বেশ তাহলে, পৃথিবীর অধিশ্বর, শাহ্ তামাস্পের নামে, আমি আপনাকে পারস্যে স্বাগত জানাচ্ছি।
*
একশ পরিচারকের দল সামনের রাস্তা ঝাড় দেয় এবং ধূলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোলাপজল ছিটায়। হুমায়ুন আর তার সঙ্গীসাথীদের সামনে চমৎকার বস্ত্রাদিশোভিত এক হাজার অশ্বারোহীর একটা দল দুলকি চালে এগিয়ে যায়, যাদের শাহ্ পাঠিয়েছেন এখান থেকে সাতশ মাইল উত্তরপশ্চিমে, তার রাজধানী, কাঝভিনে, তাদের প্রতিরক্ষা সহচর হিসাবে অনুগামী হতে। পার্সী ঘোড়ার পিঠে হুমায়ুনের নিজের লোকেরাও সমান জাক-জমকপূর্ণ ভঙ্গিমায় আসীন- হুমায়ুনের জন্য রয়েছে কালো স্যাবলের চামড়ার উপরে সোনার কারুকাজ করা লাগামসহ ঘোড়ার মাথার সাজ এবং পর্যান। হামিদা আর গুলবদন মখমলের আস্তরন দেয়া, গিল্টি করা গরুর গাড়িতে অবস্থান করছে যেগুলো টানছে সাদা ষাড়ের দল, যাদের শিঙে মোগলদের সবুজ রঙের ফিতে জড়ান রয়েছে।
হুমায়ুন সীমান্ত অতিক্রম করে পারস্যে প্রবেশের তিন সপ্তাহ পরে শাহ্ তামাস্পের কাছ থেকে তার প্রেরিত চিঠির উত্তর এসে পৌঁছে। তিন পৃষ্ঠাব্যাপী মাত্রাছাড়া সৌজন্যসূচক কথা শেষ হয়েছে এই শব্দগুলো দিয়ে আপনি আমার ভাই, সার্বভৌম ক্ষমতার এক মূল্যবান রত্ন, পৃথিবীকে আলোকিত করা সূর্য- যার দীপ্র প্রভার কাছে ম্লান হয়ে যায়। কাঝভিনে আমার দরবারে আপনাকে স্বাগত জানাবার সুখকর অভিজ্ঞতা আমি লাভ না করা পর্যন্ত আমার দিনগুলো অসার মনে হবে।
হুমায়ুন তার যাত্রাপথে যেসব শহর আর প্রদেশে যাত্রাবিরতি করবে তার প্রতিটার শাসকের কাছে হুমায়ুনের স্বাচ্ছন্দ্য আর আনন্দের জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশ প্রদান করে, লিখিত আদেশ, ফরমান, শাহ্ আগেই প্রেরণ করেছেন। হুমায়ুন এসব জানে কারণ প্রতিটা ফরমানের অনুলিপি শাহ্ তাকেও পাঠিয়েছেন- চারপাশে সোনার প্রান্তযুক্ত মোটা কাগজের উপরে লেখা- যেটা রয়েছে হাতির দাঁতের বাক্সে যাতে আমার ভাই জানতে পারে যে তাঁকে স্বাগত জানাবার কোনো প্রয়াসই আমি বাদ দেইনি।
প্রতি রাতে রাজকীয় কাফেলা ঠিক কোথায় যাত্রা বিরতি করবে শাহ্ সেটাও আদেশ দিয়েছেন, যাতে করে, সারা দিনের যাত্রা শেষে বিশ্রামের সময় মখমল আর রেশমের চাঁদোয়াযুক্ত সুক্ষ কারুকাজ করা সাদা কাপড়ের তাবু ইতিমধ্যে টাঙানো আর অপেক্ষমান অবস্থায় দেখতে পায় তারা। প্রতিটা রাতই রসনা তৃপ্তিকর ভোজনের নতুন অভিজ্ঞতা বহন করে আনে- দুধ আর মাখন সহযোগে উনুনে ঝলসানো মিষ্টি সাদা রুটি ভর্তি সোনালী বারকোশ এবং রুটির উপরে আফিম আর সুগন্ধিযুক্ত হলুদ পুষ্পবিশিষ্ট সজির বীজ ছড়ান রয়েছে, সাথে পাঁচশ ভিন্ন ভিন্ন স্বাদযুক্ত পদ- আখরোটের সসে ফোঁটান হাঁসের মাংস, শুকনো লেবু আর নাশপাতির আচারে রান্না করা কচি ভেড়া- সোনালী আর রূপালি তবক দেয়া সব ধরনের বাদাম, ভেতরে মধু আর কুচো করা বাদামের পুর দেয়া শুকনো খুবানি এবং গোলাপজল ছিটানো স্তূপীকৃত মিষ্টান্ন এবং উপরে মোতির মতো দেখতে ডালিমের দানা ছিটানো রয়েছে।
প্রতিটা দিনই নতুন উপঢৌকনের আগমন ঘটতে দেখা যায়- হুমায়ুনের জন্য সোনার কারুকাজ করা বুটিদার রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরী পোষাক এবং রত্নখচিত খঞ্জর এবং হামিদা আর গুলবদনের জন্য শাহের ভগিনী শাহজাদা সুলতানাম পাঠান হলুদাভ বাদামি পাথর অ্যাম্বার আর উৎকৃষ্ট সুগন্ধি। উপঢৌকনের বদান্যতা থেকে হুমায়ুনের অবশিষ্ট ভ্রমণসঙ্গীরাও বাদ যায় না। তার লোকদের জন্য শাহ্ তামাস্প অস্ত্রের শ্রেষ্ঠ কারিগরদের দ্বারা তৈরী খঞ্জর আর তরবারি পাঠিয়ে দেন। প্রত্যেকের জন্য নতুন কাপড় আসে। পরিশ্রান্ত, ছেঁড়া কাপড় পরিহিত যে দলটা হেলমান্দ নদী অতিক্রম করেছিল রাতারাতি তাদের পরিস্থিতি বদলে যায়।
কিন্তু সপ্তাহ অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে খুবানি আর জামের বেষ্টনীযুক্ত বাগানের ভিতর দিয়ে এবং নদীর তীরের ঝুঁকে আসা উইলোর সারি বরাবর এগিয়ে গিয়ে তাঁরা যতই কাঝভিনের নিকটবর্তী হতে থাকে, হুমায়ুন তখনও তাঁকে বিব্রত করতে থাকা প্রশ্নটার কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। শাহ্ তামাস্প এহেন বাড়াবাড়ি ধরনের আতিথ্য প্রদর্শন করছেন কেন? এর কারণ কি কেবলই হুমায়ুনকে অভিভূত করা? মোগল সম্রাট তাঁর কাছে শরণ নেয়া ব্যাপারটা তাঁর অহংবোধকে আপুত করেছে, নাকি এর পেছনে আরও গূঢ় কোনো রহস্য রয়েছে?
কাশিম আর জাহিদ বেগের সাথে হুমায়ুন তার এই অস্বস্তির বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেও সে খুব ভালো করেই জানে হামিদার সাথে এই বিষয় নিয়ে সে কোনো রকমের আলোচনা করতে পারবে না। শাহের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের প্রতিটা উপলক্ষ্য যেন হামিদাকে তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তি ফিরিয়ে দেয়- আশার বাণী হয়ে যা তার চোখের পাতায় স্পষ্ট উচ্চারিত হয়, যে সৎ-ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং আকবরকে পুনরায় নিজেদের কাছে ফিরে পেতে শাহ তামাস্প নিশ্চয়ই হুমায়ুনকে সহায়তা করবেন। হামিদার ধারণা অবশ্য একদিক দিয়ে দেখতে গেলে ঠিকই আছে। শাহের সত্যিকারের অভিসন্ধি যাই হোক এবং পুরোটাই হয়তো যথাযথভাবে হিতসংকল্প- তার সাথে তাকে অবশ্যই মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে…
অবশেষে এক গ্রীষ্মের সকালে, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয় হুমায়ুন একাগ্রচিত্তে যার প্রতিক্ষা করেছিল। কাঝভিনের নিকটবর্তী এক উজ্জ্বল পুষ্পশোভিত প্রান্তরে, শাহ্ তামাস্প, দশ হাজার অশ্বারোহীবাহিনী পরিবেষ্টিত অবস্থায় মোগল সম্রাটকে স্বাগত জানাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। শাহের কাছ থেকে কি প্রত্যাশা করা উচিত হুমায়ুন এতোদিনে সে সম্বন্ধে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, এবারও প্রতিটা বিষয়ের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে আগে থেকেই ভেবে রাখা হয়েছে- হুমায়ুন যেখানে ঘোড়া থেকে নামবে, তাঁর লোকেরা যেখানে অপেক্ষা করবে, প্রতিটা স্থান আগে থেকেই নির্ধারিত, গাঢ় লাল রঙের পুরু গালিচা বিছান একটা পথ যার উপরে শুকনো গোলাপের কুড়ি ছড়ান রয়েছে প্রান্তরের একেবারে কেন্দ্রস্থলের দিকে এগিয়ে গিয়েছে, যেখানে সোনালী রঙের একটা বিশাল বৃত্তাকার গালিচা বিছান রয়েছে সূর্যের আলোয় এর রেশমের কারুকাজ দীপ্তি ছড়াচ্ছে।
