*
হুমায়ুনের ক্লান্ত অবসন্ন সৈন্যবাহনীর সামনে অবশেষে রৌদ্রদগ্ধ দশটা দীর্ঘ দিনের শেষে অমরকোটের দেয়াল দিগন্তের কাছে ভেসে উঠে। জাহিদ বেগ আর কাশিমকে, স্বস্তির দৃষ্টি বিনিময় করতে দেখে সে। সেই ভয়ঙ্কর ঝড়ে হুমায়ুনের দশজন লোক মৃত্যুবরণ করেছিল- ঘূর্ণিঝড়ের তোড়ে বলদে টানা মালবাহী শকটের একটা গুঁড়িয়ে গেলে সেখান থেকে উড়ে আসা কাঠের টুকরো দুজনকে ঘায়েল করেছিল। জওহরের মতো, অনেকেরই দেহের ত্বকে মারাত্মক আঁচড় লেগেছিল এবং কেটে গিয়েছিল, অনেকেরই অস্থিভঙ্গ হয়েছিল আর গাদাবন্দুক সজ্জিত তাঁর সেরা তরকিদের একজন ধারাল পাথরের টুকরোর আঘাতে একচোখের দৃষ্টি হারিয়েছে।
এতো বিপুল সংখ্যক ঘোড়া হয় মারা গিয়েছে বা ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে যে বেশীর ভাগ লোককেই পায়ে হেঁটে চলতে হচ্ছে, তাদের ভিতরে হুমায়ুনও রয়েছে। তাদের বেশীরভাগ সাজসরঞ্জাম যার ভিতরে অসংখ্য গাদাবন্দুকও রয়েছে, হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে বা বালির নীচে চাপা পড়েছে। সরঞ্জামাদি যদি ধ্বংসপ্রাপ্ত নাও হতো, মালবাহী শকট ছাড়া এবং গুটিকয়েক ভারবাহী প্রাণী অবশিষ্ট থাকায়- দশটা খচ্চর আর ছয়টা উট- তারা বেশীর ভাগই পথিমধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে আসতে বাধ্য হতো। তাদের সাথে যে কয়টা ভারবাহী জন্তু অবশিষ্ট ছিল সেগুলোর পিঠেই তারা যতটা সম্ভব মালপত্র তুলে দিয়েছে। হুমায়ুনের সিন্দুকগুলোর ভিতরে একটাই অক্ষত অবস্থায় ছিল কিন্তু এখন সেটাও খালি করে তার ভিতরে যা কিছু ছিল সব ঘোড়ার পিঠের দুদিকে ঝোলান থলেতে ভরা হয়েছে। হুমায়ুনের গলায় একটা ঝুলন্ত থলেতে কোহ-ই-নূর এখনও নিরাপদেই রয়েছে।
একটা কুৎসিত দর্শন উটের পাশে হুমায়ুন অবসন্ন ভঙ্গিতে পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে জটা, আবার তার চওড়া, চ্যাপটা আর উপরের দিকে উল্টানো পায়ে সামনে এগোবার সময় জান্তব আর্তনাদ করে আর বালিতে দুর্গন্ধযুক্ত শ্লেষ্মর দলা। নিক্ষেপ করে। তার সম্রাজ্ঞীর জন্য মোটেই মানানসই বাহন বলা যাবে না, হামিদার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, সে অবশিষ্ট উটের একটার অস্থিসার পার্শ্বদেশ থেকে ঝুলন্ত ঝুরিতে ভ্রমণ করছে, উটটার অপর পাশে আরেকটা ঝুরিতে অবস্থানরত গুলবদনকে দিয়ে দুপাশের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। হামিদা চোখ বন্ধ করে রয়েছে এবং তাকে দেখে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হয়। হুমায়ুন ভাবে ভাগ্য সহায় থাকলে রাত নামার আগেই তারা অমরকো পৌঁছে যাবে, তারপরে সে হামিদার বিশ্রামের জন্য ভালো কোনো বন্দোবস্ত করতে পারবে।
কিন্তু সে যেমনটা ধারণা করেছে অমরকে নিশ্চয়ই তার চেয়ে আরও দূরে অবস্থিত। মরুভূমিতে দূরত্বের ধারণা সবসময়েই ছলনাময়ী। পশ্চিমের আকাশে রক্তের লালচে আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য যখন দিগন্তের নীচে ডুব দেয়, মরুদ্যানের নীচু সীমারেখা তখনও বেশ কয়েক মাইল দূরে বলে প্রতীয়মান হয়। রাত্রির অন্ধকার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায়, এখন অগ্রসর হওয়াটা বোধহয় অজ্ঞতার পরিচায়ক হবে। হুমায়ুন চিৎকার করে সৈন্যসারিকে যাত্রাবিরতির আদেশ দেয় এবং চারপাশে তাকিয়ে অনিলকে খোঁজে তার সাথে পরামর্শ করবে বলে, এমন সময় সে হামিদাকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠতে শুনে। তারপরে আবারও।
কি হয়েছে?
সন্তান… আমার মনে হয় সন্তান ভূমিষ্ট হবার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
হুমায়ুন, উটের পায়ে চাপড় দিয়ে ইঙ্গিত করতে জন্তুটা নাক দিয়ে ঘোঁতঘোঁত শব্দ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লে, হামিদাকে ঝুরি থেকে তুলে নিয়ে কণ্টকযুক্ত পত্রবিশিষ্ট নীচু ঝোপের একটা ঘন ঝাড়ের দিকে নিয়ে গিয়ে তাকে সেখানে আলতো করে শুইয়ে দেয়। গুলবদনও ইতিমধ্যে তাঁর ঝুরি থেকে নেমে এসেছে এবং হামিদার আরেকপাশে আসনপিড়ি হয়ে বসে, তার লালচে হয়ে উঠা মুখে টোকা দেয় আর চুলে বিলি কাঁতে থাকে।
গুলবদন হামিদার কাছে থাকো। আমি জয়নাব আর অন্য মেয়েদের তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি অমরকো থেকে সাহায্যের জন্য কাউকে নিয়ে আসতে চেষ্টা করি।
হুমায়ুনের দলবল যেখানে যাত্রাবিরতি করেছে সেদিকে সে যখন দৌড়ে যায় তার হৃৎপিণ্ড রীতিমতো ধকধক করতে থাকে। সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে রক্তাক্ত যুদ্ধের সময়ও এমন ভয়ের সাথে সে কখনও পরিচিত ছিল না। সন্তান ভূমিষ্ট হবার সময় এখনও হয়নি। হামিদা নিশ্চিত ছিল যে এখনও একমাস বাকি আছে… হিসাবে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, এই বিরূপ বিরানপ্রান্তর যা ইতিমধ্যে খানজাদার মৃত্যুর কারণ হয়েছে যদি হামিদাও এখানে মৃত্যুবরণ করে?
জওহর, সে শুনতে পাবার মতো দূরত্বে পৌঁছেই চিৎকার করে উঠে। সম্রাজ্ঞীর প্রসব-বেদনা শুরু হয়েছে। আমাদের অবশিষ্ট ঘোড়াগুলোর ভেতর থেকে সবচেয়ে সেরাটা বেছে নাও এবং তোমার পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব অমরকোটের উদ্দেশ্যে ঘোড়া হাকাও। সেখানের লোকদের কাছে আমার পরিচয় দেবে এবং এটাও বলবে যে আমার স্ত্রীর জন্য আমাদের আশ্রয় প্রার্থনা করেছি। আতিথিয়তার রীতি অনুসারে তারা আমাকে বিমুখ করতে পারবে না। আমাকে এবং আমার সৈন্যদের যদি তারা ভয়ও পায় হামিদাকে তারা নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। সেখানে অবশ্যই হাকিম এবং ধাত্রীরা রয়েছে। জলদি যাও!
