হুমায়ুন সরাসরি হামিদার কাছে যায়। হামিদার আবাসনকক্ষে প্রবেশের সময় তাঁর মুখের উদগ্রীব, আশান্বিত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে সে নিজের বিড়ম্বনা যেন আরো ভালো করে অনুভব করতে পারে।
উনি কি বললেন? তিনি কি আমাদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছেন? পরিচারকের দল বিদায় নেয়ার সাথে সাথে হামিদা হুমায়ুনের কাছে জানতে চায়।
কামরানের সাথে শাহের কোনো ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক নেই এবং তাঁকে পরাজিত করার জন্য আমাকে একদল সৈন্য দিয়ে সহায়তা করবেন বলে কথা দিয়েছেন কিন্তু সেজন্য আমাকে একটা মূল্য পরিশোধ করতে হবে…
কি মূল্য? তাকে কোহ-ই-নূরতো দেয়া হয়েছে। আমাদের আরও কত কিছু তাঁকে দিতে হবে?
সে আমাকে শিয়া মতাবলম্বী হিসাবে দেখতে চায়…।
ব্যস এই কথা? হামিদা হুমায়ুনে দিকে এগিয়ে এসে দুহাতে তাঁর মুখটা তুলে ধরে।
ব্যাপারটা মোটেই সাধারণ নয়। শাহ্ ইসমাইল চেষ্টা করেছিলেন আমার মরহুম আব্বাজান বাবরকে শিয়া মতাবলম্বী করতে তাঁকে আরেকটু হলে সে যাত্রা প্রাণ হারাতে হত এবং সমরকন্দের বিনিময়ে তিনি সেবার প্রাণে বেঁচে যান। আমাদের গোত্রের লোকের এই একটা কারণে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে তারা তৈমূরের বংশে জন্ম নেয়া যুবরাজ শিয়া মতাবলম্বীদের অনুসারীতে পরিণত হয়েছে বলে সন্দেহ করায় তার চেয়ে খুনী উজবেক কিন্তু সুন্নী মুসলমান সাইবানি খানের শাসন মেনে নিয়ে তার দিকে মৈত্রীর হাত বাড়িয়ে দিতে কুণ্ঠিত হয় না…
হামিদা তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে দুচোখে অবিশ্বাস নিয়ে এবার তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তখনকার কথা ছিল আলাদা। আমরা এখন সমরকন্দে অবস্থান করছি না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, আমাদের সন্তানকে আমরা হারিয়েছি। তাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সাধ্যের ভেতরে আছে এমন সবকিছুই আমাদের করা উচিত…সেটা আমাদের কর্তব্য…যেকোনো কিছুর চেয়ে এটাই আমাদের পবিত্রতম দায়িত্ব। আপনার উচিত বিষয়টা মেনে নেয়া ঠিক আমি যেমন কামরান আকবরকে যখন আমাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়েছিল তখন তাকে ধাওয়া না করার ব্যাপারে আপনার যুক্তি মেনে নিয়েছিলাম।
কিন্তু এরফলে আরও একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায় কেন শাহ তামাস্প এত খাতির যত্ন করেছিলেন… তিনি আসলে ঠিক এই উদ্দেশ্যটা হাসিল করতে চাইছিলেন…মোগলদের শিয়া মতাবলম্বী করবেন। আমার সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার সময় আমি স্পষ্ট সেটা তাঁর চোখে মুখে দেখতে পেয়েছি…
তার কর্তৃত্বের প্রতি একধরনের স্মারক সম্মতি হিসাবে তিনি আপনাকে যে শিয়া মতাবলম্বীদের অনুসারী করতে চাইছেন না সে ব্যাপারে আপনি কি নিশ্চিত?
আমার মনে হয় না যে সে এমন সূক্ষ চিন্তাভাবনার যোগ্য মানসিকতার অধিকারী। আর তুমি কি দেখছো না বিষয়টা? এমনটা যদি হয় তাহলে তো সেটা হবে আরও বিরক্তিকর। আমার সেনাবাহিনীর উপর এর কেমন প্রভাব পড়তে পারে তুমি সেটা একেবারেই বুঝতে পারছে না।
না, আপনিই বরং বিষয়টা বুঝতে চাইছেন না। আমার জন্য না হলেও আমাদের সন্তানের জন্য অন্তত নিজের গর্বকে গলা টিপে হত্যা করুন!
আমার কেবল এই গর্বটুকুই বেঁচে রয়েছে আর তুমি বলছো একেও জলাঞ্জলি দিতে?
আপনার সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। আমাদের পরিস্থিতি এখন এতোটাই বিপজ্জনক যে নৈতিকতা নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ি করাটা আমাদের মানায় না। বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নম নম করে পালন করুন। নিজের অন্তরে আপনি কি বিশ্বাস করেন সেটা কেবল স্মরণ রাখুন। সত্যিকারের গর্ব লোক দেখান কিছু না সেটা অন্তরে ধারণ করতে হয়। সাইবানি খানের হাতে খানজাদাকে সমর্পন করার সময় আপনার আব্বাজানের বাহ্যিক গর্ব কতটা খর্ব হয়েছিল একবার স্মরণ করুন কিন্তু তিনি নিজের অন্তরের সত্ত্বাকে ঠিকই সমুন্নত রেখেছিলেন।
হুমায়ুন কোনো কথা বলে না এবং হামিদা মৃদু কণ্ঠে বলতে থাকে, ব্যাপারটা যাই হোক না কেন, শিয়া আর সুন্নীরা কি একই আল্লাহ্র
উদ্দেশ্যে সিজদা দেয় না? তাঁদের এই বিভক্তি মানুষের সৃষ্টি কোনো ঐশ্বরিক অভিপ্রায় নয়। মহানবির পারিবারিক বিবাদ থেকে এই বিভেদের সূত্রপাত, ঠিক অনেকটাই আপনার নিজের পরিবারকে বিভক্তকারী বিরোধের ন্যায়…
হুমায়ুন মাথা নীচু করে চুপ করে বসে থাকে। নিজের সন্তানকে এবং সেই সাথে হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে চাইলে তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই, হামিদা এই বিষয়ে ঠিকই বলেছে। তার সৈন্য এবং সেনাপতিরা যাই ভাবুক না কেন, সাময়িকভাবে হলেও লাল রেশমের রাজকীয় শিয়া তাজ তাঁকে পরিধান করতেই হবে এবং মসজিদে তার অভিযানের সাফল্য কামনা করে শাহ্ তামাস্পের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সেজদা দিতেই হবে। শিয়া হোক কিংবা সুন্নী, তাঁর উদ্দেশ্য ন্যায়সঙ্গত এবং আল্লাহ্তালা- সর্বশক্তিমান স্রষ্ঠা- নিশ্চয় তার পাশেই থাকবেন…
*
কয়েকদিন পরের কথা, হুমায়ুন একটা আত্মতুষ্টির ভাব নিয়ে মনে মনে ভাবে, তাঁরা বেশ দ্রুতই অগ্রসর হচ্ছে- নিদেন পক্ষে শাহের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কাঝভিন অভিমুখী যাত্রার চেয়ে অনেক দ্রুততো বটেই। হুমায়ুনের ঠিক সামনেই রয়েছে পার্সী তিরন্দাজ আর তবকির দল আর তার ঠিক পেছনেই রয়েছে হামিদা আর গুলবদন এবং তাঁর দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় তাঁদের সাথের পরিচারিকার দল নিজ নিজ গরুর গাড়িতে অবস্থান করছে। তার অবশিষ্ট সৈন্যরা এর ঠিক পেছনেই রয়েছে, তারপরে রয়েছে মালবাহী শকটের বহর যার ভেতরে গরুর গাড়ির উপরে বয়ে নেয়া কামানগুলোও রয়েছে এবং বহরের সবশেষে রয়েছে পার্সী অশ্বারোহীর দল, তাঁদের বর্শার ফলা- মোগলদের বর্শার ফলার চেয়ে চওড়া এবং কোনো অংশেই কম কার্যকরী নয়- ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় চকচক করছে।
