হামিদা… নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য উপযুক্ত শব্দের খোঁজে সে কথার মাঝে ছেদ টানে। জীবনে প্রথমবারের মতো আমার মনে হচ্ছে আমি একজন পিতার ভালোবাসার গভীরতা অনুধাবন করতে পারছি… পিতামাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার চেয়েও কত ব্যাপক এর বিস্তৃতি। আমাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে আমার আব্বাজান যে বিশ্বাস আর ভালোবাসার দেখিয়েছিলেন, আমি সবসময়ে তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখন যখন আমি নিজে একজন পিতা হিসাবে আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমার সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করে আমি একে বর্ধিত করবো- যাতে আমি আমার সন্তানের যোগ্য একটা উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারি।
হামিদা মাথা নাড়ে কিন্তু কোনো কথা বলে না। কিন্তু এসব ছাড়াও আরো কিছু বিষয় রয়েছে যা নিয়ে হামিদার সাথে আলোচনা না করলেই নয়- বিষয়টা আকবরের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হামিদাকে তাঁর জানাতেই হবে যে অচিরেই আরেকজন মহিলা তার সন্তানকে স্তন্যদান করবেন। তাঁদের নিশ্চয়ই একজন দুধ-মা নিয়োগ করতে হবে। মোগল রাজদরবারে কোনো মহিলার জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই মনোনীত মহিলা শাহজাদার দুধ-মা হবেন, তিনি তাঁর সাথে এমন একটা বন্ধনে আবদ্ধ হবেন যা সারা জীবন তার সাথেই টিকে থাকবে। তার নিজের সব সন্তানই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাহজাদার কুকালদাশে পরিণত হবে, তাঁর দুধ-ভাই, তাকে রক্ষা করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং এর বদলে তারা নানা সুবিধা। ভোগ করবে। তার স্বামীও বিপুল সম্মানের অধিকারী হবে। বয়োজ্যোষ্ঠ অমাত্য আর সেনাপতিরা নিজেদের জন্য কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক পদ লাভে যতটা আগ্রহী ঠিক একই ভাবে তারা নিজেদের স্ত্রীর জন্য এই অবস্থানটা দারুণভাবে কামনা করেন। ব্যাপারটা যদি ঠিকমতো সমাধান করা না যায় তবে এই পরিস্থিতি থেকে হিংসা আর ঈর্ষার স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে পারে।
হামিদা, আমাদের অবশ্যই একটা বিষয়ে একমত হতে হবে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, আমার সেনাপতিদের পুরস্কৃত করার জন্য আমার সামনে খুব সামান্য সুযোগই আছে কিন্তু একটা জিনিষ আমি তাঁদের অনায়াসে দিতে পারি। তৈমূরীয় রীতি অনুসারে, আকবরের জন্য আমাদের অবশ্যই একজন দুধ-মা নির্বাচিত করতে হবে, তিনি এমন একজন মহিলা হবেন যিনি এই দায়িত্বের উপযুক্ত এবং যাকে আমরা বিশ্বাস করতে পারবো কিন্তু একই সাথে তাকে এমন একজন মহিলা হতে হবে যার স্বামী কৃপা লাভের উপযুক্ত এবং আমাদের পছন্দের কারণে নিজেকে যে সম্মানিত মনে করবে।
হামিদা মাথা তুলে এবং তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। রাজপরিবারের একজন সদস্য হিসাবে অবশ্যই সে বড় হয়নি। পুরাতন রাজকীয় রীতির সবকিছু তার পক্ষে জানা সম্ভব না। সম্ভ্রান্তমহিলারা যদিও প্রায়শই তাদের সন্তানদের স্তন্যদানের জন্য আয়া নিয়োগ করে থাকেন, তারা কেবলই পরিচারিকা যাদের অনায়াসে বরখাস্ত করা যায় এবং সন্তানদের জীবনে তাদের কোনো প্রভাবই পরিলক্ষিত হয় না। হামিদার কাছে হুমায়ুন একেবারেই ভিন্ন একটা কিছু অনুরোধ করেছে- আরেকজন মহিলার সাথে নিজের সন্তানকে ভাগ করে নেয়া।
হামিদা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে তারপরে সে কথা বলতে শুরু করে। আপনার এতোটা উদ্বিগ্ন হবার কোনো কারণ নেই। এই রীতির বিষয়ে আমি অনেক আগে থেকে অবহিত আছি- খানজাদা আমাকে বলেছিলেন। আমার মনে হয় তিনি আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন, কেবল সন্তান জন্ম দেয়াই না বরং একজন ভবিষ্যত সম্রাটের মাতা হিসাবেও তিনি আমাকে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। প্রথমদিকে আমি ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু খানজাদা মারা যাবার পরে আমি তার কথাগুলো সম্বন্ধে কেবলই ভেবেছি- যে একজন উপযুক্ত দুধ-মা নির্বাচিত করে আমি আমার সন্তানকে তার হাতে তুলে দিচ্ছি না বরং তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করছি। বিষয়টা যদিও আমায় এখনও বিষণ্ণ করে তুলে, তারপরেও আমি জানি তিনি ঠিক কথাই বলেছিলেন… আমাদের বোধহয় প্রয়োগপ্রবণ হওয়া উচিত। আমরা কাকে নির্বাচিত করবো? আমাদের সাথে এখন গুটিকয়েক রমণী রয়েছে আর তাঁদের ভিতরে আরও কম সংখ্যকের শিশুসন্তান রয়েছে।
জাহিদ বেগের স্ত্রীর অনেক বয়স তাঁর স্তন শুষ্ক হতে বাধ্য নতুবা আমি তার সাহসিকতা আর আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসাবে তাকেই নির্বাচিত করতাম। কিন্তু আরো একজন সেনাপতি রয়েছে যাকে আমি পুরস্কৃত করতে চাই- নাদিম খাজা, কান্দাহারের নিকটবর্তী স্থান থেকে আগত এক গোত্রপতি যাঁর স্ত্রী তার সাথেই রয়েছে। মারওয়ার থেকে আমরা পালিয়ে আসবার কিছুদিন পরেই তার একটা পুত্র সন্তান হয়েছে।
অবশ্যই, আমি চিনি তাকে। মাহাম আগা নামে দীর্ঘদেহী, আর সুদর্শন এক রমণী। তার ছেলের নাম আদম খান।
মাহাম আগাকে তুমি মেনে নেবে? তোমার যদি অন্য কাউকে পছন্দ…
আমি সন্তুষ্ট। মাহাম স্বাস্থ্যবান এবং শক্তিশালী আর সেই সাথে সৎ এবং কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন। তার ছেলেটাও হয়েছে প্রাণবন্ত আর শক্তপোক্ত। আমি যদি কাউকে পছন্দ করি তবে তাকেই করবো। আকবরকে এক স্তন থেকে পরম মমতায় সরিয়ে এনে হামিদা তাকে আরেক স্তনের দিকে নিয়ে আসে। হুমায়ুন ভাবে সন্তান জন্মদানের সময়ে কষ্ট সহিষ্ণুতার পরীক্ষা বা সাম্প্রতিক সময়ের দুর্ভোগ সত্ত্বেও হামিদা এখনও দেখতে কত সুন্দর। এবং এখনও যদিও তাঁর বয়স অল্প, হুমায়ুনের নিজের চেয়ে প্রায় বিশ বছরের ছোট কিন্তু তারপরেও কত শক্ত। আকবরকে আরেকজন রমণীর বাহুতে কল্পনা করাটা তাঁর জন্য নিশ্চয়ই খুব কঠিন কিন্তু তারপরেও একজন যোদ্ধার মতো সাহসিকতার সাথে নিজের ভয় লুকিয়ে রাখার মতো ঠিক একইভাবে সে তার কষ্ট গোপন করেছে। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে হুমায়ুন তাকে পছন্দ করেছিল কিন্তু এই মাটির দেয়াল দেয়া, প্রত্যন্ত মরুদ্যানে নিজের বাড়ি আর তার নিরাপত্তা থেকে অনেক দূরে এখানেও তার মাঝে একজন সম্রাজ্ঞীর সব লক্ষণই বিদ্যমান। নীচু ডিভানটার দিকে এগিয়ে গিয়ে, সে ঝুঁকে এবং হামিদার ওষ্ঠে চুমু দেয় আর তারপরে স্বীয় পুত্রের মাথায় দবদব করতে থাকা কোমল তুলতুলে শীর্ষদেশে চুম্বন করে।
