হুমায়ুনের কথা শেষ হবার আগেই সে দেখে বয়স হওয়া সত্ত্বেও খানজাদা নিজের গরুর গাড়ির ভেতর থেকে সবার আগে বের হয়ে এসেছে এবং ঝুঁকে পড়ে খালি হাতেই বালিতে গর্ত করতে আরম্ভ করেছে। গুলবদন তার পাশেই রয়েছে। ফুপিজান, ঝড় আমাদের উপর দিয়ে বয়ে যাবার সময় আপনি আর গুলবদন ঝড়ের দিকে পিঠ করে অবশ্যই একসাথে মাটিতে শুয়ে থাকবেন এবং শক্ত করে পরস্পরকে আকড়ে রাখবেন, আমার কথা বোঝা গেছে?
খানজাদা গর্ত করা বন্ধ না করেই মাথা নাড়ে কিন্তু তার সৎ-বোনকে পাংশুটে দেখায় এবং হুমায়ুন দেখে বেচারী থরথর করে কাঁপছে। গর্ত খোড়ো! খানজাদা চিৎকার করে তাঁকে আদেশ দেয়।
হুমায়ুন তার চারপাশে তাকিয়ে উন্মত্তের ন্যায় বালিতে গর্ত করতে ব্যস্ত অবয়ব দেখতে পায়, সে তার ঘোড়ার পেছনের দুপা বাঁধে তারপরে হামিদাকে গরুর গাড়ি থেকে কোলে তুলে নিয়ে কয়েক পা সামনে এগিয়ে যায়, যেখানের বালি দেখে নরম আর গর্ত করা সহজ হবে বলে মনে হয়।
আমিও সাহায্য করতে চাই… আসন্নপ্রসবা হামিদা নিজের বিশাল অবয়ব নিয়েও তাঁর পাশে হাটু মুড়ে বসে এবং নখ দিয়ে বালিতে গর্ত করতে শুরু করে। তারা উন্মত্তভাবে কাজ করে, খালি হাতে তাঁদের পক্ষে যতটা সম্ভব একটা স্থানে তাঁরা গর্ত করে। অচিরেই হামিদার নখ ভেঙে রক্তপাত শুরু হয়। হুমায়ুন ঘাড়ের উপর দিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে ঝড় আরও এগিয়ে এসেছে আর ঝড়ের সাথে উড়তে থাকা আবর্জনায় আকাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। চারপাশের বাতাসে একটা জান্তব গর্জন ভাসতে থাকে এবং সে যদিও হামিদাকে কিছু বলতে দেখে কিন্তু সে তার একটা বর্ণও শুনতে পায় না। সে ক্ষিপ্রভাবে নিজের প্রয়াস আরও জোরদার করে এবং শীঘ্রই বালি আর বাতাসের যুগলবন্দি তাঁদের আচ্ছন্ন করলে, হামিদাকে জড়িয়ে ধরে তাদের খোঁড়া গর্তে তাঁকে নিজের দেহ দিয়ে ঢেকে শুইয়ে দেয়। নিজের দেহ দিয়ে তাঁকে আড়াল করার প্রয়াসে হুমায়ুন তাঁকে দুবাহু দিয়ে জড়িয়ে শক্ত করে নিজের সাথে আটকে রাখলে হামিদার মুখ তার বুকে ঘষা খায়।
হুমায়ুন হামিদাকে প্রাণপনে আকড়ে থাকে কিন্তু তারপরেও যেন সে তার বাহুর বেষ্টনী থেকে ছিটকে যেতে চায়, চামড়া ছাড়ানোর একটা অনুভূতি তার মুখে এবং তার করোটি থেকে কেউ যেন চুলগুলো উপড়ে ফেলতে চাইছে। তাঁর নাসারন্ধ্র আর মুখ বালিতে ভরে যায় এবং সে শ্বাস নেয়ার জন্য হাঁসফাঁস করলে গরম বাতাস বুকে প্রবেশ করায় তাঁর ফুসফুস বুঝি এখনই বিদীর্ণ হবে মনে হয়। তাঁর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে এবং নিজের জীবন বাঁচাতে প্রাণান্ত প্রয়াসের মাঝে সে টের পায় হামিদাকে আকড়ে ধরা আলিঙ্গন শিথীল হয়ে আসছে।
দেহের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে সে নিজেকে বাধ্য করে তাঁকে শক্ত করে আকড়ে রাখতে। হামিদা আর তার গর্ভের সন্তানের বেঁচে থাকাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ুন এখন তাঁর আব্বাজানের অনুভূতি বেশ বুঝতে পারে যখন হুমায়ুন মৃত্যু পথযাত্রী বিশ্বাস করে তিনি আগ্রা দূর্গের মসজিদে গিয়ে নিজের প্রিয়তম সন্তানের জীবনের বদলা হিসাবে আল্লাহর কাছে নিজের প্রাণ উৎসর্গ। করেছিলেন। সে মনে মনে দোয়া করে হামিদা যেন বেঁচে থাকে এবং তাঁদের সন্তান যেন সালামত থাকে। তোমার যদি সেটাই অভিপ্রায় হয়ে থাকে তবে তাদের বখশ দিয়ে আমার জীবন গ্রহণ করো…
সে কায়মনো বাক্যে দোয়া করার মাঝেই টের পায় যে ধূলো আর হুড়দঙ্গলের মাত্রা কমছে। সে অবশেষে শ্বাস নিতে সক্ষম হলে তার নির্যাতিত ফুসফুস পুনরায় প্রসারিত হতে পেরেছে সে অনুভব করে। প্রতিবার শ্বাস নেবার সময় যন্ত্রণা হুল ফোঁটায়- ঠোঁট, মুখ গহ্বর, গলা, শ্বাসনালীতে কেমন দগদগে অনুভূতি এবং তার নাসারন্ধ্র এখনও বালিতে কিচকিচ করছে। তার চোখের অবস্থাও তথৈবচ, চোখের পাতার নীচে বালি ঢুকেছে এবং তাঁর মনে হয় কেউ বুঝি তাতানো লাল সুঁই দিয়ে চোখের মণিতে খোঁচা দিচ্ছে। সে চোখ খুলে রাখতে চেষ্টা করে এবং ঝরঝর করে ঝরতে থাকা অশ্রুর কারণে ঝাপসা হয়ে উঠা দৃষ্টি দিয়ে হামিদার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং একটা সময় সে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে।
সে টের পায় যে হামিদা তাঁর আলিঙ্গনের মাঝে একদম নিথর হয়ে শুয়ে আছে। পালকের মতো নরম বিভঙ্গে তাঁকে আলিঙ্গন মুক্ত করে হুমায়ুন আধ-শোয়া একটা ভঙ্গিতে নিজেকে উঁচু করে। প্রিয়তমা… সে কিছু বলতে চেষ্টা করে কিন্তু কোনো শব্দ খুঁজে পায় না। হামিদা, সে অবশেষে কথা খুঁজে পায় এবং সামনের দিকে ঝুঁকে এসে তাকেও তুলতে চেষ্টা করে। হামিদার কাঁধের অবস্থান খুঁজে পেতে, হুমায়ুনের দুই হাত তার গলার দিকে ধেয়ে যায় দুহাতের তালুতে তাঁর প্রেমময় মুখ স্পর্শ করার বাসনায়। হামিদাকে ভীষণ নিস্তেজ মনে হয়। অনেকটা যেন হাত দিয়ে মৃত পাখি ধরার একটা অনুভূতি….
হুমায়ুনের চারপাশ থেকে রুদ্ধশ্বাস গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করে কিন্তু এই মুহূর্তে হামিদা ছাড়া আর কারও বিষয়ে সে ভাবিত নয়। পরম মমতায় সে আরো একবার হামিদার মুখটা নিজের বুকের কাছে টেনে এনে তার নোংরা জট লাগা চুলে বিলি কাঁতে থাকে অথচ একটা সময় ছিল যখন এই চুলে সূর্য মুখ লুকাত। সে যেন একটা শিশুকে ধরে রয়েছে- এমন ভঙ্গিতে হুমায়ুন সামনে পিছনে দুলতে আরম্ভ করে। দুলুনিটা তাঁকে খানিকটা হলেও স্বস্তি দেয়, এই পৃথিবীতে সে যাকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে সেই মানুষটাকে হারাবার শোক স্বীকার করে নেবার সময়টাকে বিলম্বিত করে।
