সে চাইলে আসতে পারে। কামরান আবার হুমায়ুনের দিকে তাকায়। তোমার যোদ্ধাদের চেয়ে দেখছি তোমার রমণীরা অনেক বেশী সাহসী। ঘুমন্ত অবস্থায় তোমার লোকদের আমরা বন্দি করেছি। বাজারে বিক্রি করার জন্য মুরগী যেভাবে বেঁধে রাখা হয় তাবুর ভিতরে তাঁদের সেভাবেই বেধে রাখা হয়েছে। আজ রাতে রক্তপাত যা হয়েছে, সেটা তোমার স্ত্রীর কারণেই হয়েছে। মাহাম আগা কিছু নেবার থাকলে দ্রুত গুছিয়ে নাও। আমরা পাঁচ মিনিটের ভিতরে রওয়ানা হব। আর একটা কথা না বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে তাবু থেকে বের হয়ে যায়।
দুই রমণী শেষবারের মতো আলিঙ্গণ করার সময়ে, হুমায়ুন দেখে মাহাম আগা হামিদার কানে কিছু একটা বলছে। তারপরে, কামরানে যোদ্ধাদের কড়া দৃষ্টির সামনে দুধ-মা দ্রুত তার সন্তানকে কোলে তুলে নেয় এবং আকবর আর তার নিজের যৎসামান্য জিনিষপত্র আরেক হাতে নিয়ে প্রহরাধীন অবস্থায় তাবু। থেকে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই হুমায়ুন আর হামিদা বাইরে থেকে তুষারের উপরে ঘোড়ার খুরের চাপা আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে এবং তারপরে সব আবার আগের মতো স্তব্ধ হয়ে যায়। হুমায়ুন এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে বাইরে যায়। তুষার ঝড় শেষ হয়েছে এবং বাইরের রুক্ষ ভূ-প্রকৃতি অনেকটাই মোলায়েম হয়ে উঠেছে বরফাবৃত হয়ে। এতোটাই স্থির আর অকপট যে প্রায় নিখুঁত সৌন্দর্যমণ্ডিত একটা দৃশ্যপট।
৩.১ কোহ-ই-নূর বিসর্জন – তৃতীয় পর্ব
তৃতীয় পর্ব – কোহ–ই-নূর বিসর্জন
১৫. শাহ তামাস্প
সেদিন সকালবেলা, বরফের ভিতরে হুমায়ুন তার লোকদের নিজের চারপাশে জড়ো করে, কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে তাঁদের নিঃশ্বাস কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। তার লোকদের কেউই মারাত্মকভাবে আহত হয়নি। তারা হামলার সম্মুখীন হয়েছে এটা বোঝার আগেই চামড়ার ফিতে দিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু হুমায়ুনের মতোই তাঁদের সবার মেজাজই বিগড়ে রয়েছে এবং সে বুঝতে পারে কেন- তাদের যোদ্ধার সংহিতা লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষই, নিজের অন্তরের অন্তস্থলে লড়াইয়ের একটা সুযোগ প্রত্যাশা করে। তরবারির ফলায় আহত হবার চেয়ে শত্রুর হাতে বেকায়দায় ধরা পড়ার লজ্জা অনেক বেশী যন্ত্রণাদায়ক। ক্ষতচিহ্ন নিদেনপক্ষে সম্মানের একটা স্মারকচিহ্ন বটে। তাবুর ভিতরে ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়ার মাঝে গৌরব কোথায়?
গতরাতে যা ঘটেছে তার জন্য তোমাদের কেউ দায়ী নয়। প্রহরী মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত আমিই নিয়েছিলাম।
আমরা কি ঘোড়া নিয়ে তাঁদের পিছু নেব? জাহিদ বেগ জানতে চায়।
না।
কিন্তু, সুলতান কেন? আমাদের চেয়ে বড়জোর এক কি দুই ঘন্টার পথ তারা এগিয়ে আছে…
জাহিদ বেগ, আমি কথা দিয়েছি, এবং কামরানের কথার দাম না থাকতে পারে কিন্তু আমার কথার মূল্য আছে। তাছাড়া, সে আমার সন্তানকে বন্দি করেছে। সে হুমকি দিয়ে গিয়েছে আকবরকে আমার চোখের সামনে হত্যা করবে এবং আমি বিশ্বাস করি সে সেটা করতে পারবে।
কিন্তু তৈমূর বংশীয় নবজাত যুবরাজদের জীবন পবিত্র বলে গন্য করা হয়। আমরা সবসময়ে সেটা মেনে এসেছি…।
কিন্তু আমার সৎ-ভাইয়ের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। উচ্চাশা তাকে অন্ধ করে ফেলেছে এবং তা গৌরবময় স্বপ্ন সত্য করার পথে সে কোনো ধরনের বাধা বরদাস্ত করবে না। আমার সন্তানকে সে খুশী মনে হত্যা করবে যদি আমি তাকে সামান্যতম কোনো অজুহাতের সুযোগ দেই।
হুমায়ুন দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। গুলবদনকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকা হামিদাকে কি কিছুক্ষণ আগেই সে একই কথা বলেনি, যাকে সে অন্য মেয়েদের সাথে মুখে কাপড় গোজা আর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় খুঁজে পেয়েছে? গুলবদন যদিও ভীষণ ভয় পেয়েছিল, সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছে কিন্তু হামিদাকে প্রশমিত করাতো সম্ভব হয়নি বরং মাঝে মাঝেই উন্মত্ত হয়ে উঠছে। আমাদের ছেলেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসো! হুমায়ুনকে উদ্দেশ্য করে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করছে। তোমার ধমনীতে যদি মানুষের রক্ত বলে কিছু থাকে তাহলে অন্য কিছু করার কথা তুমি কিভাবে ভাবতে পারছো?
কিন্তু তাঁদের বিয়ের পর এই প্রথম হুমায়ুন হামিদাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। তার সৎ-ভাইয়ের সত্ত্বার ভেতরে অশুভ কিছু একটা ওত পেতে রয়েছে। আকবরের নিষ্পাপ মাথার উপর দিয়ে তারা দুই ভাই যখন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিল তখন সেটা সে ভালো করেই দেখতে পেয়েছে। কামরান যা চায় সেটা পাবার জন্য সে যে কোনোকিছু করতে প্রস্তুত… সেজন্যই হামিদাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হুমায়ুন তাকে বলে কামরানকে অনুসরণ করার কথা চিন্তা করাও তাদের উচিত হবে না। সে আলতো করে হামিদার চুলে বিলি কাঁতে কাঁতে তাকে বলেছে, মাহাম আগা অন্তত আকবরের সাথে রয়েছে এবং এই মুহূর্তে তার উপরে ভরসা করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। ধীরে ধীরে প্রতিয়মান হয় যে যোগ্য ব্যক্তির উপরেই আস্থা রাখা হয়েছে। হামিদা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই তাকে বলে যে বিদায়ের আগ মুহূর্তে মাহাম ফিসফিস করে তার কানে কি বলেছিল যে তার কাছে একটা খঞ্জর রয়েছে যার ফলায় বিষ মাখান রয়েছে। আকবরের কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তাকে সেজন্য মৃত্যুবরণ করতে হবে।
