সে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। পূর্বদিকে আমি আমার সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী নই। আপনার মরহুম আব্বাজানের সময়ে পরিস্থিতি যেমন ছিল, আমার সীমান্তে আমি ঠিক তেমনই সুস্থিত অবস্থা কামনা করি। যখন বাবর- আল্লাহতালা তার আত্মাকে বেহেশত নসীব করুন- ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, উপজাতিদের ফাশাইস, কাফির আর অন্যান্য যারা রয়েছে। তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। পারস্যের বণিকেরা মেশহেদ, ইস্ফাহান, এবং সিরাজ থেকে ফারগানা পর্বতমালার অন্যপাশে কাশগড়ে কোনো ধরনের বাধা বিপত্তি ছাড়াই যাতায়াত করেছে। কিন্তু আপনার সৎ-ভাই যেদিন থেকে কাবুল দখল করেছে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে আর আমার লোকদের দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে। আমার সহায়তায় আপনি সেখানে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
শাহ্ যখন এসব কথা বলছিলেন, হুমায়ুনের কেবল দারয়ার ভাষ্য মনে পড়ছিল কিভাবে কাবুল দখলের জন্য সেনাবাহিনী গঠনে আর তাঁদের বেতন দিতে কামরান পারস্যের বণিকদের কাছ থেকে লুঠ করা সোনা ব্যবহার করেছে এবং ভাবে যে এসব বিষয়ে শাহ্ তাসাম্প আদৌ কিছু জানেন কিনা।
আমার মাতৃভূমিতে শীতকাল একটু আগেই আসে এবং আপনার আতিথিয়তার মতোই প্রবল সেই শীতের আগমনের যত পূর্বে সম্ভব আমি আমার অভিযান শুরু করতে চাই। প্রথমে আমি কান্দাহার অভিমুখে রওয়ানা হতে চাই এবং তারপরে প্রথম তুষারপাতের আগেই আমি কাবুলে পৌঁছাতে চাই। আমার সাথে রওয়ানা দেবার জন্য আপনার সৈন্যবাহিনী কখন প্রস্তুত হবে বলে আপনি মনে করেন?
আপনি কাঝভিনে পৌঁছাবার এক সপ্তাহ পূর্বেই আমি সৈন্যবাহিনী সংগঠিত করার কাজ শুরু করেছিলাম। আমি আপনাকে দশহাজার সৈন্যের একটা বাহিনী দিতে পারবো, যাদের ভেতরে থাকবে অশ্বারোহী তীরন্দাজ, তবকি আর গোলন্দাজ বাহিনী আর সেই সাথে অশ্বারোহী যোদ্ধা। তারা এবং তাঁদের সেনাপতি রুস্তম বেগ- দুই সপ্তাহের ভিতরে তাঁদের কামারসমূহ, অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র আর রসদের সরবরাহ নিয়ে প্রস্তুত হতে পারবে। আপনার পরিবারের জেনানারা কি কাঝভিনে অবস্থান করতে আগ্রহবোধ করবেন? আমার ভগিনীর তত্ত্বাবধায়নে তারা স্বাচ্ছন্দেই থাকবেন।
হুমায়ুন মাথা নেড়ে অসম্মতি জানায়। বিপদ আর পথের কষ্ট তাদের কাছে কিছু না। তারা আমার সাথে যেতেই পছন্দ করবেন। আমাদের সন্তানের ভাগ্যে কি ঘটেছে সেই দুশ্চিন্তা আমার স্ত্রীকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। তাঁর সাধ্যের ভিতরে সবকিছু থাকলে আমরা হয়তো আজই রওয়ানা দিতাম।
একজন সম্রাজ্ঞী আর মা হিসাবে তার অনুভূতিগুলো তাকে আরও সম্মানিত করে তুলেছে। মোগল রমণীদের সাহসিকতার গল্প আমি অনেক শুনেছি। আপনার ফুপুজান খানজাদা বেগম সম্পর্কে আমার আব্বাজান ভীষণ উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।
শাহ ইসমাইলের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞ থাকার বহুবিধ কারণ রয়েছে…
তামাস্প তাঁর অলঙ্কারশোভিত হাতের এক অমায়িক ভঙ্গির সাহায্যে প্রশংসাটা গ্রহণ করে। কিন্তু যুদ্ধযাত্রার বিষয়ে আমরা আরো আলোচনা করার পূর্বে, আমার অবশ্যই একটা বিষয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। আপনি একজন সত্যিকারের আল্লাহর বান্দা কিন্তু আমি যখন আপনাকে আমার মতো শিয়া মতাবলম্বীদের অনুসারী না দেখে, সুন্নী মতাবলম্বীদের অনুসারী দেখি ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। আপনি যে সত্যিই আমার ভাই সেটা আমার কাছে প্রকাশ করুন, দেখিয়ে দিন যে আমাদের ভিতরের রক্তের বন্ধনের চেয়েও শক্তিশালী। শিয়া ধর্মমত আপন করে নিন যাতে করে আমি আর আপনি পাশাপাশি নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্তালার কাছে আমাদের অভিযানের জন্য আশীর্বাদ কামনা করতে পারি। হুমায়ুনের মুখের দিকে তামাস্পের কালো চোখের মণি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, হৃদয়ের সমস্ত উত্তাপ যেন সেখানে এসে জমা হয়েছে।
হুমায়ুন নিজের বিস্ময় আর হতাশা গোপন করতে আপ্রাণ প্রয়াস নেয়। সময়টা তামাস্প ভালোই পছন্দ করেছে- হুমায়ুনের কাঙ্খিত সবকিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে নিজের দাবী সামনে নিয়ে এসেছে। জাগতিক বিষয়বস্তু- জমিজায়গা কিংবা সোনারূপার প্রতি লালায়িত একজন মানুষকে অনেক সহজে মোকাবেলা করা সম্ভব, হুমায়ুন মনে মনে ভাবে। আপোষ করার জন্য এমন মানুষগুলো তৈরীই থাকে। আরেকজন মানুষের আত্মাকে করায়ত্ত্ব করতে যে আগ্রহী তার সাথে আপোষ করা অসম্ভব। তামাস্পের প্রশ্নের উত্তর তাঁকে ভীষণ কুশলতার সাথে দিতে হবে।
আপনি কেবল আমার কাছ থেকেই এটা প্রত্যাশা করেন, আমার সেনাপতি কিংবা আমার লোকেরা এর বাইরে? সে এক মুহূর্ত পরে পাল্টা প্রশ্ন করে।
কেবল আপনি, কিন্তু একজন সম্রাট যেখানে পথপ্রদর্শন সেখানে অবশ্য প্রায়শই অনেকেই তাকে অনুসরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকে।
আপনি এইমাত্র যা বললেন সেটা নিয়ে আমাকে একটু চিন্তা করার সময় দিতে হবে।
চিন্তা করতে আমার ভাই আশা করি খুব বেশী সময় নেবেন না। আপনি যেমনটা বলেছেন শীতের তুষার আরেক অতিরিক্ত শত্রুতে পরিণত হবার পূর্বেই আপনি আপনার অভিযান শুরু করতে আগ্রহী… শাহ তামাম্প রেশমের তাকিয়া থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং দুই নৃপতির আলাপচারিতার সময় সতর্কতার সাথে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দেহরক্ষীদের ইশারায় অনুসরণ করতে বলে, উঁচু পাটাতন থেকে নেমে এসে বাগানের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় একটা গোলাপঝাড়ে ফুটন্ত রক্তলাল গোলাপফুল তারিফ করার জন্য কেবল একটু দাঁড়ায়।
