শাহ্ গালিচার ঠিক কেন্দ্রে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর সৈন্যেরা প্রায় পঞ্চাশ গজ পেছনে সুবিন্যস্ত ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান, আজ তাঁর পরনে টকটকে লাল মখমলের পোষাক আর মাথায় টকটকে লাল রেশমের উপর সোনার জরি দিয়ে কারুকাজ করা লম্বা, সূচালো অগ্রভাগযুক্ত রত্নখচিত উষ্ণীষ। হুমায়ুন ভালো করেই জানে শাহের মাথার ঐ উষ্ণীষ কিসের লক্ষণ। এটা হল তাজ- ইসলামের শিয়া ধর্মাবলম্বীদের প্রতীক। হুমায়ুন গালিচার প্রান্তদেশের দিকে এগিয়ে যেতে তামাস্প তাঁর দিকে এগিয়ে আসে এবং তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে তাকে আলিঙ্গন করে। সে তারপরে হুমায়ুনকে একটা বিশাল তাকিয়ার দিকে নিয়ে যায় এবং নিজের ডানপাশে হুমায়ুনকে বসতে দিয়ে নিজে তার পাশে উপবেশন করে।
আমার ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই। হুমায়ুন এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখে তামাস্প তার সমবয়সীই হবে, কাটা কাটা মুখাবয়ব, ফ্যাকাশে ত্বক আর ঘন ভ্রর নীচে জ্বলজ্বল করতে থাকা কালো চোখের অধিকারী এক ব্যক্তি।
আপনার আতিথিয়তার জন্য আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। পারস্যের গৌরবগাঁথার কথা আমি শুনেছি এবং এখন আমি স্বচক্ষে সেটা প্রত্যক্ষ করলাম।
তামাস্প মৃদু হাসেন। আপনার যাত্রাকালীন সময়ে এমন কিই আর আমি আপনার জন্য করতে পেরেছি, আমি মোগলদের যে জৌলুসের কথা শুনেছি তাঁর সাথে তুলনা করতে গেলে আমি নিশ্চিত এসব কিছু ধোপেই টিকবে না।
হুমায়ুন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর আতিথ্যকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তামাস্প খুব ভালো করেই জানে পারস্যে তাঁর পালিয়ে আসার মাঝে জৌলুসপূর্ন কিছুই নেই। তার এসব খোসামুদি শব্দের আড়ালে কি কোনো মর্মভেদী খোঁচা রয়েছে? সহস্রাধিক উৎসুক দৃষ্টির ব্যাপারে সচেতন দৃষ্টি যারা দেখতে পাবে সে কি করতে চলেছে হুমায়ুন সহসা একটা সিদ্ধান্ত নেই। সে নিশ্চয়ই তাদের দেখিয়ে দেবে যে সে মোটেই একজন ভিক্ষুকের ন্যায় পারস্যে আসেনি। সে এমন জাঁকালো সদিচ্ছাজ্ঞাপক একটা পদক্ষেপ নেবে, এমনকি অসম্ভব সমৃদ্ধশালী পারস্যেও যেটা নিয়ে পুরুষানুক্রমে আলোচনা হবে- এমন একটা সদিচ্ছাজ্ঞাপক পদক্ষেপ যা পারস্যের শাসকেও তাঁর কাছে ঋণী করে তুলবে।
শাহ তামাস্প আমি হিন্দুস্তান থেকে আপনার জন্য একটা উপহার নিয়ে এসেছি। হুমায়ুন তার আলখাল্লার গলার ভেতরে হাত দিয়ে ফুলের ছোপঅলা রেশমের একটা বটুয়া বের করে আনে যার ভেতরে, কঠিন আর বিপদসঙ্কুল পুরোটা সময় ধরে সে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিজের হৃদয়ের কাছে সংরক্ষণ করেছে। ইচ্ছাকৃত আলস্যে হুমায়ুন বটুয়ার ভেতর থেকে কোহ-ই-নূর বের করে এনে সেটাকে শূন্যে তুলে ধরে যাতে সূর্যের আলো এসে পড়ে। নক্ষত্রের দীপ্তিতে পাথরটা ঝলসে উঠে এবং হুমায়ুন শাহ তামাস্পকে সশব্দে শ্বাসরোধ করতে শোনে।
আমাকে যদি এতটা দিন পথে কাটাতে না হত, আপনার জন্য আমি নিশ্চয় আরও মূল্যবান কিছু খুঁজে পেতাম। কিন্তু এই উজ্জ্বল ঝকমকে পাথরটা আমার বিশ্বাস আপনাকে প্রীত করবে। এই পাথরটাকে কোহ-ই-নূর, আলোর পর্বত, বলা হয়। আশা করি আমাদের চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব এবং সেই সাথে শাহ্ তামাস্প আপনাকেও এর আলো উদ্ভাসিত করবে।
৩.২ কান্দাহার
আপনার এই দুর্দশার ভিতরেও যে আপনি আমার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, সেটা আমার হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। সারা পৃথিবী সাক্ষী যে মোগল সম্রাট যখন আমার সাহায্য কামনা করেছেন, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছি। আমি আপনাকে সুসজ্জিত একটা সেনাবাহিনী এবং আমার শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের একজন তাদের নেতৃত্ব দেবে যাতে করে আপনার কাছ থেকে যা কেড়ে নেয়া হয়েছে- সেটা আপনি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। শাহ্ তামাস্প হুমায়ুনের কাঁধ আঁকড়ে ধরেন। আমাদের আব্বাজানেরা যেমন একদা মিত্র ছিলেন, তেমনি আমরাও তাই হবো… শাহের ব্যক্তিগত উদ্যানে উত্তর দক্ষিণ এবং পূর্ব পশ্চিমে প্রবাহিত দুটো নহরের সংযোগ স্থলে নির্মিত মর্মরের বেদীর উপরে রেশমের তাকিয়ার উপরে তাঁরা এই মুহূর্তে বসে রয়েছে। নহরের প্রবাহের ফলে সৃষ্ট উদ্যানের চারভাগে ফলজ বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে- আপেল, নাশপাতি, খুবানি, জাম, আর চেরী এবং সেই সাথে বিশেষভাবে রয়েছে শাহের প্রিয় আপেল গাছ- যার ডালে ইতিমধ্যেই সোনালী ফলের আকৃতি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রত্নখচিত গলবন্ধনী পরিহিত গায়ক পাখিরা ইতিমধ্যে তাদের ডালে ডালে বিচরন করছে।
শাহ্ তামাস্প যাকে নিজের বাগে জান্নাত বলে অভিহিত করেন সেখানে যখন তিনি হুমায়ুনকে সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠান, হুমায়ুন তখন আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু শাহের প্রস্তাব তাঁর অবাস্তবতম কল্পনাকেও ছাপিয়ে যায়। কোহ-ই-নূর বির্সজন বৃথা যায়নি এবং হুমায়ুন বহু কষ্ট করে নিজের উচ্ছ্বাস নিয়ন্ত্রণে রাখে। আপনি অতিশয় উদার, সে প্রত্যুত্তরে কোনমতে বলে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে যদি আপনার যোদ্ধারা লড়াই করে, বিজয়ের ব্যাপারে আমার ভেতরে কোনো সন্দেহ থাকবে না…
আপনি হয়ত ভাবছেন আপনাকে সহায়তা করার জন্য কেন আমি এত ব্যগ্র হয়ে রয়েছি। আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি এমন সিদ্ধান্ত নেইনি। এর পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। আমাদের মতো রাজবংশগুলোর ভেতরে বিশ্বাসঘাতকতা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সাহায্য প্রার্থনা করে আমার কাছে বার্তা প্রেরণকারী আপনিই একমাত্র মোগল নন। আপনার সৎ-ভাই কামরানও আমার কাছে একটা সন্দেশ পাঠিয়েছে- যার বিষয়বস্তু হল আপনি পারস্য অভিমুখে পালিয়ে গিয়েছেন, আমি যদি আপনাকে বন্দি করি সে প্রতিদানে আমাকে অনেককিছু দেবে- স্বর্ণমুদ্রা, মূল্যবান রত্নপাথর এমনকি কান্দাহার শহরটা পর্যন্ত সে আমাকে দিতে চেয়েছে। তামাস্পের কালো চোখের মণি জ্বলজ্বল করতে থাকে। সে আমার সাথে এমনভাবে দরকষাকষি করতে চেষ্টা করেছে যেন আমি বাজারের একজন মামুলি বেনিয়া। আমি তার এই ঔদ্ধত্য দেখে ক্রুদ্ধ হয়েছি। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা হল, আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আপন ভাইয়ের রক্তপাতে কুণ্ঠিত নয় এমন একজন যুবরাজকে আমি কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি? আমি ইচ্ছা করলে তাঁকে মাছির মতো পিষে মারতে পারি কিন্তু সেই কাজে আমি আপনাকে সাহায্য করতে বেশী ইচ্ছুক।
