বৃহত্তর পৃথিবীর ঘটনাবলী সম্বন্ধে হুমায়ুনের অজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরো কঠিন করে তুলে। শেরশাহ বা মালদেব কিংবা তাঁর সৎ-ভাইদের অবস্থান সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। হিন্দালই বা এখন কোথায়? কামরান আর আসকারির সাথে? এবং বয়সে তারচেয়ে বড় সত্তাইয়েরা কি ইতিমধ্যে যতখানি ভূখণ্ড চুরি করে দখল করেছে তার পরিধি বাড়াতে আরও বিশাল কোনো অভিযানের পরিকল্পনা করছে। কামরানের উচ্চাভিলাসের মাত্রা সম্বন্ধে অবহিত থাকার কারণে তেমন কিছু একটা ঘটলে সে মোটেই অবাক হবে না। হুমায়ুন এক সময়ে না এক সময়ে তাঁর যে খোঁজ করবে, এটা নিশ্চয়ই তাঁর সৎ-ভাই জানে এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে তাঁর পক্ষে যতটা উদ্যোগী হওয়া সম্ভব সে হবে। অভিজ্ঞতাঋদ্ধ বৃদ্ধ কাশিম কিংবা তার ফুপিজান খানজাদা নিজের জীবনের সব অভিজ্ঞতা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেও তাকে কোনো পরামর্শ দিতে পারে না, এমনকি তার ব্যক্তিগত জ্যোতিষী শারাফকেও কেমন যেন বিভ্রান্ত মনে হয়। রাতের আকাশে পরিষ্কার আর তীক্ষ্ণ সৌন্দর্য নিয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারকারাজি হুমায়ুনের জন্য কোনো আলোকিত প্রভার বার্তা বয়ে আনে না। সে ভালো করেই জানে যে সারা পৃথিবী যখন তাঁর আব্বাজানের উপর বিরূপ হয়ে উঠেছিল তখন তার আব্বাজান বাবর যা করেছিলেন, উত্তর খুঁজে বের করার জন্য তাকেও নিজের অন্তদৃষ্টির উপরে নির্ভর করতে হবে।
এক মহিলার গানের শব্দ হুমায়ুনকে তার ভাবনার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। নীচু আর সুরেলা এই কণ্ঠস্বরের অধিকারিণীকে হুমায়ুন ভালো করেই চেনে কণ্ঠস্বরটা হামিদার। তরমুজের মতো বৃত্তাকার উদরের অধিকারিনী মহিলাটা অনুযোগের অঙ্গিতে হুমায়ুনকে হয়ত বলবে যে অনাগত সন্তান বিশালদেহী হবে এবং হুমায়ুনের হাত নিজের উদরের উপর নিয়ে স্থাপণ করবে যাতে হুমায়ুনও প্রাণশক্তিতে টগবগ করতে থাকা আবহাওয়া অনুভব করতে চেষ্টা করে। ছেলেটা প্রাণশক্তিতে ভরপুর। নিজের স্ফীত উদরের উপর থেকে হাত সরিয়ে এনে সে বাংলা একাডেমীর সংকীর্ণ ঘিঞ্জি সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসেন।
নদীর তীর দিয়ে হুমায়ুন যখন অস্থায়ী শিবিরে জাহিদ বেগকে খুঁজতে যায় গ্রাম থেকে একজন ঘোড়া দাবড়ে শিবিরের দিকে এগিয়ে আসে। হুমায়ুন চিনকে পারে দারয়া, আহমদ খানের ব্যক্তিগত দেখতে হলে তোমায় সদস্যপদ গ্রহণ করতে হবে। তার ধুসর ঘোড়াটার দেহ ঘামে জবজব করছে এবং তাঁর নিজের দেহের পোষাক সেই ঘামে ভিজে গাঢ় বর্ণ ধারণ করেছে। তাঁকে দেখে কাবুল পতনের সংবাদ সে যখন বয়ে এনেছিল, সেই সময়ের তুলনায় কমই উদ্বিগ্ন বলে মনে হয়।
সুলতান! দারয়া পিছলে নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসে। কি ব্যাপার?
এখান থেকে প্রায় পনের মাইল দূরে রাজপুত অশ্বারোহীদের একটা দল অবস্থান করছে।
কতজনের?
কমপক্ষে তিনহাজার হবে, এবং চৌকষ একটা দল আর তাদের কারো কারো কাছে আবার গাদা বন্দুকও রয়েছে। দলটা কোনো মালপত্র বহন করছে না আর ক্ষিপ্রতার সাথে ভ্রমণ করছে, আমরা তাঁদের সাথে কোনো মালবাহী শকট দেখতে পাইনি।
দলটা কোনদিক থেকে এগিয়ে আসছে?
উত্তরপশ্চিম দিক থেকে।
তার মানে দলটা মারওয়ার থেকে আগত সৈন্যবাহিনীও হতে পারে… পুরষ্কারের প্রাপ্তি যেখানে বিশাল সেখানে মালদেব এতো তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেবে, সে কেন আগেই এমন একটা ধারণা নিজের মনে পোষণ করছিল? আহমেদ খানকে ডেকে আন?
লোকগুলো কারা এবং তাঁদের সম্ভাব্য গন্তব্যস্থল জানার জন্য তিনি এখনও চেষ্টা করছেন। আপনাকে সর্তক করার জন্যই আমাকে তিনি পাঠিয়েছেন এবং সেই সাথে এটাও বলেছেন তিনি আমার পেছনেই থাকবেন।
দশ মিনিট পরে, সেনাপতিদের সাথে হুমায়ুনকে কথা বলতে দেখা যায়। দারয়ার নিয়ে আসা সংবাদ তার মনের অনিশ্চয়তা দূর করেছে। নিজের কর্তব্য করণীয় সম্পর্কে তার এখন স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।
পনের মাইল দূরে আমাদের গুপ্তদূতেরা রাজপুত অশ্বারোহীদের একটা চৌকষ দলকে সনাক্ত করেছে। আমি জানি না, ভাগ্য তাদের আমাদের এতো কাছাকাছি নিয়ে এসেছে নাকি আমাদের অবস্থান সম্পর্কে তারা আদতেই নিশ্চিতভাবে অবগত রয়েছে। তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে এখানে আমাদের পক্ষে লড়াই করা অসম্ভব। দূরের মাটির তৈরী বাড়ির বাইরে হাতের কব্জি আর পায়ের গোড়ালিতে পিতলের চকচক করতে থাকা বালায় সজ্জিত সুতির শাড়ি পরিহিত রমণীর দল আসনপিড়ি হয়ে বসে গরুর শুকনো গোবরে আগুন জ্বালাতে চেষ্টা করছে, যাতে তারা রাতের খাবার রান্না করা শুরু করতে পারে তাদের দিকে সে ইঙ্গিত করে।
কিন্তু সুলতান আমরা তাহলে কোথায় যাব? জাহিদ বেগ জানতে চায়।
লুনীর অপর তীরে। এখান থেকে মাইলখানেক উজানে নদী বেশ অগম্ভীর হওয়ায় গভীরতা কয়েক ফিটের বেশী হবে না- অতিক্রম করা সহজ হবে। আমি গতকাল সেখানে গিয়েছিলাম। আমরা তারপরে মরুভূমির উপর দিয়ে সোজা পশ্চিম দিকে যাত্রা করবো। গ্রামের মুখিয়া অমরকে বলে একটা প্রত্যন্ত এলাকার কথা বলেছে যেখানে আমরা নিরাপদে থাকতে পারবো।
হুমায়ুন দেখে তার সেনাপতিরা পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে। মরুভূমির বিপদের কথা তারাও জানে। আমি জানি, মরুভূমির একটা অশুভ খ্যাতি রয়েছে। আর সেজন্যই আমরা সেদিকে গিয়েছে জানতে পারার পরেও আমাদের শত্রুরা আমাদের অনুসরণ করতে ইতস্ততবোধ করবে। কিন্তু ভয় পেয়ো না- মরুভূমির মাঝে আমাদের পথ দেখাবার জন্য আমরা এখান থেকে একজন পথপ্রদর্শক সাথে নেব… সে নিশ্চিত করবে যে…
