সাঈয়েদ আলী কেমন বিভ্রান্ত একটা দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাননীয় সুলতান, সত্যি বলতে কি, আপনার জানা উচিত এমন অনেক খবরই আছে, এমনকি সেটা জেনে আপনি হয়তো অসন্তুষ্টও হতে পারেন। কান্দাহার থেকে আগত পর্যটকেরা যারা ভাটি অঞ্চলের দিকে যাবার আগে এখানে যাত্রা বিরতি করেছিল, তাদের কাছে আমরা জানতে পেরেছি যে আপনার সৎ-ভাই হিন্দাল শহরটা দখল করে নিয়েছে।
হুমায়ুন এতো দ্রুত উঠে দাঁড়ায় যে সে কাঠের যে টুলটায় সে বসে ছিল সেটা উল্টে গিয়ে জ্বলন্ত কাঠের টুকরো ভর্তি ধাতব পাত্রের গায়ে গিয়ে ধাক্কা খায়। কিভাবে এটা সম্ভব হলো?
আমি যতদূর শুনেছি কোনো ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই সে শহরটা দখল করেছে। শহরের গভর্নর তাকে আপনার মিত্র বলে ভেবেছিল এবং তাকে আর তার সৈন্যবাহিনীকে সাদরে স্বাগত জানিয়েছিল।
হিন্দাল তাহলে এসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। হুমায়ুন যেমন সন্দেহ করেছিল যে সে কাবুল গিয়ে কামরান আর আসকারির সাথে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন না করে সে পশ্চিমে দিকে এগিয়ে গিয়ে কান্দাহারে নিজের স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছে। জ্বলন্ত কয়লার আগুনের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন শেষবার যখন হিন্দালকে দেখেছিল সেই কথা ভাবে, রক্তাক্ত আর চোখে-মুখে ঔদ্ধত্য কারণ হুমায়ুন হামিদাকে বিয়ে করতে চায় আর তাকে নিষেধ করা অসম্ভব।
হিন্দাল তাহলে কান্দাহার শাসন করছে… সে অবশেষে মন্তব্য করে।
না, সুলতান। কিন্তু আপনি বললেন…
সুলতান আরো কিছু ঘটনা ঘটেছে। হিন্দাল কান্দাহারে অবস্থান করছে জানতে পেরে আপনার সৎ-ভাই কামরান হিন্দালকে আদেশ করে নিজের অধিরাজ হিসাবে তাঁকে নিতে এবং তার অধীনস্ত একজন মামুলি শাসক হিসাবে কান্দাহারে অবস্থান করতে। হিন্দাল যখন অস্বীকৃতি জানালে কামরান আর আসকারি বিশাল একটা বাহিনী নিয়ে গিয়ে শহরটা দখল করে এবং হিন্দালকে বন্দি করে। তার ভাগ্যে কি ঘটেছে কেউ জানেনা…।
হুমায়ুনের হৃৎপিণ্ড দ্রুত লয়ে আন্দোলিত হতে থাকে। সে যা ধারণা করেছিল কামরান আর আসকারি তার চেয়েও নিকটে অবস্থান করছে… কাবুল থেকে অনেক নিকটে, কান্দাহারের দূরত্ব এখান থেকে তিনশ মাইলের বেশী হবে না। নিয়তিই হয়তো তাঁকে ভাক্কারে নিয়ে এসেছে। তার সাথে যদিও খুব অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে প্রায় দুইশ হবে তাঁদের সংখ্যা- তারা সবাই মোগল বংশোদ্ভুত, তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত যোদ্ধা- তার ইচকির দল। আর তাদের সাথে আরও অনেকেই যোগ দিবে যদি তারা লুটের মালের বখরা পাওয়া যাবে বলে মনে করে। স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে নিজেদের তরবারির নৈপূণ্য বিক্রির জন্য বেলুচিস্তানের পাহাড়ী অধিবাসীদের বেশ সুনাম আছে। সে যদি দ্রুত সব ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে তার সৎ-ভাইয়েরা সর্তক হবার আগেই সে কান্দাহার গিয়ে শহরটা দখল করে তাদের বন্দি করতে পারবে। অবশ্য এহেন সিদ্ধান্ত নেবার আগে আরো কিছু বিষয় আছে যা তাকে জানতে হবে।
সাঈয়েদ আলী, শের শাহের কি খবর? এই মুহূর্তে সে কোথায় অবস্থান করছে?
সে এই মুহূর্তে বাংলায় রয়েছে, সেখানে তার বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ হয়েছে। কিন্তু আমি এর চেয়ে বেশী আর কিছু জানি না… কেবল এটাই শুনেছি যে সবাই বলাবলি করছে হিন্দুস্তানে তার শাসন লোহার মতো মজবুত আর শক্তিশালী।
চমৎকার, হুমায়ুন মনে মনে ভাবে। শের শাহ বহুদূরে আর ব্যস্ত থাকার মানে, তার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিপদের আশঙ্কা সে করলেও পারবে।
সাঈয়েদ আলী আপনার আতিথিয়তার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ কিন্তু আপনি আমাকে যা বলেছেন সে জন্য তারচেয়েও বেশী কৃতজ্ঞ। আমি আমার লোকদের নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সিন্ধু নদ অতিক্রম করতে চাই… নদীতে খুব তীব্র স্রোত আর সে কারণে বিপজ্জনক কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই পার হবার জন্য আমাদের একটা নিরাপদ স্থান দেখাতে পারবেন…
*
বাতাসে শীতের প্রকোপ নতুন করে উদ্যমী হয়ে উঠায় হুমায়ুন ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে এবং তাঁর চারপাশে তুষারকণা এলোমেলো উড়তে থাকে। তার মাথা জমে শক্ত হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয় এবং সে পরণের ভেড়ার চামড়ার তৈরী লম্বা আলখাল্লাটায় শক্ত করে নিজেকে মুড়িয়ে নেয়। হুমায়ুনের লোকদের পথ দেখাবার জন্য আহমেদ খানের ভাড়া করা দুই বালুচি উপজাতি তার সামনে রয়েছে, যারা একটু আগেই তাকে আশ্বস্ত করেছে যে যাত্রা পথের অর্ধেক দূরত্ব তারা প্রায় অতিক্রম করে এসেছে এবং বরফাবৃত বোলান গিরিপথ দিয়ে নীচের দিকে নামছে, কান্দাহার থেকে খুব বেশী হলে একশ ত্রিশ মাইল দূরে। পথ প্রদর্শক দুজন সম্ভবত প্রশংসা শুনবে বলে আশা করেছিল কিন্তু তুষারপাত এবং পায়ের নীচের বরফের স্তর পুরু হবার সাথে সাথে হুমায়ুনের মনে হয়েছে অগ্রসর হবার গতি যন্ত্রণাদায়কভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। কিন্তু নিদেনপক্ষে তার অভীষ্ট লক্ষ্য- বিশ বছর পূর্বে মোগলদের জন্য স্বয়ং বাবরের দখল করা সেই বিশেষ শহর- কিছুক্ষণের ভিতরেই দৃষ্টিপটে ভেসে উঠবে।
হামিদা আর গুলবদন, তাঁদের পরণের পুরু উলের গাউনের উপরে ফারের আবরণ দেয়া বিপুলাকৃতি মস্তকাবরনীযুক্ত আলখাল্লা পরিহিত, টাটু ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় তার ঠিক পেছনেই রয়েছে। সংকীর্ণ, পিচ্ছিল পথে ষাড়ের দল চলাচলে একেবারেই অনুপযোগী হওয়ায় অনেকদিন আগেই তাদের জবাই করা হয়েছে এবং তাঁদের টানা মালবাহী শকটগুলোকে টুকরো করে জ্বালানী কাঠ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। মাহাম আগা- আকবর আর তাঁর নিজের পুত্র সন্তানকে নিয়ে, দুজনই শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য.গরম কাপড়ের ফালি দিয়ে বেশ পুরু করে জড়ান- উটের পিঠের দুপাশে ঝুলন্ত ঝুরির একটায় রয়েছে ভারসাম্য রক্ষার জন্য অন্য ঝুরিটায় জয়নাব রান্না করার সামান্য কিছু সরঞ্জাম নিয়ে ঝুলে আছে। বরফাবৃত পথ এতোটাই বিপদসঙ্কুল যে তিনটা প্রাণীকে নিরাপদে পথ দেখিয়ে আনতে হুমায়ুন তার লোকদের পায়ে হাঁটতে আদেশ দিয়েছে। কিন্তু এই তাপমাত্রায় উটকেও কেমন যেন কাবু মনে হয়, মাথা নীচু করে পা টেনে টেনে হাঁটছে, তাঁর দেহের পুরু পশমের উপরে সূচাগ্র বরফের স্ফটিক জমতে শুরু করেছে।
