তাঁরা কাছেই একটা ধাতব পাত্র রেখে সেটাতে ভাক্কার থেকে নিয়ে আসা এই মুহূর্তে সোনার চেয়েও দামী কাঠকয়লা দিয়ে ভর্তি করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়- হুমায়ুন বা হামিদার জন্য না বরং আকবরের জন্য সেই রাতে তাবুতে সেও তাঁদের সাথে থাকবে। হামিদা চারপাশের বুনো প্রান্তরের কারণে অনুরোধ করেছে যে তাঁর সন্তান রাতে যেন তাঁর কাছেই ঘুমায়। মাহাম আগা যাত্রাকালীন পূর্ববর্তী রাতগুলোর মতোই তাঁর ছেলের সাথে ঘোড়ার পিঠে বিছাবার কম্বল দিয়ে তাবুর একাংশ পরিবেষ্টিত করে সেখানেই ঘুমাবে। হুমায়ুন তাঁর শিবিরের বাকি অংশ পরিদর্শনের সময় লক্ষ্য করে যে তার লোকেরা স্বাভাবিকের চেয়ে কম তাবু স্থাপন করেছে। তাঁরা গাদাগাদি করে ঘুমাবে, নিজেদের শরীর উষ্ণ রাখতে অন্যের দেহের উষ্ণতা ব্যবহার করবে।
সুলতান, একটা ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। আহমেদ খান এসেছে, মাথার মস্তকাবরনী বরফে সাদা হয়ে রয়েছে। জাহিদ বেগ আর আমি শিবিরের চারপাশে প্রহরী মোতায়েন করছি। আপনার দেহরক্ষীদের ভিতর থেকে চারজন আপনার তাবুর বাইরে পাহারায় থাকবে।
হুমায়ুন নিজের চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে। ক্রমশ জোরাল হতে থাকা বাতাসের প্রকোপে ঘুরপাক খেতে থাকা তুষার এখন এতোই ঘন যে সে তাঁর সেনাপতির মুখই ঠিকমতো দেখতে পায় না। গত রাতে পাহারায় নিয়োজিত লোকদের একজন হিম-দংশের শিকার হয়েছে এবং হেকিম আশঙ্কা করছেন লোকটার কালো হয়ে থাকা পায়ের আঙ্গুলগুলো শেষ পর্যন্ত হয়তো কেটে ফেলতে হবে। আহমেদ খান নিজেও গতকাল মাঝরাতে প্রহরীদের পরিদর্শন করতে গিয়ে সর্দি-কাঁপুনির সংক্রমনের ফলে আজ সারাদিন কাশির দমকে অস্থির ছিলেন। আপনাকে ধন্যবাদ, আহমেদ খান কিন্তু আমার মনে হয়
এই বুনো প্রান্তরে আমাদের চিন্তিত হবার কোনো কারণ রয়েছে। পথের ধকলে সবাই ক্লান্ত আর শীতও বেশ জাকিয়ে পড়েছে। আজ রাতে সবাইকে বিশ্রাম নিতে দেন। আপনিও বাদ যাবেন না। আপনার কাশি হয়তো তাহলে খানিকটা প্রশমিত হতে পারে।
শিবিরের চারপাশে দমকা বাতাসের গর্জন আর তার তাবুর গায়ে এসে হামলে পড়া সত্ত্বেও, সেই রাতে হামিদাকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে শোয়ার সাথে সাথে হুমায়ুন ঘুমিয়ে যায়, তাদের দুজনকে ভেড়ার যে চামড়াটা ঢেকে রেখেছে সেটার উপরে হামিদার ফারের আবরন দেয়া আলখাল্লাটা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আকবরের চকিত কান্নার শব্দ তাঁর স্বপ্নে আলোড়ন তুলেই আবার হারিয়ে যায়। হুমায়ুন হামিদার কাছে সরে আসে, নিজের দেহের কাছে তার উষ্ণ পেলব দেহটা টেনে এনে সে নিদ্রার অতলে আবার তলিয়ে যায়। তারপরে সহসাই সে নিজের গলায় শীতল, ধারাল ইস্পাতের স্পর্শ অনুভব করে। সে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে পরিচিত একজোড়া চোখ, কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরী মশালের আলোয় জ্বলজ্বল করছে, আরেকজন লোক মশালটা ধরে রয়েছে। এটা হতে পারে না- বরফাবৃত গিরিপথের শেষে অনেক দূরে অবস্থিত কান্দাহারে তাঁর থাকার কথা। কিন্তু বাজপাখির মতো সরু নাকের উপরে অবস্থিত- তাঁদের আব্বাজানের চোখের মতোই সবুজ- বিজয়োন্মত্ত ঐ চোখ কোনভাবেই আর কারো হতে পারে না। কামরান!
হুমায়ুন সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে মুখটা মাত্র খুলতে যাবে কিন্তু কামরানের খঞ্জরের অগ্রভাগ তাঁর গলায় খোঁচা দিচ্ছে টের পায় এবং এক ফোঁটা রক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে। বিছানার পাশেই ছায়ার ভিতরে সে আরো কয়েকটি অবয়বকে আবছাভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, সম্ভবত কামরানের হুকুমবরদার, উদ্যত অস্ত্র হাতে নিরবে তাকিয়ে রয়েছে।
একটা শব্দ করো আমি তাহলে খুশী মনে তোমার গলাটা দুভাগ করে দেবো, কামরান বলে। তুমি জানো কাজটা করতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না।
কামরান ফিসফিস করে কথা বলার সময়, তার আওয়াজে হামিদা জেগে উঠে, সে ঘুমঘুম চোখে মুখের উপর থেকে নিজের কালো চুল সরিয়ে দেয়। সে পুরোপুরি চোখ খুলতে, হুমায়ুন তাকে আশ্বস্ত করতে তাঁর বাহুর উপরে আলতো করে একটা হাত রাখে। চারপাশে কি ঘটছে বুঝতে পেরে হামিদা চিৎকার করে না বা কাঁদে না কিন্তু তার পাশেই একটা দোলনায় শুয়ে থাকা আকবরের দিকে তাকায়।
ভাইজান, তুমি অসতর্ক ছিলে। এতো সহজে আমি তোমার তাবুতে প্রবেশ করতে পারবো কখনও চিন্তা করিনি, কামরান বলে। গত কয়েকদিন ধরেই আমার লোকেরা তোমার গতিবিধির উপরে নজর রাখছিলো। তুষারঝড় আমাকে সুযোগটা করে দিয়েছে। কাবুলের চারপাশে অবস্থিত পার্বত্য এলাকায় আমাদের আব্বাজান কি শিখিয়েছিলেন, তুমি নিশ্চয়ই সেটা ভুলে গিয়েছো- তুষার কিভাবে হানাদারের বন্ধু, কিভাবে সে শব্দের কণ্ঠরোধ করে। তোমার লোকেরা কোনো শব্দই টের পায়নি। আমরা তাদের তাবুর ভিতরে অবোধ পশুর মতো গাদাগাদি করে শুয়ে থাকা অবস্থায় খুঁজে পেয়েছি।
তাদের আর মেয়েদের সাথে তুমি কি করেছো?
কামরান কোনো উত্তর দেয় না, কেবল হাসে।
আমি এই পথ দিয়ে আসছি, তুমি কিভাবে জানতে পারলে?
আমি ধারণা করেছিলাম যে একটা সময়ে তুমি উত্তরে আসতে চেষ্টা করবে। আমি গত কয়েকমাস হিন্দুস্তান থেকে বের হবার সবগুলো পথের দিকে নজর রেখে আসছি।
আসকারি কোথায়?
সে কাবুলে রয়েছে।
আর হিন্দাল, তাঁর সাথে তুমি কি করেছো?
