তোমার কি মনে হয়? শেষে কিছু রীতিমাফিক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য প্রকাশ করে চিঠিটা শেষ করে, কলম দোয়াতদানিতে নামিয়ে রেখে, হুমায়ুন হামিদাকে জিজ্ঞেস করে।
হামিদা কিছুক্ষণ চিন্তা করে। চিঠিটার বাক্য বিন্যাস সুচারু আর সেইসাথে অকপট আর খোলামেলা। শাহকে প্রভাবিত করা উচিত, চিঠিটার কিন্তু আদৌ সেটা হবে কিনা কে বলতে পারে। আমরা প্রায়শই আশা আর প্রতীক্ষায় অধীর হয়ে উঠি, কেবলই আশাহতের বেদনা সহ্য করবো বলে।
*
সুলতান, নদীর অগভীর অংশে আমরা পৌঁছে গেছি।
হাত দিয়ে চোখের উপরে একটা আচ্ছাদন তৈরী করে, হুমায়ুন পথ প্রদর্শকের আঙ্গুলিনির্দেশের দিকে তাকায় এবং সামনের ধুসর, সমতল ভূমির উপর পানির একটা স্রোতকে ঝিকিয়ে উঠতে দেখে- হেলমান্দ নদী। নদীর অপর পাড়ে অবস্থিত একটা অনুচ্চ দালানের ছাদে পতপত করে একটা লম্বা নিশান উড়ছে- খুব সম্ভবত নদী পারাপারের উপর নজর রাখছে এমন একটা পার্সী সেনাছাউনি। এই পথ দিয়েই নিশ্চিতভাবেই তিন কি চারদিন পূর্বে জওহর অতিক্রম করেছে, ধরে নেয়া যায় সেনাছাউনির আধিকারিক হুমায়ুনের আগমন প্রত্যাশা করছেন। অবশ্য একই সাথে, সতর্কতা বজায় রাখাটাও বাঞ্ছনীয়।
আহমেদ খান, সেনাছাউনির নিকটে গিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি দেখে আসবার জন্য আপনার কয়েকজন গুপ্তদূতদের পাঠান ততক্ষণ আমরা বাকিরা এখানেই অপেক্ষা করি।
সুলতান, আমি নিজেই যাচ্ছি। আহমেদ খান তার দুজন অভিজ্ঞ লোককে ডেকে নিয়ে ধুসর মিহি ধূলোর একটা মেঘ মাথার উপর তৈরী করে দুলকি চালে ঘোড়া ছোটায়।
ঘোড়ায় টানা ছাউনি দেয়া এক্কা গাড়ির শেষ বসতিটা ছেড়ে আসবার সময় সে বেশ কয়েকটা এমন গাড়ি কিনেছে, অসুস্থ আর মেয়েদের পরিবহনের সুবিধার্থে- দিকে হুমায়ুন খুব ধীরে ধীরে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যায়, সেটাতে হামিদা আর গুলবদন ভ্রমণ করছে। কাঠের তৈরী ঝালর সরিয়ে ভিতরে উঁকি দিয়ে, সে দেখে হামিদা গভীর ঘুমে অচেতন আর গুলবদন কিছু একটা লিখছে নিঃসন্দেহে সেটা তাঁর রোজনামচা। তাঁদের দুজনকেই কৃশকায় আর ফ্যাকাশে দেখায়।
আমরা নদীর কাছে পৌঁছে গিয়েছি, হামিদার ঘুমে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য কথাটা সে খুব আস্তে বলে। আহমেদ খান এসে যদি বলে যে সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে এবং পার্সীরা কোনো আপত্তি না জানালে আমরা নদী অতিক্রম করবো এবং সেখানে রাতেরমতো অস্থায়ী শিবির স্থাপন করবো। হামিদা কেমন আছে?
সে এখনও খুব কম কথা বলে…সে এমনকি আমার সাথেও কদাচিৎ নিজের অনুভূতি বা ভাবনার কথা আলোচনা করে।
আমি যেমন বুঝিয়েছি, তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা কর যে আমাদের সন্তানকে পুনরায় আমাদের কাছে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেব না। আমি যা কিছু করছি…অনাগত দিনগুলোতে যা করবো…আকবরকে ফিরে পাবার জন্যই আমি সেসব কিছু করবো।
তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, আপনার জন্যই তার শক্ত হওয়া উচিত কিন্তু শাহ আমাদের উপস্থিতি কিভাবে দেখবেন- সেটা নিয়ে তিনি খুব দুশ্চিন্তা করছেন…আর সেইসাথে কামরান আকবরের সাথে কেমন আচরণ করছে সেটাতো রয়েইছে।
হামিদা ঘুমের ভিতর নড়েচড়ে উঠলে, ঝালরের ভিতর থেকে হুমায়ুন মুখ বের করে আনে এবং তাঁর সৈন্যসারির সম্মুখভাগে পুনরায় ফিরে আসে। সংবাদের জন্য তাকে খুব বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। আহমেদ খান তার লোকজন নিয়ে রেকি করতে যাবার ঘন্টাখানেকের ভিতরে, হুমায়ুন তাঁদের সদলবলে ফিরে আসতে দেখে। তাঁদের ঠিক পিছনেই আরো দুজন অশ্বারোহীকে অনুসরণ করতে দেখা যায়। পুরো দলটা একটু কাছে আসতে হুমায়ুন দেখে যে একজন অশ্বারোহী যদিও অপরিচিত, অন্যজন দীর্ঘদেহী অবয়বের অধিকারী জওহর। শাহের সাথে দেখা করার জন্য সে এখনও কেন রওয়ানা হয়নি? শাহ্ কি পারস্যে তাঁদের প্রবেশের ব্যাপারে অসম্মতি জানিয়েছেন? কামরান কি আগে কোনোভাবে তার প্রশ্রয় লাভ করেছে? দুশ্চিন্তায় অধীর হয়ে উঠে, সে তাদের সাথে দেখা করার জন্য ঘোড়ার পাঁজরে খোঁচা দেয়।
সুলতান। আহমেদ খান মিটিমিটি হাসছে। খবর সব ভালো, সে আগন্তুকের দিকে ইঙ্গিত করে, ইনি আব্বাস বেগ, সিস্তান প্রদেশের প্রশাসক, আপনার সাথে পারস্যের অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা-সহচর হিসাবে যাবার জন্য তিনি এসেছেন।
আব্বাস বেগ, গাঢ় বেগুনী রঙের মখমলের চমৎকার পোষাক পরিহিত কালো শুশ্রুমণ্ডিত বছর চল্লিশেকের দীর্ঘদেহী এক লোক এবং তার মাথার উঁচু করে বাঁধা উষ্ণীষে সাদা সারসের একটা লম্বা পালক অলঙ্কৃত বন্ধনী দিয়ে আঁটকানো, ঘোড়া থেকে নেমে এসে হুমায়ুনের সামনে নতজানু হয়ে কুর্নিশ করে। সুলতান, আপনার বার্তা আমি শাহের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমাদের দ্রুতগামী বার্তাবাহকেরা দিনে আশি মাইল পথ অতিক্রম করতে সক্ষম। আমাকে পরামর্শ দিতে কিভাবে যথাযথ মর্যাদায় আপনাকে স্বাগত জানানো যায় আমি আপনার প্রতিনিধিকে এখানে অবস্থান করতে অনুরোধ করেছি। সবকিছু প্রস্তুত রয়েছে। আপনাকে কেবল নদীর অগভীর অংশ দিয়ে ওপারে যেতে হবে।
হুমায়ুনের বুকের উপর থেকে একটা বিশাল বোঝা যেন নিমেষে নেমে যায়। গত কয়েক মাসের ভিতরে এই প্রথম তার পরিবার আর তাঁর অনুগামী লোকেরা রাতে কোথায় ঘুমাবে, খাবারের জোগান আছে কিনা, তাঁর লোকেরা আক্রমণের হাত থেকে নিরাপদ কিনা, এসব বিষয়ে তাকে আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না। সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে এবং কৃতজ্ঞতায় সে মাথা নত করে তারপরেই স্বমূর্তি ধারণ করে বলে, আব্বাস বেগ আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করবেন। আপনার কথাগুলো দারুণ প্রীতিকর।
