কিন্তু তিনদিন পরে আপাতদৃষ্টিতে এটা প্রতিয়মান হয় যে, তাঁরা বোধহয় সবচেয়ে জঘন্য পরিস্থিতি অতিক্রম করে এসেছে। একটা সর্পিলাকার সংকীর্ণ পথ দিয়ে তারা যখন সাপের মতো একেবেঁকে নীচের দিকে নামছে, সহসা বাতাসের তীব্র কনকনে ভাবটা তিরোহিত হয় এবং চারপাশে তূলোর মতো ভাসতে থাকা মেঘের ভিতর দিয়ে হুমায়ুন নীচে তাকিয়ে বৃত্তাকারে অবস্থিত তুষারাবৃত বাড়ি ঘর দেখতে পায় এবং তাঁদের চিমনি থেকে বোয়া উঠতে দেখে সে অনুমান করে সেটা কোনো একটা সরাইখানা হবে। সরাইখানার আঙ্গিনায় ভারী আলখাল্লা পরিহিত অবয়বদের জটলা করতে দেখা যায় এবং সে গৃহপালিত পশুদের ইতস্তত বিচরণ করতে দেখে। তুমি যে বসতির কথা বলছিলে এটাই কি সেটা? বালুচ পথ প্রদর্শকদের একজনকে ডেকে এনে সে জিজ্ঞেস করে।
হা, সুলতান। আমরা যাকে গামসির বলি- পাহাড়ের মধ্যবর্তী পশুচারণভূমি যেখানে পশুপালক আর কৃষকেরা তাঁদের শীতকালীন আবাসস্থল হিসাবে ব্যবহার করে- আমরা এখন পাহাড়ের উচ্চতা থেকে সেদিকে অবতরণ করছি। আমরা সেখান থেকে জ্বালানী আর রসদ সংগ্রহ করতে পারবো… এবং পুনরায় যাত্রা শুরম্ন করার আগে ইচ্ছা করলে আমরা সেখানে কয়েকদিন বিশ্রামও নিতে পারি।
রসদ প্রাপ্তির সম্ভাবনায় হুমায়ুন উৎফুল্ল হয়ে উঠে কিন্তু সেখানে সে প্রয়োজনের চেয়ে এক মুহূর্তও বেশী সময় নষ্ট করার পক্ষপাতি নয়। আকবর বহু মাইল দূরে কোনো অজানায় কামরানের হাতে বন্দি রয়েছে, এই ভাবনায় জারিত হয়ে হামিদার দিকে প্রতিবার তাকাবার সময় তাঁর চোখে জমাট কষ্টের সাথে তাঁর নিজের অক্ষমতাবোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁরা যত শীঘ্র পারস্যে পৌঁছাবে, তত দ্রুত সে আবার পরিকল্পনার ছক বিন্যাস শুরু করতে পারবে।
সীমান্ত এখান থেকে কতদূরে?
সুলতান, এখান থেকে প্রায় আশি মাইল দূরে হেলমান্দ নদীর ঠিক অপর তীরেই পারস্যের সিয়েস্তান প্রদেশ অবস্থিত।
সেখানে পৌঁছাবার পূর্বে আমরা কি ধরনের ভূ-প্রকৃতির মোকাবেলা করবো?
এখন থেকে বেশীর ভাগ সময়েই আমরা নীচের দিকে নামতে থাকবো। আমরা হেলমান্দের কাছাকাছি পৌঁছালে ভূ-প্রকৃতি সমতল হয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নদীর কাছে পৌঁছাতে আমাদের আর কতদিন লাগবে?
নদীর যে অগভীর অংশটা আমি চিনি সেখানে পৌঁছাতে দশ কি বার দিনের বেশী সময় লাগবে না।
সেইদিন রাতের বেলার কথা, নীচের সেই বসতিটায় পৌঁছে বহুদিন পরে তাঁরা সবাই প্রথমবারের মতো উদরপূর্তি করে, হুমায়ুন তার তাবুতে হামিদার সাথে এসে যোগ দেয়। আমরা এখন যখন শাহের রাজ্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি, আমাদের স্বাগত জানাবার অনুরোধ জানিয়ে শাহ্ তামাকে আমার অবশ্যই একটা চিঠি লেখা উচিত। নিজেদের অভিপ্রায় না জানিয়ে আমরা যদি তার ভূখণ্ডের দিকে। এগিয়ে যাই, সীমান্তে মোতায়েন করা পারস্যের সীমান্তরক্ষীরা ভাবতেই পারে আমাদের কোনো বৈরী উদ্দেশ্য রয়েছে। জওহরকে আমার বিশেষ বার্তাবাহক করে আমি তাকে দিয়ে চিঠিটা পাঠাতে চাই। হেলমান্দ নদী পার হয়ে সে চিঠিটা নিয়ে যাবে এবং সেখানে প্রাদেশিক শাসক বা সমান পদমর্যাদার অন্যকোন আধিকারিককে খুঁজে বের করে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য তার কাছে ব্যাখ্যা করবে এবং তাকে অনুরোধ করবে অনতিবিলম্বে শাহের কাছে আমার চিঠিটা যেন। পৌঁছে দেয়া হয়।
হুমায়ুন কথা বলার মাঝেই, একটা নীচু টেবিলের সামনে আসন পিঁড়ি হয়ে বসে যেখানে একটা মাত্র তেলের প্রদীপের মৃদু আলোয়, সে চিঠি লেখার জন্য কালি প্রস্তুত করতে শুরু করে। সে খুব ভালো করেই জানে তাঁর শব্দ চয়নের উপর সবকিছু কতখানি নির্ভর করছে। সে পথে আসবার সময়ে তার কি লেখা উচিত সে বিষয়ে অনেক ভাবনাচিন্তা করার অবকাশ পেয়েছে এবং এখন কোনো ধরনের ইতস্ত ত না করে সে সাবলীল ভঙ্গিতে লিখতে শুরু করে, চিঠির বক্তব্য জোরে জোরে হামিদার উদ্দেশ্যে বলতে থাকে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে যে মোগলদের কাছে পার্সী একটা পরিচিতি ভাষা সেজন্য তার কোনো দোভাষিকের প্রয়োজন হয় না।
প্রথম অনুচ্ছেদে সৌজন্যমূলক শিষ্টাচার, যেখানে বারবার শাহের দীর্ঘ নিরোগ জীবন আর তাঁর শাসনাকালের সাফল্য কামনা করা হয়। হুমায়ুন তারপরে তাসাম্পকে বিনয়ের সাথে স্মরণ করিয়ে দেয় যে বহুবছর আগে শাহের বাবা শাহ ইসমাঈল, হুমায়ুনের আব্বাজান বাবরকে তার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে কেবল সাহায্যই করেননি, একইসাথে মোগলদের কৃপাহীন শত্ৰু উজবেক গোত্রপতি সাইবানি খানের হেরেম থেকে বাবরের বোন খানজাদাকেও উদ্ধার করেছিলেন। হুমায়ুন অবশ্য উল্লেখ করে না যে- যা সম্পর্কে শাহ্ তামাম্প খুব ভালোভাবেই অবহিত আছে ইসমাঈল আর বাবরের মধ্যকার মৈত্রী খুব বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। সে এর পরিবর্তে বিষয়টা প্রগলভ প্রশংসার সুরে এভাবে লেখে যে, এই দুই মহান নৃপতি একদা তাদের দুজনেরই শত্রু, এমন একজনকে ধ্বংস করতে তাদের শক্তি একত্রিত করেছিলেন।
হুমায়ুন পরের অনুচ্ছেদে সরাসরি একটা অনুরোধ জানাবার সিদ্ধান্ত নেয়: আমাকে অনেক প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাংলা থেকে আগত এক উঁইফোঁড়, শেরশাহ, আমার পরিবর্তে এখন হিন্দুস্তান শাসন করছে যখন আমার সৎ-ভাইয়েরা কাবুল আর কান্দাহার আমার কাছ থেকে চুরি করে নিয়েছে এবং আমার নবজাত সন্তানকে বন্দি করে রেখেছে। আপনি নিজে একজন সম্রাট মহান একজন সম্রাট- এবং আমি নিশ্চিত, আপনি নিশ্চয়ই আমার দুর্দশার কথা অনুধাবন করতে পারবেন এবং সহানুভূতিশীল হবেন। পারস্যে আমাকে, আমার পরিবারকে আর আমার সাথের ক্ষুদ্রবাহিনীকে স্বাগত জানিয়ে রাজোচিত ঔদার্য প্রকাশের জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।
