সেদিন অপরাহ্নে, আপাতদৃষ্টিতে তুষারধ্বস হবার সম্ভাবনা নেই এমন এক টুকরো জমিতে তারা যখন সেদিনের মতো অস্থায়ী শিবির স্থাপন করেছে, তীব্র শীতের ভেতরে বেঁচে থাকা সম্বন্ধে বাবরের গল্পগুলো হুমায়ুন অন্য আরেকটা কারণে স্মরণ করে। ভেড়ার চামড়ার পুরু আলখাল্লায় আবৃত, আহমেদ খান, কিনারাবিহীন পশমী বালুচ টুপি একেবারে চোখের উপর পর্যন্ত টেনে নামান এবং তাঁর পুরো মুখটা একটা গরম কাপড় দিয়ে এমনভাবে আড়াল করা রয়েছে যে কেবল তার হলুদাভ-খয়েরী চোখজোড়া দৃশ্যমান, হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে আসে, বরফের উপরে তাঁর পায়ের চামড়ার জুতোজোড়া কেবলই পিছলে যেতে চায়।
সুলতান, গত কয়েকরাত এতো তীব্র শীত পড়েছিল যে পাহারা দেবার দায়িত্ব পালন করার সময় আমার দুজন লোকের পায়ে মারাত্মক হিম-দংশ হয়েছে। আমাদের হেকিমসাহেব এই মুহূর্তে তাদের সাথে রয়েছে…
তিনি কি বলেছেন?
তিনি বলেছেন যে তাঁকে ব্যবচ্ছেদের সহায়তা নিতে হবে। একজনের কপাল ভালোই বলতে হবে তার তিনটা আঙ্গুল কেটে বাদ দিলেই হবে কিন্তু অন্যজনের পুরো পা কেটে ফেলতে হবে…
আমি দেখতে যাবো।
একটা ছোট তাবুর অভ্যন্তরে হেকিমসাহেব এবং দুই হতভাগ্য সৈন্য অবস্থান করছে যেখানে একটা ধাতব পাত্রে মিটমিট করে আগুন জ্বলছে। হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে ছেঁড়া পাতলুন আর নগ্ন পা বের করে শুয়ে থাকা দুজনের একজন দারয়া। প্রাণবন্ত ছেলেটাকে ভীষণ ফ্যাকাশে দেখায়, সে অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে হেকিমসাহেবকে আগুনের দুর্বল শিখায় তাঁর ছুরির ফলাটাকে জীবাণুমুক্ত করা দেখছে। আরেকটা চওড়া ফলা আগুনের ভেতরে ঠেসে রাখা হয়েছে- বোঝাই যায় ক্ষতস্থানে সংক্রমণ রোধ করতে জায়গাটা পুড়িয়ে দেবার জন্য সেটাকে গরম করে গনগনে-লাল করা হবে। হুমায়ুন দারয়ার পাশে আসনপিড়ি হয়ে বসে তার ডান পায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। পা ফুলে কালো হয়ে রয়েছে এবং ফোলাটা গোড়ালীর অনেক উপরে ছড়িয়ে গিয়েছে আর অল্প যে কয়েকটা আঙ্গুলের নখ অবশিষ্ট রয়েছে তাঁর নীচ থেকে অশুভ-দুর্গন্ধযুক্ত সবুজাভ পুজ নির্গত হচ্ছে। হেকিমসাহেব কি তোমায় বলেছেন এই অবস্থায় তার কি করা উচিত? দারয়া মাথা নাড়ে কিন্তু হুমায়ুন তাঁর চোখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট দেখতে পায়। হিম্মত রাখো। হেকিমসাহেব খুবই দক্ষ। আল্লাহ সহায় থাকলে, এটা তোমার জীবন বাঁচিয়ে দেবে।
হিম-দংশে আক্রান্ত অপর সৈন্য- এক বাদশানি- তাঁকে দেখে দারয়ার চেয়েও অল্পবয়সী মনে হয়। তাঁর পায়ের তিনটি আঙ্গুল ফুলে উঠে বিবর্ণ হয়ে রয়েছে আর তাঁকে দেখে মনে হয় বেচারা হেকিমের ছুরির ফলা থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছে না, যা কিছুক্ষণ পরেই তাঁর মাংস আর হাড়ের ভেতর কেটে বসে যাবে।
হেকিমসাহেব, আমি আর আহমেদ খান আপনাকে সাহায্য করবো, হুমায়ুন বলে। প্রথমে কার পালা?
হেকিমসাহেব বাদশানি সৈন্যর দিকে ইঙ্গিত করে। আহমেদ খান যখন তরুণ সৈন্যের কাঁধ শক্ত করে ধরে তাঁকে মাটিতে শুইয়ে রাখতে তখন হুমায়ুন হাটু মুড়ে তাঁর পায়ের কাছে বসে হাঁটুর ঠিক উপরে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। হেকিমসাহেব যখন তার কাজ করছে তখন পা স্থির রাখতে গিয়ে হুমায়ুনকে তাঁর পুরো শক্তি প্রয়োগ করতে হয় এবং বাদশানি ছেলেটা পিঠের ভরে ধনুকেরমতো বেঁকে যায়, আপ্রাণ চেষ্টা করে চিৎকার না করতে। কিন্তু হেকিমসাহেব খুব দ্রুত কাজ করে। তিনটা নিখুঁত পোচে তিনি কালো হয়ে যাওয়া পায়ের আঙ্গুল তিনটি আলাদা করে ফেলেন, তারপরে রক্ত ঝরতে থাকা ক্ষতস্থানের সংক্রমণ রোধে জায়গাটা পুড়িয়ে দিয়ে সেখানে শক্ত করে পটি বেঁধে দেন।
এবার দারয়ার পালা। আরো একবার ছুরির ফলাটা আগুনের মাঝে আন্দোলিত করার সময় হেকিমসাহেবের চোখমুখ থমথম করতে থাকে। সুলতান, এবার কিন্তু অনেকবেশী সময় লাগবে। যন্ত্রণার অনুভূতি নিঃসাড় করতে আমি যদি তাকে একটু আফিম দিতে পারতাম… আমি ওর চেয়ে অনেক শক্তিশালী যোদ্ধাদের দেখেছি, ব্যবচ্ছেদের সময় স্নায়বিক অভ্যাঘাতেই মৃত্যুবরণ করেছে।
হুমায়ুন কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে দেখে যেখানে দারিয়া নিথর হয়ে শুয়ে রয়েছে, ফ্যাকাশে মুখটা ঘামের কারণে চকচক করছে।
সে যদি অচেতন থাকে, তাহলে কি কষ্ট কম হবে?
হাকিমসাহেব মাথা নেড়ে সম্মতি জানান।
হুমায়ুন দারয়ার দিকে এগিয়ে যায়। সব ঠিক হয়ে যাবে, ছেলেটার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে সে বলে। কষ্ট করে একটু উঠে বসতে পারবে, তোমাকে একটা কথা আমায় বলতেই হবে… চোখে বিভ্রান্তি নিয়ে দারয়া কুনুইয়ের উপর ভর দিয়ে নিজেকে উঁচু করে, হুমায়ুন কোনো হুশিয়ারী ছাড়াই মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে তাঁকে গায়ের সবশক্তি দিয়ে ঘুষি মারে, ঘুষিটা বোমারমতো তার থুতনির শীর্ষভাগে বিস্ফোরিত হয়। তরুণ ছেলেটা বিনা প্রতিবাদে আবার শুয়ে পড়ে। হুমায়ুন তার চোখের পাতা টেনে দেখে- যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর সাথে আর অনেক সময় বন্ধুদের সাথে সে বহুবার এমন করেছে- বেচারী কিছু বোঝার আগেই জ্ঞান হারিয়েছে। তার নিশানা ভেদ ভালোই আছে…
হাকিমসাহেব, আপনার যা করণীয় এবার করতে পারেন। হুমায়ুন তাবুর ভিতর থেকে একটু ঝুঁকে বাইরের কনকনে শীতল বাতাসে বের হয়ে আসে, আহমেদ খানকে রেখে আসে চিকিৎসককে সাহায্য করার জন্য, বাইরে থেকে সে ঘাস ঘাস শব্দে ধাতব ফলার হাড় কাটার আওয়াজ শুনতে পায় এবং তাঁর মনটা আরও বিষণ্ণ হয়ে উঠে। তার লোকদের আস্থা আর তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ প্রতিদান কিভাবে দেবে? অন্ধকার ঘনিয়ে আসা আকাশের দিকে সে মুখ তুলে তাকায় এবং ক্ষণিকের জন্য তাঁর যত দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তা তাঁকে বিব্রত করছে সবকিছু ভুলে থাকতে এবং পরমানন্দে ভেসে যাবার জন্য গুলরুখের আফিম-মিশ্রিত সুরার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। তারপরেই আকাশের নক্ষত্ররাজির মাঝে যেন খানজাদার মুখ ভেসে উঠে, নিরবে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে উদ্বেগহীন জীবনযাপনের নিয়তি নিয়ে সে জন্মগ্রহণ করেনি এবং এর সাথে অনেক বাধ্যবাধকতা আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট চাপ জড়িয়ে রয়েছে। সে তার পরণের আলখাল্লাটায় নিজেকে আরও ভালো করে জড়িয়ে নেয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে পাহারার কাজে যারা নিয়োজিত রয়েছে, সেখানে গিয়ে সে হিম-দংশের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁদের হুশিয়ার করে দিয়ে নড়াচড়া করতে বলবে, আর ঘনঘন তাদের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করার ব্যাপারে সতর্ক করে দেবে।
