তাদের পেছনেই দেহরক্ষীর দল রয়েছে তারপরেই গুটিকয়েক ভারবাহী প্রাণীর একটা দল- পিঠে চাপান বোঝার ভাবে হাঁসফাঁস করতে থাকা কয়েকটা উট এবং খচ্চর- এবং একেবারে শেষে তার বাকী লোকেরা, প্রত্যেকের ঘোড়ার পিঠের দুপাশে পেটমোটা ব্যাগ ঝুলছে, ঢাল পিঠের সাথে শক্ত করে আটকানো আর রণকুঠার এবং গাদাবন্দুকগুলো পর্যাণের সাথে শক্ত করে বাঁধা। তার মতো, তাঁদের মুখের নিম্নাংশ মুখ ঢাকার কাপড় দিয়ে ঢাকা এবং হাড় কাঁপান তুষারের চাবুক মুখে হন্যে হয়ে উঠা বাতাসের প্রকোপ থেকে বাঁচতে তাঁদের ঘাড়ের উপরে মাথাগুলো নীচু করে রাখা। আজ রাতে, তাঁর মতো তারাও, একটা বুড়ো খচ্চরের মাংস দিয়ে আহার করবে বেচারা তাঁর পিঠের বোঝর নীচে লুটিয়ে পড়েছিল, যা খামির-বিহীন রুটি, বার্লি বা চালের তৈরী জাউয়ের একঘেয়ে খাবারের তালিকায় তাদের জন্য কিছুটা হলেও বৈচিত্র্য নিয়ে আসবে।
হুমায়ুন ভেবে দেখে- একজন সম্রাটের সেনাবাহিনীর চেয়ে তার আব্বাজানের আক্রমণকারী দলের সাথেই তাঁদের মিল বেশী- বর্ণিল পোষাক পরিহিত একটা বিচিত্র কাফেলা। এই বরফাচ্ছন্ন বিরান প্রান্তরের ভিতর দিয়ে নিজের খুদে বাহিনীটাকে পা টেনে টেনে হাঁটতে দেখার দৃশ্যটা চাবুকের তীব্র কশাঘাতের মতো তাঁর কতটা অধঃপতন হয়েছে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। একই রকম যন্ত্রণাদগ্ধ ব্যাপার যে সে এখন সিন্ধুনদ অতিক্রম করেছে, বেলুচিস্ত স্থানের পাহাড়ে আরোহনের জন্য তারমানে এই মুহূর্তে হিন্দুস্তানে বাবরের চারপুত্রের একজনও নেই। ব্যাপারটা এমন যেন বাবরের অভিযান কখনও ঘটেনি এবং সম্ভবত সে, যদিও আগে কখনও সে বিষয়টা স্বীকার করেনি। বাবরের প্রিয়তম এবং প্রশ্রয়প্রাপ্ত সন্তান নিশ্চয়ই এজন্য কিছুটা হলেও দোষী। নিজের পরিবারের ভিতরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সৃষ্ট বিপদের মাত্রা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা সে আগে বুঝতে পারেনি। বিশেষ করে কামরানের বৈরীতার গভীরতাকে সে ছোট করে দেখেছিল। অনেক দেরী হয়ে যাবার পরে সে বুঝতে পেরেছে যে কামরান নিজের উচ্চাকাঙ্খ ত্যাগ করে তাঁকে মোগল সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখার চেয়ে মোগলদের পতন দেখতেই পছন্দ করবে।
হুমায়ুনের ঘোড়াটা বরফে পিছলে গিয়ে হোঁচট খেতে কল্পলোক থেকে এক ঝটকায় তাকে বাস্তবে নিয়ে আসে। সে পর্যাণের উপরে নিজের পুরো ওজন পিছনের দিকে দিয়ে চেষ্টা জন্তুটাকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করতে এবং ফিসফিস করে অভয়বাণী বলতে থাকলে, নাক দিয়ে সজোরে নিঃশ্বাসের সাথে কুয়াশার কুণ্ডলী নির্গত করে, বেচারা কোনোমতে চারপায়ের উপরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সে মনে মনে ভাবে এইসব পাহাড়ের আড়াল থেকে বের হতে পারলে তার চেয়ে খুশী আর কেউ হবে না, এবং কনকনে বাতাসের ঢেউ তাঁর দিকে ধেয়ে আসলে কাঁধের উপরে মাথাটা আরো ঝুঁকিয়ে আনে। তাঁর ভাবনায় কিছুক্ষণের ভিতরেই তাঁর সৎ-ভাইয়েরা এসে উঁকি দেয় তুষারের মাঝে অবিশ্রান্ত পথ চলার এই দিনগুলোতে যা তারা প্রায়ই করে থাকে, এইবার এসেছে হিন্দাল। সে এখন যখন বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ পায়, অনুধাবন করে দারুণ কৌশলে কান্দাহার দখল করায় সে তাঁর সবচেয়ে ছোট এই সৎ-ভাইটির প্রতি ক্রুদ্ধ হবার চেয়ে বরং কামরান আর আসকারির হাতে তার নিরাপত্তা নিয়েই বেশী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। সে যদিও উৎকণ্ঠিত গুলবদনকে আশ্বস্ত করেছে যে তাঁরা তাঁর ভাইয়ের কোনো ক্ষতি করবে না, সে নিজে ততটা নিশ্চিত নয়। একজন প্রতিদ্বন্দ্বিকে ক্ষমতার পথ থেকে সরিয়ে দেবার এমন সুযোগ কামরান অন্তত খুশী মনে গ্রহণ করবে।
দূর থেকে একটা ভৌতিক, বিষণ্ণ গর্জন, যা একে বয়ে আনা বাতাসের মতোই হাড় কাঁপানো, আতঙ্কে হুমায়ুনের ঘোড়াটাকে অস্থির করে তুলে। এইসব বিরান, জনমানবহীন পাহাড়গুলোয় নেকড়ের পাল গিজগিজ করছে। রাতের বেলা তারা কখনও কখনও তাদের শিবিরের এতটাই কাছে চলে আসে যে অন্ধকারে হুমায়ুন তাদের হলুদ সরু চোখ জ্বলজ্বল করতে এবং সকালবেলা তাদের তাবুর চারপাশে পায়ের ছাপের একটা আল্পনা আঁকা থাকতে দেখেছে। তুষারপাত এখন আরও প্রবল হয়েছে এবং সামনের খাড়া পথটা উড়ন্ত তুষারকণায় অবগুণ্ঠিত হয়ে আছে।
আহমেদ খান, হুমায়ুন তার কাঁধের উপর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে ডাকে।
জ্বি, সুলতান?
এখনই তুষারঝড় শুরু হবে। আজ রাতের মতো আমরা এখানেই শিবির। স্থাপন করবো। পাহাড়ের গায়ের ঐ পাথুরে অভিক্ষেপটার নীচে আমরা খানিকটা হলেও আড়াল পাবো। হুমায়ুন বায়ু প্রবাহের বিপরীত দিকে মুখ করে থাকা ধুসর রঙের পাথরের একটা অতিকায় খণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে যা বাতাসের আর তুষারের যুগলবন্দি অনেকটাই সেটা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, এবং তাদের তাবুর জন্য অভিক্ষেপের নীচে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে বলে মনে হয়।
হুমায়ুনের লোকেরা ঘোড়ার পেছনের পায়ে ফাঁস বেধে দেয় এবং তাবুর সাজসরঞ্জাম বের করে, অভিক্ষেপের নীচে তাবু টাঙানো শুরু করে। এখনও যদিও দিনের আলো রয়েছে, ধুসর আন্তরিকতায় তুষারপাত শুরু হওয়ায় প্রতি মুহূর্তে আলোর রেশ কমে আসছে। দুজন লোক বাতাসের দিকে পিঠ দিয়ে কুঁজো হয়ে বসে এবং তাঁদের সাথের চকমকি পাথর আর ইস্পাতের বাক্স থেকে শীতে অসাড় হয়ে থাকা আঙ্গুলের সাহায্যে একটা খচ্চরের পিঠে বয়ে আনা শুকনো লতাগুল্মের খানিকটা নিয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে চেষ্টা করে। লতাগুল্মে ভালোমতো আগুন জ্বলে উঠার সাথে সাথে, তাঁরা তেলে ভেজান কাপড় দিয়ে বিশাল একটা মশাল জ্বেলে নিয়ে সেটাকে একটা লম্বা লাঠির অগ্রভাগে ভালোমতো জড়ায় এবং হুমায়ুনের তাবুর বাইরে লাঠিটা এনে পুতে দেয়।
