হুমায়ুন তার ভাই এবং তার লোকজনের সাথে নিজের দূরত্ব বিবেচনা করে আর ভাবে, আকবর আর হামিদা যদি এই মুহূর্তে তার সাথে কেবল না থাকতো সে তাহলে অনায়াসে কামরানকে ধরাশায়ী করতে পারতো। হুমায়ুন খুব ভালো করেই জানে কামরানের লোকেরা তীর কিংবা খঞ্জর নিক্ষেপ করার আগেই সে লাফিয়ে উঠে তাকে জাপটে ধরে বর্ম হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু সে যেভাবে শুয়ে ছিল সেভাবেই থাকে কিছুই করতে পারে না কেবল তাকিয়ে দেখে, আকবরকে ভেড়ার পুরু যে চামড়াটা দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছিল কামরান সেটা সরিয়ে ভিতরে উঁকি দেয় এবং তার্তস্বরে কাঁদতে থাকা খুদে মুখটার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকায়।
বেটাকে আমার কোলে দাও।
হামিদা আবারও হুমায়ুনের দিকে তাকায় এবং আবার সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
আকবরকে কামরান কোলে নিতে, সে বোধহয় পরিবর্তনটা পছন্দই করে এবং সহসা কান্না থামিয়ে শান্ত হয়ে যায়। কামরান খুব দ্রুত আকবরকে খুঁটিয়ে দেখে। বেশ, হুমায়ুন, আমার প্রস্তাব মেনে নিতে কি তুমি রাজি? কামরান কথা বলার মাঝেই আকবরের ছোট ছোট হাতগুলোর একটা আলতো করে ধরে, কিন্তু বিছানার অপরপাশে শুয়ে থাকা হুমায়ুনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চোখের তারায় কোনো ভাব খেলা করে না যেন সে মাংসের একটা দলা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
আমি তোমার প্রস্তাব মেনে নিচ্ছি, কারণ মেনে নেয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখো। একদিন আমি তোমাকে তোমার আজকের এই কৃতকর্মের জন্য চরম শাস্তি দেবো।
তোমার উত্তরাধিকারী আমার হাতে খেলা করছে, মনে রেখো। আমাকে যদি আরো প্ররোচিত করো, আমি তাহলে আমার লোকদের আদেশ দেবো একে বাইরে নিয়ে গিয়ে খালি গায়ে বরফের উপরে যেন শুইয়ে দেয়। নেকড়ে বা শীতের কবল থেকে তোমার কি মনে হয় কতক্ষণ সে বেঁচে থাকতে পারবে?
হামিদা আতঁকে উঠে জোরে শ্বাস নেয় এবং হুমায়ুন অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখে হাস্যরত আকবরের থুতনির নীচে কামরান খেলাছলে নেড়ে দেয়।
শেষ কোনো কথা, আমার সুবক্তা সৎ-ভাই, এমনকি কোনো বিদায় সম্ভাষণ উচ্চারিত হবে না। তোমার মতো একজন মহান সম্রাটের পক্ষে এটা মানানসই না, এতটা সৌজন্যহীনতা। দুই ভাই পরস্পরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিন্তু হুমায়ুন দাঁতে দাঁত চেপে রেখে নিজেকে নির্বাক রাখে। কামরান উদ্ধত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাবুর প্রবেশ পথের দিকে এগিয়ে যায়, আকবর তখনও তার কোলেই রয়েছে।
আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও! হামিদা এবার চিৎকার করে উঠে।
কামরান তার দিকে ঘুরে তাকায়। হুমায়ুনকে আমি এক কানা কড়ি দিয়েও বিশ্বাস করি না, যতই সে বুক ফুলিয়ে বড়াই করুক না কেন যে সে কথা দিয়ে কথা রাখে। সে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেইমতো সে কাজ করবে এবং পারস্যে যাবে, সেজন্য জামিন হিসাবে আমার একটা কিছু প্রয়োজন। আমার প্রিয় ভাস্তে হবে সেই জামিন…।
কামরান তার কথা শেষ করার আগেই হামিদা বাঘিনীর দ্রুততায় তাঁকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে আকবরকে টেনে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করে। আকরব পুনরায় তার্তস্বরে কাঁদতে শুরু করলে, কামরান জোরে একটা ধাক্কা দেয় হামিদাকে। হামিদা ছিটকে পেছনের দিকে উল্টে পরার সময় একটা কাঠের সিন্দুকের কোণের সাথে তাঁর মাথা ধাক্কা খায়। কারমরা তাঁর এক লোকের হাতে আকবরকে তুলে দেয়। আমার ভান্তেকে বাইরে নিয়ে যাও, সে তাকে আদেশ দেয়।
কিন্তু হামিদার তখনও কামরানের সাথে বোঝাঁপড়া শেষ হয়নি। মাথায় বেমক্কা আঘাত পাওয়ায় খানিকটা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে সে হাচড়পাঁচড় করে উঠে দাঁড়ায় এবং নিজেকে পুনরায় কামরানের উপরে আছড়ে ফেলে, তার হাতের নখ বেচারার মুখে আচড় কেটে বসে যায় এবং রক্ত বের হয়ে আসে। কামরান হামিদার দুকাঁধ শক্ত করে ধরে এবং এক ধাক্কায় তাঁকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কি লজ্জার কথা। তোমার এই লড়াকু মনোভাবের জন্য তোমার স্বামীর মতো অপদার্থ সম্রাটের চেয়ে তুমি অনেক দক্ষ একজন সম্রাজ্ঞী হতে পারতে।
এইসব হট্টগোলের মাঝে তাবুর পর্দা-বেষ্টিত অংশের পেছনে একটা আলোড়নের সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘকায়া মাহাম আগা পর্দার পেছন থেকে বের হয়ে আসে। ঘটনার আকষ্মিকতা আর বিভ্রান্তির কারণে মাহামের কথা হুমায়ুনের মনেই ছিল না। কামরানও একই রকম চমকে গিয়ে, হামিদাকে ছেড়ে দেয় এবং কোমর থেকে ছোরা বের করে। তুমি আবার কে? কামরানের গালে হামিদা যেখানে আচড় দিয়েছে সেখান থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে।
মাহাম আগা কামরানকে পাত্তাই দেয় না, সে সরাসরি হামিদার দিকে তাকিয়ে কথা বলে। রাজমাতা, আমি সবকিছু শুনেছি। আকবরের দুধ-মা হবার কারণে আমাকে অবশ্যই তার সাথে থাকতে হবে। আমি আল্লাহর নামে শপথ করে আপনাকে বলছি যে নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমি তাকে রক্ষা করবো। তাঁর চোখের নিম্নাংশের চওড়া হাড়যুক্ত, সুদর্শন মুখাবয়বে একটা একগুয়ে অভিব্যক্তি ফুটে উঠে।
হামিদার চোখের অশ্রু টলটল করে কিন্তু কামরানের দিকে ঘুরে দাঁড়াবার অবসরে সে নিজেকে সংযত করে। আমার ছেলের দুধ-মা, ওর নাম মাহাম আগা। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি আমার সন্তানের যত্ন নেবার জন্য তুমি তাঁকে সাথে করে নিয়ে যাবে।
