কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে কয়েক জন্মের দ্যোতনাবহ কিন্তু কয়েক পল হয়তো ততক্ষণে সময়ের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে অতিবাহিত হবার পরে সে টের পায় হামিদা নড়ে উঠেছে। তারপরে সে ভীষণভাবে কাশতে শুরু করে, বালি আর লালার কালচে কমলা রঙের মিশ্রণের থুতু ফেলে। হামিদা বেঁচে আছে আনন্দের এই বোধটা হুমায়ুনকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলে। হামিদাকে উঠে বসতে সাহায্য করার মাঝেই একটু আগে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল অবিকল সেভাবেই তাঁকে লোভী, বুভুক্ষের ন্যায় বাতাসের প্রসাদ গ্রহণ করতে শোনে।
ঘাবড়ে যাবার মতো কিছু হয়নি, সে কর্কশ কণ্ঠে বলে, সবকিছু ঠিক আছে…
হুমায়ুন টের পায় কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পরে হামিদা তাঁর হাতটা তুলে নিয়ে নিজের স্ফীত গম্বুজাকৃতি উদরে স্থাপণ করে। নিজের ভাবী সন্তানকে মাতৃগর্ভের নিরাপত্তায় জোরালভাবে লাথি মারতে দেখে তার বালিতে ঢাকা মুখে আবারও তাজা অশ্রু ঝরতে আরম্ভ করে, পার্থক্য কেবল একটাই এবার যন্ত্রণার বদলে আনন্দের অশ্রু ঝরছে।
মানুষজন আর ভারবাহী পশুর পাল ধীরে ধীরে নিজেদের ভর পায়ের উপরে আরোপ করে উঠতে আরম্ভ করে, যদিও অনেকেই অশুভ ভঙ্গিতে নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে। হুমায়ুন উঠে দাঁড়াবার ফাঁকে কাছেই বালির পুরু আবরনের নীচে একটা ঘোড়াকে দুর্বল ভাবে নড়ে উঠতে দেখে। সে টলমলো পায়ে এগিয়ে গিয়ে জন্তুটার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে এবং পরম মমতায় প্রাণীটার মুখ থেকে বালি সরাতে নিজের স্ট্যালিয়নকে চিনতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টা তাঁদের উপর দিয়ে বয়ে যাবার পূর্বের ভীতিকর শেষ মুহূর্তগুলোতে প্রাণীটার কথা সে বেমালুম বিস্মৃত হয়েছিল। জন্তুটা নিশ্চয়ই চারপায়ে দ্রুত দৌড়াতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু পেছনের দুই পা বাঁধা থাকার কারণে মাটিতে আছড়ে পড়েছে। হুমায়ুন ঘোড়াটার পায়ে খুরের উপরের আর পেছনের কেশগুচ্ছে দ্রুত হাত বুলাতে অস্থিভঙ্গের লক্ষণ টের পায়। একহাতে জন্তুটার গলায় আলতো করে হাত বুলিয়ে এবং কানের কাছে মৃদু কণ্ঠে ফিসফিস করে ঘোড়াটাকে আশ্বস্ত করার মাঝে, সে অপর হাতে কোমর থেকে খঞ্জর টেনে বের করে দ্রুত ঘোড়াটার ঘাড়ের মোটা শিরাটা কেটে দিলে, উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে তাঁকে ভিজিয়ে দেয় এবং বালিতে কালচে একটা দাগের সৃষ্টি করে।
সে চারপাশে তাকিয়ে দেখে যে জয়নাব হামিদার জন্য পানি নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে টলোমলো পায়ে আরেকজন রমণীকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মাথার চুল উস্কোখুস্কো, কাপড়ের উপরে বালির স্তর জমে আছে এবং মেয়েটা অঝোরে কাঁদছে বলে তার নোংরা মুখে কান্নার ধারা জ্বলজ্বল করছে, মেয়েটা আর কেউ না গুলবদন। হুমায়ুন নিজের বোনকে আশ্বস্ত করার জন্য তাঁকে জড়িয়ে ধরতে যায় কিন্তু সে নিজেকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে নেয়।
আমি ঠিক আছি কিন্তু খানজাদা… গুলবদন তাঁকে নিথর হয়ে পড়ে থাকা একটা দেহের কাছে নিয়ে যায় এবং হুমায়ুন চোখ নামিয়ে তাকিয়ে তাঁর ফুপিজানের বালির প্রলেপযুক্ত মুখ দেখতে পায়। ফুপিজানের দুচোখ বন্ধ এবং তার কাত থেকে থাকা মাথার ভঙ্গি দেখে- যুদ্ধক্ষেত্রে সে নিজে যেখানে অসংখ্য মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেছে- বুঝতে পারে তিনি মারা গিয়েছেন। যান্ত্রিকভাবে, সে তার গলা স্পর্শ করে কিন্তু সেখানে নাড়ীর কোনো স্পন্দন অনুভব করে না। তাঁর নাসারন্ধ্র আর মুখ দেখে বালিতে শ্বাসরোধ হয়েছিল মনে হয় এবং তার দুই হাত এমনভাবে কুচকে রয়েছে। যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর সাথে তুমুল লড়াই করেছেন- খানজাদা নিশ্চিতভাবেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন।
আমার নিজের আম্মিজান মারা যাবার পর থেকে তিনি আমার সাথে একেবারে আমার মায়ের মতো আচরণ করতেন। নিজের দেহ দিয়ে তিনি আমাকে আড়াল করে রেখেছিলেন। আমি কতটা ভয় পেয়েছি তিনি ভালো করেই জানতেন… গুলবদন ফিসফিস করে বলে।
গুলবদনকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনো শব্দ খুঁজে না পেয়ে হুমায়ুন নিরবে দাঁড়িয়ে থাকে। খানজাদা- বাবরের বিপর্যয় আর সাফল্যের সমান অংশীদার এবং সম্রাট হিসাবে তাঁকে প্রথমদিকে যিনি পথ দেখিয়েছেন, আফিমের নেশার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আর নিজের নিয়তির মুখোমুখি হতে বাধ্য করেছেন যিনি সেই মহিলা- আর বেঁচে নেই। সারা জীবনে কতকিছু দেখা আর সহ্য করার পরে, খোলা প্রান্তরে বালিঝড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাঁর এভাবে মৃত্যুবরণ করাটা যেন কেমন ভয়ঙ্কর আর নিষ্ঠুর বলে মনে হয়। তাঁদের রাজবংশের প্রতি তাঁর নিঃশঙ্ক আত্মনিয়োজন এবং তাঁর প্রতি খানজাদার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কিংবা তাঁর সাহসিকতার কথা সে কখনও ভুলবে না। একটা সর্বগ্রাসী বিষণ্ণতা, কিছুক্ষণ পূর্বের আনন্দকে আচ্ছন্ন করে, তাকে আপুত করে ফেলে। কাবুলের উপকণ্ঠে পাহাড়ের পাদদেশে তার ভাই সম্রাট বাবরের সমাধির পাশে বা আগ্রায় যমুনার তীরে কোনো পুষ্পবীথি শোভিত উদ্যান খানজাদার অন্তিম সমাধিস্থল হবার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সম্ভব না। হুমায়ুন ঝুঁকে গিয়ে তার ফুপিজানের দেহটা তুলে নিয়ে পরম মমতায় তাঁকে নিজের বাহুতে আকড়ে ধরে আপন মনে কথা বলতে থাকে। স্থানটা যদিও মনুষ্যবর্জিত আর বিরান একটা এলাকা, তাঁকে আমাদের এখানেই সমাধিস্থ করতে হবে। তাঁর কবর আমি নিজে খুড়বো।
