দ্রুত ধাবমান ঘোড়ার খুরের শব্দে কথার খেই হারিয়ে ফেলে হুমায়ুন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে চরতে থাকা মুরগীর পালে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ধূলোর মেঘ উড়িয়ে আহমেদ খানের বাহন তাঁদের অস্থায়ী ছাউনিতে প্রবেশ করছে।
সুলতান, আমরা যাদের দেখেছি তারা জয়সলমিরের রাজার অনুগত বাহিনী। মালদেবের সাথে সে নিজেকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আমি এক রাখালের কাছ থেকে খবরটা জানতে পেরেছি, যে তাদের কাছে কয়েকটা ভেড়া বিক্রি করেছে। তারা গর্বোদ্ধত ভঙ্গিতে তাকে বলেছে যে তারা একজন সম্রাটকে শিকার করতে এসেছে, যার পালাবার চিহ্ন বেশ তাজা এবং তাঁরা শীঘ্রই চূড়ান্ত আঘাত হানতে চলেছে। কিন্তু আমার মনে হয় তাদের দক্ষতার চেয়ে তাদের মুখটা একটু বেশীই চলে। আমার মনে হয় না আমরা ঠিক কোথায় অবস্থান করছি, সেটা মূর্খগুলো এখনও আবিষ্কার করতে পেরেছে…আমি তাঁদের দক্ষিণদিকে এগিয়ে যেতে দেখে এসেছি…।
সে যাই হোক, আমাদের হাতে খুব একটা বেশী সময় নেই। আহমেদ খান আমাদের অবশ্যই দ্রুত তাবু গুটিয়ে নিয়ে নদী অতিক্রম করে, সোজা পশ্চিম অভিমুখে যাত্রা শুরু করতে হবে। গ্রামের মোড়লকে ডেকে আন এবং তাঁকে বল যে মরুভূমির ভিতর দিয়ে অমরকো পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের একজন পথপ্রদর্শক প্রয়োজন। তাঁকে আরও বলবে যে আমি তাঁকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবো- তাঁকে স্বর্ণমুদ্রায় পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
গ্রামবাসীদের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে তার লোকেরা যখন দৌড়ে গিয়ে আগুন নিভিয়ে দেয় এবং তাবু গুটিয়ে নিয়ে নিজেদের অস্ত্র সংগ্রহ করে পর্যানে তুলতে শুরু করে, হুমায়ুন তখন হামিদার কাছে ফিরে আসে। হামিদা তাঁর চরকা সরিয়ে রেখেছে। গুলবদন এখন তার সাথে রয়েছে এবং তারা দুজনে কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে, কিন্তু হুমায়ুনের চোখেমুখের অভিব্যক্তি দেখে তারা উভয়েই হাসি থামিয়ে নিরবে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আহমেদ খান খবর নিয়ে এসেছে রাজপুত সৈন্যরা এখান থেকে খুব কাছেই অবস্থান করছে।
গুলবদন আঁতকে উঠে জোরে শ্বাস নেয় এবং হামিদা সহজাত প্রবৃত্তির বশে নিজের অজান্তে নিজের স্ফীত উদর স্পর্শ করে। হুমায়ুন দুহাতে তার মুখটা তুলে ধরে তার ত্বকের উষ্ণ কোমনীয়তা অনুভব করে। মাথা নীচু করে সে তার ঠোঁটে আলতো করে চুমু দেয়। সাহস রাখো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তুমি যা পারো গুছিয়ে নাও। আমরা ঘন্টাখানেকের ভিতরে রওয়ানা দেব। গুলবদন- খানজাদাকে খুঁজে বের কর এবং তাঁকে এই নতুন উপদ্রব সম্পর্কে অবহিত কর।
*
ওটা কি? দূরে দিগন্তের কাছে ঘূর্ণায়মান এবং আন্দোলিত হতে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন জিজ্ঞেস করে। নিশ্চিতভাবেই কিছুক্ষণ আগে ওটার কোনো অস্তি ত্বই ছিল না। আকাশের পটভূমিও পাল্টে গিয়েছে। কিছুক্ষণ আগেও যা ছিল উজ্জ্বল সবুজাভ-নীল সেটাই এখন ইস্পাতের ধুসরতা নিয়ে নীচে নেমে এসেছে। হুমায়ুনের ঘোড়াটা প্রলম্বিত হ্রেষাধ্বনি করে এবং অস্বস্তির সাথে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। অনিল সিম্ভুর আঠার বছর বয়সী নাতি যে তাঁদের পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করছে এবং হুমায়ুনের ঘোড়ার পাশে পাশেই হাঁটছিলো- সেও পর্যন্ত তরঙ্গের ন্যায় ফুঁসতে থাকা অবয়বটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে যা তাদের চোখের সামনেই যেন ক্রমশ বিশাল আকৃতি ধারণ করছে।
আমি যখন ছোট ছিলাম তখন মাত্র একবার আমি এটা দেখেছি। মরুভূমির পর্যটকেরা একে বালিয়াড়ির পিশাচ বলে… ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার…মারাত্মক একটা বালুঝড় যার কেন্দ্রে রয়েছে একটার বেশী ঘূর্ণিঝড়। অনিল একহাত দিয়ে চোখ ডলে যেন এমন করলে তাদের দিকে মুখ ব্যাদান করে ধেয়ে আসা ভয়ঙ্কর দৃশ্যপটটা যেন উবে যাবে। কিন্তু হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে তামাটে বর্ণের চরাচরগ্রাসী মেঘটা সূর্যকে ঢেকে দিয়ে তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছে। সহসা সে এর কেন্দ্রস্থলে ঘূর্ণিঝড়ের একটাকে দেখতে পায়। ঝড়টাকে দেখে মনে হয় সেটা যেন পৃথিবীর নাড়িভূড়ি শুষে নিয়ে উপরের দিকে ছিটিয়ে দিচ্ছে।
তাড়াতাড়ি…আমাদের কি করতে হবে বল। হুমায়ুন ঝুঁকে এসে অনিলের শীর্ণ কাঁধ ধরে ঝাঁকি দেয়।
বালিতে আমাদের দ্রুত নিজেদের আর আমাদের সাথে প্রাণীগুলোর জন্য গর্ত খুঁড়তে হবে এবং ঝড়ের দিকে পিঠ দিয়ে সেখানে শুয়ে থাকতে হবে যতক্ষণ না ঝড়টা আমাদের উপর দিয়ে অতিক্রম করে।
আমাদের হাতে কতক্ষণ সময় আছে?
কিশোর ছেলেটা আবার আগুয়ান বিপর্যয়ের দিকে তাকায়। কয়েক মিনিটের বেশী মনে হয় না…
আমার লোকদের বল বালিতে নিজেদের জন্য গর্ত খুঁড়তে এবং বাড়তি নিরাপত্তার জন্য ঘোড়াগুলোকে তারা যেন নিজেদের পেছনে টেনে বসায়, হুমায়ুন জওহর আর জাহিদ বেগকে চিৎকার করে বলে, অনিলের সাথে তাঁর কথোপকথন তাঁরা আগেই শুনতে পেয়েছে। নিজের ভীত সন্ত্রস্ত্র চঞ্চল ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে লাগাম ধরে সেটাকে টেনে নিয়ে যাবার সময় হুমায়ুন হামিদা, গুলবদন, খানজাদা এবং তাঁদের পরিচারিকাদের বহনকারী গরুর গাড়ির সাথে ধাক্কা খায়।
নিজেদের এবং জেনানাদের আশ্রয়ের জন্য বালিতে গর্ত খুঁড়ো- তারাও তোমাদের গর্ত খুঁড়তে সাহায্য করবে, হুমায়ুন চিৎকার করে দেহরক্ষীদের বলে যারা মেয়েদের প্রহরায় নিয়োজিত ছিল। দ্রুত! নিজেদের ঘোড়াগুলোকে নিজেদের পাশেই শুইয়ে রাখবে কিন্তু ষাড়গুলোর দড়ি খুলে দাও- তাঁরা নিজেদের রক্ষার উপায় খুঁজে নেবে।
