জওহর, চকরাবকরা রঙের ছোটখাট দেখতে একটা মাদী ঘোড়া বেছে নিয়ে, যার পায়ে তখনও সামান্য হলেও দৌড়াবার মতো শক্তি রয়েছে, ক্রমশ ঘনায়মান অন্ধকারের মাঝে যাত্রা করে। হুমায়ুন তড়িঘড়ি হামিদার কাছে ফিরে আসতে তার চারপাশে মেয়েদের একটা ছোটখাট জটলা দেখতে পায়, যারা তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখে দুপাশে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়। হামিদা চোখ বন্ধ করে, মাটিতে পিঠ দিয়ে শুয়ে রয়েছে এবং ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। ঘামে তার মুখটা চকচক করছে।
সুলতান, বেগম সাহেবার গর্ভমোচন শুরু হয়েছে, জয়নাব বলে। আমি জানি আমার বোনদের আমি অনেকবার সন্তান জন্ম দিতে দেখেছি। এবং তাঁর ব্যাথা ক্রমশ আরও ঘন ঘন উঠছে…আমাদের হাতে বেশী সময় নেই… জয়নাবের কথার গুরুত্ব বোঝাতেই যেন হামিদা ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠে এবং তাঁর চোখের পাতার নীচে থেকে অশ্রু ভেসে উঠে, তাঁর মুখের ঘামের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, যা এখন স্রোতের মতো তাঁর দেহ থেকে নির্গত হচ্ছে। আরেকদফা খিচুনী তাকে যন্ত্রণাদগ্ধ করতে, সে ধনুকের মতো পিছনের দিকে বেঁকে যায় তারপরে হাঁটু মুড়ে বুকের কাছে তুলে এনে একপাশে কাত হয়ে যায়।
হুমায়ুনের পক্ষে তাকিয়ে থেকে এ দৃশ্য দেখা অসম্ভব। সময় গড়িয়ে যাবার সাথে সাথে হামিদার আর্তনাদের মাত্রা জোরাল আর দ্রুততর হতে থাকলে, সে অসহায় ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকে আর কিছুক্ষণ পর পর হামিদার শিয়রের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে গিয়ে পুনরায় পায়চারি করতে থাকে। রাতের নিজস্ব শব্দ- শিয়ালের ডাক, ময়ুরের কর্কশ কণ্ঠের চিৎকারের আকস্মিকতা- তার নিজের অসহায়তার বোধকে আরও বাড়িয়ে দেয়। জওহর কোথায়? তার নিজেরই হয়তো যাওয়া উচিত ছিল- বা তার পরিচয়ের প্রমাণ হিসাবে জওহরের সাথে তৈমূরের অঙ্গুরীয়টা পাঠাতে পারতো…
হামিদা আরেক দফা ব্যাথায় চাপা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলে ব্যাথাটা যেন সে নিজেও অনুভব করছে এমন ভঙ্গিতে হুমায়ুন কুঁচকে যায়। একটা ঝোপের নীচে, এই বিরান, উদ্ধৃঙ্খল পরিবেশে হামিদাকে যে সন্তানের জন্ম দিতে হচ্ছে…
সুলতান, হুমায়ুন তাঁর নিজের ব্যক্তিগত মর্মবেদনায় এতোটাই বিভোর হয়েছিল যে, একটা ছোট অশ্বারোহী দলকে পথ দেখিয়ে অন্ধকারের ভিতর থেকে জওহরকে এগিয়ে আসতে সে দেখেনি বা শব্দও শোনেনি, দলটার সাথে কয়েকটা অতিরিক্ত ঘোড়া রয়েছে, তার মধ্যে দুটো ঘোড়ার মাঝে স্ট্রেচারেরমতো একটা কাঠামো ঝুলছে।
সুলতান, জওহর পুনরায় তাকে সম্বোধন করে। অমরকোটের শাসক আপনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আপনাকে, বেগমসাহেবাকে আর আপনার ব্যক্তিগত সফরসঙ্গীদের তাঁর বাসস্থানে নিয়ে যাবার জন্য একদল সৈন্য আর একজন হাকিম আর ধাত্রীও পাঠিয়ে দিয়েছেন।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হুমায়ুন মাথা নাড়ে।
হুমায়ুন এবং ছয়জন দেহরক্ষী সমেত তার ছোট দলটা, জাহিদ বেগের উপরে অবশিষ্ট সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব অর্পন করে, যখন রওয়ানা দেয় অমরকোটের মাটির কাঁচা দেয়াল চাঁদের ধুসর আলোয় রূপালি রং ধারণ করেছে। জওহরের নিয়ে আসা ধাত্রী হামিদাকে ইতিমধ্যে একটা ঔষধি উপাচার দিয়েছে- যা মনে হয় তার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করেছে।
মশালের আলোয় হুমায়ুনের জন্য তাঁর পারিপার্শ্বিকতা অনুধাবন করাটা বেশ কঠিন হয় এবং সৈন্যরা ঘোড়ার পিঠ থেকে হামিদাকে বহনকারী স্ট্রেচারটা আলতো করে খুলে নিয়ে, একটা বেশ বড় ভবনের চৌকাঠের নীচে দিয়ে, দেয়াল থেকে ঝুলন্ত মশালদানিতে রক্ষিত জ্বলন্ত মশালের আলোয় যার দুপাশ আলোকিত, সেটা বহন করে ভেতরে প্রবেশ করলে, তাঁর দৃষ্টি সবকিছু বাদ দিয়ে সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে। হামিদাকে বহনকারী স্ট্রেচারটা অনুসরণ করে সে একটা করিডোরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, যার শেষ প্রান্তে সে কাঠের কারুকাজ করা দরজার একজোড়া পাল্লা দেখতে পায়, যার সামনে পরিচারিকার দল অপেক্ষা করে রয়েছে। স্ট্রেচার বহনকারী দলটা দরজার নিকটবর্তী হতে তারা দরজার পাল্লা খুলে দেয়। হামিদাকে সাথে নিয়ে হেকিম এবং তাঁদের পেছন পেছন ধাত্রী মেয়েটা ভেতরে প্রবেশ করে। হুমায়ুনও তাঁদের অনুসরণ করে ভেতরে প্রবেশ করতে যাবে- এমন সময় গাঢ় সবুজ রঙের আলখাল্লা পরিহিত একজন লোক সে তাঁকে আগে লক্ষ্য করেনি সামনে এগিয়ে আসে এবং কুর্নিশ করে।
মহামান্য সুলতান, আমি অমরকোটের রানার উজির, আপনাকে স্বাগত জানাবার জন্য তিনি যাকে প্রেরণ করেছেন। এটা জেনানা মহলে প্রবেশের পথ। রানা ব্যতীত কেবল একজনের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে তিনি হলেন আমাদের হাকিমসাহেব। কিন্তু আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না আপনার আবাসনকক্ষের বন্দোবস্ত পাশেই করা হয়েছে এবং কোনো সংবাদ থাকলে সেটা সাথে সাথে আপনাকে জানানো হবে।
হুমায়ুন ভাবে, এই পরিস্থিতিতে রাজি হওয়া ছাড়া তার আর কিইবা করার আছে এবং সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সেই রাতে ঘন্টার কাঁটা যেন সহসাই মন্থর হয়ে পড়ে বা তার কাছে সেরকমই মনে হয়। গবাক্ষের ভিতর দিয়ে পূর্বাকাশে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে দেখে- ভোর হবার ঠিক আগে আগে সে বোধহয় হাল্কা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। কাঁধের উপরে সে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতে, সাথে সাথে সে সজাগ হয়ে উঠে এবং সহজাত প্রবৃত্তির বশে নিজের খঞ্জর আকড়ে ধরে, তখন তাঁর খেয়াল হয় যে অনেক আগেই সকাল হয়েছে আর তাঁকে ঘুম থেকে আর কেউ না গুলবদন উঠিয়েছে। সে এমনভাবে হাসছে যেভাবে হাসতে হুমায়ুন তাকে বহুদিন দেখেনি।
