রাণার সাথে আপনার আলোচনার ফলাফল কি হয়েছে? আপনার কি মনে হয় যে আমরা এখানে নিরাপদ? হামিদা জানতে চায়।
আমার তো তাই মনে হয়। রাণা যদিও নিজে একজন রাজপুত, মালদেব আর সে বোধহয় পরস্পরকে অপছন্দই করে। গতবছর, মালদেবের লোকেরা রাজস্থানী মরুভূমি অতিক্রম করার সময় অমরকোটের কাফেলায় হামলা করেছিল। কাফেলায় গমনকারী বণিকেরা যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে রাণার তত্ত্বাবধানে ছিল সে আক্রমণটাকে তাঁর প্রতি চুড়ান্ত অপমান হিসাবে গন্য করেছে। মালদেব অবশ্য রাণার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিধর বিধায় প্রতিশোধের চিন্তা বাতুলতা আর এ কারণেই মালদেবের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখারও তার ইচ্ছে নেই। সে মালদেবের জন্য আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, যদিও আমাদের পক্ষে বেশীদিন এখানে অবস্থান করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অমরকে দুর্গম এলাকায় অবস্থিত হলেও, একটা সময়ে আমাদের ধরার জন্য এখানে ঠিকই অনুসরণ করে এসে হাজির হবে। আমাদের পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব- যত দ্রুত তুমি হারানো শক্তি ফিরে পাবে- আমরা এখান থেকে বিদায় নেব।
কিন্তু এখান থেকে আমরা কোথায় যাবো?
উত্তরপশ্চিমে কেবলমাত্র কাবুল অভিমুখে গমন করাটাই আমাদের জন্য অর্থবহ বলে প্রতীয়মান হবে। আমি যতক্ষণ না শহরটা পুনরায় দখল করে কামরান আর আসকারিকে তাদের শঠতার জন্য শাস্তি দিচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত হিন্দুস্তানের বুক থেকে শের শাহকে উৎখাত করার কোনো সুযোগ আমি পাবো না… হুমায়ুন ইতস্তত করে। এটা হবে একটা বিপজ্জনক, কষ্টকর যাত্রা। আমি কি একটা নিরাপদ স্থান খুঁজে বের করে আমার সাথে তোমাদের মিলিত হওয়াটা যতক্ষণ নিরাপদ বলে প্রতিপন্ন না হয় সেখানে তোমাদের অবস্থানের বন্দোবস্ত করবো…?
না। আপনি ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে আপনি যদি আমার সঙ্গে থাকেন তাহলে অনেক রুক্ষ পরিবেশেও আমি মানিয়ে নিতে পারি। আমি আপনাকে বলেছি যে খানজাদা আমাকে উপযুক্ত দীক্ষাই দিয়েছেন। পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে তিনি কখনও রাজি হতেন না এবং আমিও রাজি হতে পারছি না…
*
এক সপ্তাহ পরের কথা, আবারও একবার হুমায়ুন তার অবশিষ্ট লোকদের পুরোভাগে অবস্থান করে মরুভূমির বিরান প্রান্তরের দিকে এগিয়ে যায় তাদের পেছনে অমরকোটের ধূলিমলিন দেয়াল ভোরের লালচে ধূসর অনিশ্চয়তার মাঝে বিলীন হয়ে যায়। ভাক্কারের দূর্গ, তার আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই, সিন্ধের শাসক, মির্জা হুসেনের স্বত্বাধীন একটা পর্যবেক্ষণ-ফড়ি, আপাতত তাঁদের গন্তব্যস্থল। এলাকাটা এখান থেকে প্রায় দুইশ মাইল দূরে সিন্ধের উত্তর সীমান্তে সিন্ধু নদীর তীরে অবস্থিত। তাঁরা দুজনে একটা আপাত লোক দেখান হার্দ্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়ে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল বলে হুমায়ুন আশা করছে, সেখানে সে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিতে পারবে। আর ভাক্কার যদিও প্রত্যন্ত এলাকা, বাইরের দুনিয়ায় কি ঘটছে সে হয়তো অবশেষে সে সম্বন্ধে অবগত হতে পারবে।
অতিক্রান্ত পথের প্রতি মাইল তাঁদের আক্রান্ত হবার ঝুঁকির কবল থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকায়, হুমায়ুন ঘোড়ার গতি দ্রুততর করতে থাকে। প্রতিদিন ভোরে সূর্যের প্রথম কিরণ দিগন্তের কোণে ব্ৰীড়া নম্র ভঙ্গিতে উঁকি দিতেই সৈন্যসারি যাত্রা শুরু করে এবং মধ্যাহ্নে ক্লান্ত প্রাণীগুলোকে খানিকটা বিশ্রাম দিতে আর রুটি, শুকনো মাংস ও কয়েক টুকরো কিশমিশ দিয়ে আহারের সময়টুকু বাদে তাঁদের বহরটা বিরতিহীন ভাবে সামনে এগিয়ে চলে। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ভিতরে, মরুভূমির উপর দিয়ে দীর্ঘ যাত্রা শেষে, চোখে পড়ার মতো প্রাণবন্ত সবুজের অবারিত সমারোহে মাতোয়ারা ফসলের মাঠ আর গ্রামের মাঝে তাঁরা প্রবেশ করে যে সেখান থেকে সিন্ধু নদীর অববাহিকা খুব একটা দূরে না। অচিরেই ভাক্কারের বেলেপাথরের তৈরী শক্তপোক্ত দেয়াল তারা দেখতে পায় আর পশ্চিমদিকে সিন্ধু নদীর অপর তীরে হুমায়ুন বেগুনী রঙের একটা আবছা অবয়ব দেখতে পায় বেলুচিস্তানের পার্বত্য অঞ্চল। কাবুলের পার্বত্য অঞ্চলের সাথে তাদের এতোটাই মিল যে সে টের পায় তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠেছে।
জওহর, ভাঙ্কারের দিকে এগিয়ে যেতে বলো। হিন্দুস্তানের মোগল সম্রাট এবং সিন্ধের মির্জা হুসেনের রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়, হুমায়ুনের নামে প্রবেশের অনুমতি চাইবে।
এক ঘন্টা পরে হুমায়ুন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে দূর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সেখানে তাকে স্বাগত জানাবার জন্য দূর্গের সর্বাধিকারীকে অপেক্ষমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। স্বাগতম, সুলতান, আমার প্রভুর পক্ষ থেকে আমি আপনাকে স্বাগত জানাই। অধমের নাম সাঈয়েদ আলী। দূর্গের সর্বাধিকারী নিজের বুকে হাত রেখে কথাগুলো বলার সময় হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে বাম কপালে একটা পুরাতন সাদা ক্ষতচিহ্ন আর ফিনফিন সাদা দাড়ির অধিকারী বেশ বয়স্ক একটা লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সেই দিন রাতের বেলা, ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আপেল কাঠের টুকরো ভর্তি একটা ধাতব পাত্র যার ওমে নদীর বুক থেকে বাতাসের সাথে ভেসে আসা শীতের প্রকোপ নাকচ হয়ে যায়, হুমায়ুন সাঈয়েদ আলীর সাথে জাহিদ বেগ আর কাশিমকে নিয়ে আলোচনায় বসে। আমার সৎ-ভাই কামরান আর আসকারির হাতে কাবুলের পতন হয়েছে একজন বার্তাবাহকের কাছে এই সংবাদ জানার পরে এই অঞ্চলে নতুন করে আর কি ঘটেছে সে সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণাই নেই। আপনি কি আমাকে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবেন?
