আমি তাঁকে হত্যা করিনি, যদি এটাই তুমি বোঝাতে চাও। আমাকে অসম্মান করার জন্য জালালাবাদে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
আমার সাথে তুমি যেভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিজের রক্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শেরশাহের সাথে মৈত্রীর প্রস্তাব দিয়ে তারপরে অসম্মান নিয়ে কথা বলতে তোমার রুচিতে বাধে না? কাবুলে চোরের মতো নিঃশব্দে এসে হাজির হয়েছে?
কাউকে সমালোচনা করার মতো অবস্থানে তুমি নেই। তোমার পাশে যে সুন্দরী শুয়ে রয়েছে- আমি যতদূর শুনেছি তাকে তুমি হিন্দালের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। কামরান বিপজ্জনক ভঙ্গিতে হামিদার দিকে ঝুঁকে আসে। কিন্তু তাঁকে দেখে এখন আমি বুঝতে পারছি ছিনিয়ে নেয়ার মতোই একটা মেয়ে বটে। আমিও চাই না ভ্রাতৃপ্রতিম প্রেম, কিংবা আনুগত্য আমার পথরোধ করে দাঁড়াক।
হুমায়ুন টের পায় উত্তেজনায় হামিদার স্নায়ু টানটান হয়ে আছে এবং সে আরো জোরে তাঁর বাহু চেপে ধরে। কামরান, তুমি কি চাও? তুমি যদি আমাকে হত্যা করতে চাইতে এতক্ষণে তাহলে আমার কবন্ধ দেহটা মাটিতে পড়ে থাকতো।
সত্যি বলেছো। রক্তের বন্ধন আর ভ্রাতৃপ্রতিম ভালোবাসা নিয়ে আমার ভিতরে তোমার মতো কোনো আবেগ কাজ করে না। আমার কাছে, বিষয়টা সবসময়েই ছিল তকতা তখত- সিংহাসন কিংবা শবাধার।
তাই যদি হয় তাহলে তুমি কালক্ষেপন করছো কেন?
আমার তরবারির ফলায় তোমার শ্বাসনালী কেবল একটা কারণেই আমি দ্বিখণ্ডিত করিনি- যদিও আমার হাত নিশপিশ করছিল- সেটা হল তোমায় হত্যা করলে আমাদের বংশে একটা রক্তাক্ত সংঘাত শুরু হবে। কিন্তু তোমাকে পরাজিত করতে এবং তোমার সাথে ক্ষমাসুলভ আচরণ করতে যদি আমায় দেখে, তোমার প্রতি অনুগত গোত্ৰপতিরা তাহলে আমাকে তাদের সমর্থন জানাবে। মৃত্যুর চেয়ে বরং নিগৃহীত অবস্থায় বেঁচে থেকেই তুমি আমার অনেকবেশী উপকার করবে।
তাহলে তোমার অভিপ্রায় এখন কি?
তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে আমাদের পিতৃপুরুষের জন্মভূমি এবং হিন্দুস্তান তুমি ত্যাগ করবে এবং এতোটাই দূরে যাবে যে আমি যেন ভুলে যেতে পারি যে তোমার কখনও অস্তিত্ব ছিল।
কোথায় যাবো?
পারস্যের আবহাওয়া শুনেছি চমৎকার এবং সেখানকার বিলাসবহুল জীবনযাপন পদ্ধতি তোমার পছন্দই হবে- সুন্দরী রমণী আর আফিমের অফুরান জোগান।
এবং আমি যদি যেতে অস্বীকার করি?
আমি তাহলে এখানে এখনই তোমায় হত্যা করবো এবং একাই গোত্রপতিদের ঝামেলার মুখোমুখি হব। আমার হাতে তোমার উষ্ণ রক্তের অনুভূতি আমি উপভোগই করবো।
আমি একটা বিষয় এখনও বুঝতে পারিনা তুমি আমায় কেন এতো ঘৃণা করো। আমাদের আব্বাজান আমাকে উত্তরসূরী নির্বাচিত করেছেন এটা আমার দোষ না।
সেটা তোমার দোষ না? তোমার কারণেই তিনি কদাচিৎ আমাকে নিয়ে চিন্তা করেছেন। একজন পূর্ণাঙ্গ যোদ্ধার ভূমিকায়, তিনি যা অর্জন করার আশা করেছিলেন তাঁর উজ্জ্বল স্মারক হিসাবে, তুমি দারুণ অভিনয় করেছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই আমি নিজের সম্বন্ধে তোমার দর্পোদ্ধত আত্মগর্ব ঘৃণা করেছি এবং তুমি ধরেই নিয়েছিল আমি মুগ্ধ চিত্তে তোমায় খুশী মনে অনুসরণ করছি। আমরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলাম, তুমি ধরে নিলে তখনও তুমি আমায় তোমার অধস্তনের মতো পৃষ্ঠপোষকতা করবে…কিন্তু আমারও যে তোমার মতোই প্রবল উচ্চাশা… রক্ত আর ঘাম ঝরিয়ে আমাদের আব্বাজানের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য আমার চাই এবং বাবরের যে কোনো সন্তানের চেয়ে আমি অনেকবেশী যোগ্য। আসকারি ইতিমধ্যে সেটা মেনেও নিয়েছে এবং আমি যা বলবো সেটাই করবে। হিন্দালের ঘটে যদি বুদ্ধি থাকে তাহলে সেও দ্রুত আদেশ পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। আমি যখন প্রস্তুত হব তখন আমি শের শাহের মুখোমুখি হবে আর তাকে আমাদের সাম্রাজ্য থেকে বিতাড়িত করবো। আগ্রা আর দিল্লীতে আমার নামে খুতবা পাঠ করা হবে এবং আমি আর আমার সন্তানেরা- তোমার সন্তানেরা নয়- মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবে। তুমি তোমার সুযোগ পেয়েছিলে এবং ব্যর্থ হয়েছে।
তোমার স্বভাব সম্বন্ধে আমাদের আব্বাজান ভালোই অবহিত ছিলেন যে তুমি একাধারে আত্মকেন্দ্রিক, শঠ, এবং সেইসাথে আমার শত্রু… যে তুমি একটা বিশ্বাসঘাতক… তিনি আমাকে সতর্ক করতে চেষ্টা করেছিলেন।
খামোশ শয়তান, কামরানের কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়ে যায় এবং আকবর কাঁদতে শুরু করে।
তোমার ছেলের গলা দেখছি জোরাল এবং প্রাণবন্ত, হামিদার পাশে রাখা দোলনার দিকে তাকিয়ে কামরানের চোখের সবুজ মণি জুলজুল করে উঠে। আমার ভান্তেকে আমায় দেখতে দাও, হামিদার দিকে তাকিয়ে সে আদেশের সুরে বলে।
হুমায়ুনের দিকে বেচারী উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকালে, সে মাথা নাড়ে। হামিদা পরণের আলখাল্লাটা ভালোমতো জড়িয়ে নিয়ে, বিছানা থেকে নামে এবং দোলনা থেকে আকবরকে কোলে তুলে নিয়ে ধীর পায়ে তাঁকে কামরানের কাছে নিয়ে যায়।
আমার ভাইয়ের দিকে লক্ষ্য রাখো। সে যদি চোখের পলকও ফেলে তাঁকে খুন করবে, কামরান তার লোকদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলতে, আঁধারের ভিতর থেকে তিনজন বের হয়ে এসে হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে যায়। কামরান ইতিমধ্যে হুমায়ুনের গলা থেকে খঞ্জরের ফলা সরিয়ে নিয়ে, সেটাকে খাপের ভিতর ঢুকিয়ে রাখে এবং হামিদার দিকে এগিয়ে যায়।
