ধা, যাদের সহজাত প্রবর্তনাই হল ঝড়ের প্রচণ্ডতা নিয়ে দূর্গের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের প্রিয়জনকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা। কিন্তু এসব হঠকারী প্রণোদনায় যে কার্যসিদ্ধি হবে না সেটাও তারা বুঝতে পারে…
