নিজেকে বর্তমানে ফিরিয়ে এনে, হুমায়ুন তার লোকদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে থাকে। আমার প্রিয় সাথীরা, আমার অবশ্যই তোমাদের আরো কিছু সম্বন্ধে অবহিত করা উচিত। আমি আমার সৎ-ভাইকে আরো প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে এই অঞ্চল ত্যাগ করে পারস্যে গমন করবো। আমার মনে হয় না সেখানে রাজত্বকারী শাহ। তামা আমাকে নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করবেন কিন্তু সেখানের উদ্দেশ্যে যাত্রাটা অনেক কষ্টসাধ্য হবে, রুক্ষ আর বরফাবৃত প্রান্তরের উপর দিয়ে কয়েকশ মাইল পথ আমাদের পাড়ি দিতে হবে। যাত্রা শেষ হবার আগে আমাদের হয়ত এমন বিপদ আর বঞ্চনার মুখোমুখি হতে হবে যার কথা আমাদের কল্পনাতেও নেই। আমার অনুগামী হবার জন্য আমি তোমাদের আদেশ করছি না… তোমরা যদি দেশে ফিরে যেতে চাও, তাহলে সসম্মানে যেতে পারো…কিন্তু তোমরা যদি আমার সঙ্গী হও, আমি আমার মরহুম আব্বাজান বাবর আর আমার পূর্বপুরুষ তৈমূরের নামে শপথ করে বলছি যে, পারস্য গমনের প্রতিশ্রুতি আমি রক্ষা করার পরে আমাদের সেখানে অবস্থানকাল খুবই সংক্ষিপ্ত হবে। অন্যায়ভাবে জবরদখল করা আমার প্রতি ইঞ্চি ভূমি আমি পুনরায় দখল করবো এবং আমার অনুগামী যারা হবে তারা আমার ইচকিরা- সেইসব গৌরবময় অভিযানের অংশীদার হবে যা নিয়ে একশ বছর পরেও তাঁদের বংশধরেরা গর্বের সাথে আলোচনা করবে।
হুমায়ুন কথা থামিয়ে চারপাশে তাকায়। তার লোকদের চোখ মুখের অভিব্যক্তি তাকে বলে দেয় যে তার কথাগুলো আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকা ইস্পাত দৃঢ় সংকল্প- বিফলে যায়নি। যাই হোক এখনই তাঁকে ফেলে রেখে কেউ যাচ্ছে না। তাঁকে যে কোনো মূল্যেই তাঁদের এই বিশ্বাসের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।
*
চারপাশের পাহাড়ের হীরক-উজ্জ্বল শৃঙ্গসমূহ- রূপকথার গল্প থেকে উঠে আসা তুষার স্তম্ভের ন্যায়- দীপ্র প্রভায়, প্রায় মোহিনী সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। একমাস পরে, একটা সংকীর্ণ গিরিপথের ভিতর দিয়ে, যেটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে, হুমায়ুন তার সৈন্যসারির পুরোভাগে অবস্থান করে অগ্রসর হবার সময়ে চারপাশের দৃশ্যপট তাকে একেবারেই মোহিত করে না। বালুচ পথ প্রদর্শকদের, যারা পারস্যের সীমান্ত পর্যন্ত তাঁদের পৌঁছে দিতে রাজি হয়েছে, পরামর্শ অনুসারে হুমায়ুন তার লোকদের যত কম সম্ভব আওয়াজ করার আদেশ দিয়েছে। তারপরেও, হাত দিয়ে চোখের উপরে একটা আড়াল তৈরী করে উপরের চিকচিক করতে থাকা তুষার আর বরফাবৃত প্রান্তরের দিকে সে যখন তাকায়, সে জানে- যেমন তারা প্রত্যেকেই জানে যে জানান না দিয়ে যেকোনো সময় তুষারধ্বস শুরু হয়ে তাঁদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
বিপদ চারপাশে ওঁত পেতে রয়েছে। গতকালেরই কথা- সদ্য শেষ হওয়া তুষারপাতের কারণে ঢাকা পড়া হিমবাহের উপরিভাগের ফাটলে পড়ে আরেকটু হলেই তার একজন লোক মারা যেত। লোকটা যে খচ্চরটাকে টেনে নিয়ে আসছিলো সেটা তুষার শূন্যতায় উল্টে পড়ে কিন্তু নিয়তির এক অসাধারণ লীলাখেলার কারণে সে দশফিট নীচে একটা পাথুরে তাক আকড়ে ধরে কোনোমতে প্রাণ বাঁচায়। আহমেদ খানের দুই গুপ্তদূত দড়ির সাহায্যে পড়ে তাকে উপরে টেনে তুলে।
তাদের বেঁচে থাকার পথে প্রকৃতিই কেবল একমাত্র অন্তরায় নয়। এই বিরান, জনবসতিহীন অঞ্চলের ভিতর দিয়ে নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ অতিক্রম করে না। দস্যুর দল- বালুচ পথ প্রদর্শকেরা যাদের নিষ্ফলা প্রান্তরের পিশাচ বলে, মাটিতে চরম বিতৃষ্ণায় থুতু ফেলে- এইসব উঁচু অঞ্চলেই বিচরণ করে থাকে। কেউ কেউ এমনও গল্প করে যে তারা নাকি মানুষের মাংস খেতেও দ্বিধা করে না। হুমায়ুনের অনেকবারই মনে হয়েছে উপরের তুষারাবৃত গিরিকরের মাঝে সে মানুষের আনাগোনা দেখতে পেয়েছে কিন্তু তারপরে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালে আর কিছুই তার নজরে পড়েনি। সে যাই হোক, আড়াল থেকে কেউ তাদের উপর নজর রাখছে এই অনুভূতিটা তাঁর যায়নি এবং সে জানে যে আহমেদ খানও একই ধরনের অস্বস্তিবোধ করছে। কামরানের মতো শঠ আর ধূর্ত লোকের পক্ষে- হুমায়ুনের সম্ভাব্য যাত্রাপথ এবং তার সাথে মাত্র দুইশজন লোক রয়েছে জানার পরে খুবই স্বাভাবিক তাকে আক্রমণ করার জন্য ডাকাতদের ঘুষ দেয়া। হুমায়ুনের মৃত্যু, যদি দেখান যায় যে অন্যদের হাতে হয়েছে, কামরানের জন্য সেটা অনেকবেশী সুবিধাজনক হবে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি যাই থাকুক না কেন, প্রতিরাতে হুমায়ুন। প্রহরী মোতায়েন করে।
কিন্তু সে এটাও জানে যে তাঁদের ক্রমশ বেঁকে বসতে থাকা শারীরিক দূর্বলতা এই মুহূর্তে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে কারণ দূর্বলতার পেছন পেছন আসে অসাবধানতা। তাঁদের রসদ- শস্যদানা, শুকনো ফল- সব প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গত তিন রাত খাবার বলতে একটা ছোট আগুনের উপরে শিরোস্রাণে ফোঁটান আঁশালে ঘোড়ার মাংস। অচিরেই তারা আর কোনো কিছু রান্না করতেও পারবে না। তাদের সাথে যা কাঠ আর কয়লা ছিল সব প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে।
হুমায়ুন ঠাণ্ডায় কেঁপে উঠলে তার প্রতিটা হাড়ে যেন ব্যাথার একটা ঢেউ বয়ে যায়- সে তাঁর আব্বাজান বাবরের হিন্দু কুশ অতিক্রমের গল্প স্মরণ করে, কিভাবে উপর থেকে সহসা আছড়ে পড়া বরফ তার লোকদের ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে, কিভাবে গভীর হিমবাহের মুখোমুখি হয়ে সে তার লোকেরা পর্যায়ক্রমে বরফ বিদীর্ণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সেটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার ভিতর দিয়ে পথ করে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। বাবর কেবল দৃঢ়সংকল্প হয়ে সব বাধা অতিক্রম করেছে এবং তাকেও ঠিক তাই করতে হবে।
