হুমায়ুন আপনার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে, বলিষ্ঠ এবং স্বাস্থ্যবান আর ইতিমধ্যেই চিৎকার করে আকাশ মাথায় করেছে। ধাত্রী তাকে পরিষ্কার করা মাত্র কয়েক মিনিটের ভিতরে আপনার কাছে তাকে নিয়ে আসবে।
আর হামিদা?
তার জন্য প্রসব-বেদনা একটা কষ্টকর অভিজ্ঞতা ছিল। ধাত্রীর সমস্ত দক্ষতা তার প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু তিনি ভালোই আছেন এবং এখন ঘুমাচ্ছেন।
আনন্দ আর স্বস্তির একটা যুগপৎ ধারায় সিক্ত হয়ে, হুমায়ুন কিছুক্ষণের জন্য মাথা নীচু করে চুপ করে থাকে। তারপরে তাঁর পরণের আলখাল্লার জেব থেকে সে মূল্যবান কস্তরীর একটা আধার বের করে যা ঠিক এই মুহূর্তের জন্য সে আগলে রেখেছিল এবং থলেটা সে গুলবদনের হাতে দেয়। এটা আতুরঘরে নিয়ে যাও। আমার সন্তানের জন্ম উদযাপনের অভিপ্রায়ে এটা সেখানে ভাঙবে এবং পুরো কামরায় যেন এর সৌরভ ছড়িয়ে পড়তে দেবে- এই পৃথিবীতে আমার সন্তানের প্রথম যে ঘ্রাণ গ্রহণ করবে এটাই হোক তার অন্যতম বস্তু। হামিদাকে বলবে যে এই মুহূর্তে যদিও এরচেয়ে বেশী কিছু তাঁকে দেবার সামর্থ্য আমার নেই তবুও এটা কেবল আমার ভালোবাসার স্মারকই না সেই সাথে এটা আমাদের বংশের ভাবী মহত্বের সৌরভ।
২.৯ আকবর
১৪. আকবর
আমি তোমার নাম রাখলাম আকবর- যার মানে মহান এবং মহান তুমি হবেই। হুমায়ুন কথা বলার মাঝেই দুর্লভ ঘিয়ে রঙের জেড পাথরের একটা পেয়ালা তুলে নেয়- অমরকোটের রানার তরফ থেকে প্রেরিত উপহার এবং আকবরের মাথায় পাত্রে রক্ষিত অনুষঙ্গগুলো, শাহরুখি- ছোট ছোট সোনার মোহর- পরম মমতায় বর্ষিত করে, সদ্যোজাত সন্তানের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির স্মারক হিসাবে। কাশিমের কোলের উপরে একটা মখমলের তাকিয়ায় দিগম্বর অবস্থায় শায়িত আকবর এহেন উৎপাতে চমকে গিয়ে হাত পা আন্দোলিত করে কিন্তু কাঁদে না। হুমায়ুন তাকে পরম মমতায় তাকিয়া থেকে তুলে নিয়ে দুহাতে শূন্যে উঁচু করে ধরে যাতে করে সমবেত হওয়া তার সব সেনাপতি আকবরকে দেখতে পায় এবং বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠে, মহান তৈমূরের অধস্তন সপ্তম পুরুষ, আমার সন্তানকে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাদের সামনে উপস্থাপন করছি। আমার প্রতি তোমরা যেমন বিশ্বস্ত ছিলে তাঁর প্রতিও ঠিক তেমনই বিশ্বস্ত থাকবে। তৈমূরের রক্তের উত্তরাধিকারী নতুন যুবরাজের উদ্দেশ্যে হুমায়ুনের সেনাপতিরা সবাই নিজেদের ঢালের উপরে নিজ নিজ তরবারি ঠুকে উদাত্তস্বরে ঐতিহ্যবাহী সম্ভাষণ জ্ঞাপন করতে থাকে, মির্জা আকবর! মির্জা আকবর! হুমায়ুন হাত তুলে যতক্ষণ না তাদের শান্ত হতে ইঙ্গিত করে।
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে এবার হামিদার অংশ গ্রহণের সময় হয়েছে। একটা নীচু ডিভানে ঠেস দিয়ে শায়িত অবস্থায় তাকে এখনও পরিশ্রান্ত দেখায়- ত্বক গজদন্তের ন্যায় ফ্যাকাশে এবং তাঁর কালো উজ্জ্বল চোখের নীচে গাঢ় কালি পড়েছে। হুমায়ুন যদিও তাকে সুস্থ হয়ে উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছিল, হামিদাই বরং তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। আপনার জন্য আপনার লোকেরা অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছে। যত শীঘ্রি সম্ভব আপনার উত্তরাধিকারীকে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত করা তাদের প্রতি আপনার কর্তব্য। এটা আপনাকে তাদের সাথে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করবে। হুমায়ুন অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকা আকবরকে হামিদার কাছে নিয়ে যায় এবং তাঁর বাহুর নিরাপত্তায় তাঁকে সমর্পণ করে। নিজের সদ্যোজাত সন্তানকে স্তন্যপান করাবার ভান করে সে সেই শব্দগুলো উচ্চারণ যা তৈমূরের সময়ের পূর্বে থেকে মহাসাগরবৎ শাসক স্বয়ং চেঙ্গিস খানের সময়কাল থেকে মোগলদের সময়কাল পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে: পুত্র আমার পান করো। তোমার মধুর ওষ্ঠদ্বয় আমার মঙ্গলময়ী স্তনে আরোপ করো এবং জীবনদায়ী সুধায় তোমার মুখে মাধুর্য আনয়ন করো।
আকবর যখন আবিষ্কার করে যে আসলে এখনই তাকে স্তন্যদানের কোনো অভিপ্রায় তাঁর মমতাময়ী মায়ের নেই সে গলার স্বর সপ্তমে তুলে চিৎকার শুরু করে। হামিদা যখন তাঁকে শান্ত করতে চেষ্টা করছে, তখন হুমায়ুন আরো একবার নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলে। আমার জ্যোতিষী শারাফের সহায়তায় আমি আমার সন্তানের কোষ্ঠী বিচার করেছি। তার জন্ম তারিখের চেয়ে ১৫ অক্টোবর, ১৫৪২, চন্দ্রের প্রভাবযুক্ত সিংহ জাতক- মাঙ্গলিক আর কিছুই হতে পারে না। এই দিনে জন্মগ্রহণকারী সন্তান সৌভাগ্যবান আর দীর্ঘ জীবনের অধিকারী। আমরা অনেক বিপর্যয় আর কষ্ট সহ্য করেছি। ন্যায়সঙ্গত যা আমাদের সেটা আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারার আগে সম্ভবত আরো অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় আমাদের অতিক্রম করতে হতে পারে কিন্তু একটা মহিমান্বিত ভবিষ্যত আকবর আর আমাদের দিকে হাতছানি দিচ্ছে। আজ রাতে অর্জিত হয়নি এমন অনেক বিজয় আমরা উদযাপন করবো এবং তাঁর স্মরণে ভোজে অংশগ্রহণ করবো। তার লোকেরা আরও একবার নিজেদের আয়ুধ ঠুকে সম্মতি জানায়। তাঁদের এবারের পুনরাবৃত্ত শব্দগুচ্ছ ছিল মির্জা হুমায়ুন কিন্তু সে আর একটা কথাও না বলে ঘুরে দাঁড়ায়, আর কোনো বাক্য বলার জন্য তার হৃদয় বড্ড বেশী বেদনাবিধূর।
সেদিন পরবর্তী কোনো এক সময়ে, তারা যখন পুনরায় একাকী হয়, হুমায়ুন দেখে হামিদা তার আলখাল্লার গলা নিচে নামিয়ে এনে আকবরকে স্তন্য দান করে, খুদে শাহজাদা যখন প্রাণপনে নিজের উদরপূর্তি করছে তখন সে তার মাথার কোঁকড়া কালো চুলের দিকে পরম মমতায় তাকিয়ে থাকে। সে এখন এক পুত্র সন্তানের পিতা এই বোধটাই তার ভিতরে অবর্ণনীয় একটা গর্বের জন্ম দেয়। হামিদার পূর্বের দিনগুলোতে, সে যত দূর জানে তার কোনো উপপত্নী তার কোনো সন্তান গর্ভে ধারণ করেনি। এখন, চৌত্রিশ বছরের বৃদ্ধ জীবনে, সে উপলব্ধি করছে একটা পুত্র সন্তান তাঁর জীবনের গূঢ়তর উদ্দেশ্যের প্রতি তাঁর ব্যগ্রতাকে কিভাবে পরিতৃপ্ত করতে পারে।
