আহমেদ খান তুমি তোমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে। আমাদের পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে চলো। হুমায়ুন যত অতৃপ্তি নিয়ে খেতে শুরু করেছিল তার চেয়ে অনেকবেশী তৃপ্তি নিয়ে নিজের অপ্রতুল আহার শেষ করে। দূর থেকে বালোত্রাকে দেখে যেমন মনে হয়েছে, জায়গাটা যদি সত্যিই তেমন হয় তাহলে সে তার পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করার সাথে সাথে, সেখানে সে তার দলবল নিয়ে আশ্রয় নিতে পারবে।
সেইদিন মধ্যাহ্নের সামান্য পূর্বে হুমায়ুন তাঁর সাথের লোকজন নিয়ে বসতিটার দিকে এগিয়ে যাবার সময় সে দেখে যে নদীর সমতল তীরে গড়ে উঠা বসতিটা আসলে যত্রতত্র কয়েক ডজন মাটির বাড়ির সমষ্টি ছাড়া আর কিছু না, নদীর লালচে-খয়েরী রঙের পানি গ্রীষ্মকালে যেমনটা হবার কথা তেমনিই নদীগর্ভেও অনেক নীচু দিয়ে মন্থর গতিতে বয়ে চলেছে। কিন্তু শস্য উৎপাদনের জন্য গ্রামবাসীদের চাহিদার চেয়ে বেশী পানিই রয়েছে নদীতে, আর নদীর তীর বরাবর আবাদী জমির চাষ করা মাটি ভেদ করে শস্যের সবুজ শীষ বেশ দেখা যাচ্ছে।
জওহর। গ্রামের মাতব্বরকে গিয়ে খুঁজে বের কর। তাঁকে গিয়ে বলবে আমরা নিতান্তই পর্যটক এবং আমাদের দ্বারা তার বসতির লোকদের কোনো ক্ষতি হবে না এবং আমরা নদীর তীরে তাদের আবাদি জমি যেখানে শেষ হয়েছে তারও পরে আমাদের অস্থায়ী ছাউনি স্থাপণ করতে চাই। তাঁকে আরও বলবে যে আমাদের রসদ আর জ্বালানি এবং সেই সাথে একটা মাটির বাড়ি প্রয়োজন যেখানে আমাদের মেয়েরা বিশ্রাম নিতে পারবে, আর সামান্য আড়াল খুঁজে পাবে- আর এসবের জন্য আমরা উপযুক্ত মূল্য দিব।
*
মাটির তৈরী একটা একতলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে, হুমায়ুন একদৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। সেপ্টেম্বর মাস চলছে এবং গ্রীষ্মের দাবদাহের তীব্রতাও তাই এখন অনেকটাই সহনীয়। বিরল জনবসতি অধ্যুষিত অঞ্চলের একপ্রান্তে অবস্থিত হবার কারণে যাত্রাবিরতির জন্য বালত্রোরা নিঃসন্দেহে একটা উপযুক্ত স্থান নিরাপদ। বালক্রোরা গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রায় অন্ধ মোড়ল সিম্ভুর ভাষ্যমতে, লুনী নদীর দুপাশে বালত্রোরাসহ হাতে গোনা যে কয়টি বসতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে স্থানীয় জমিদার কিংবা যুদ্ধবাজ গোত্রপতিরা খুব বেশী আগ্রহী না হবার কারণে তারা শান্তিতেই বসবাস করছে। গ্রামবাসীদের একঘেয়ে জীবন ঋতু পরিবর্তনের চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
সিম্ভুকে হুমায়ুন সঙ্গত কারণেই নিজের আসল পরিচয় দেয়নি এবং মোড়লও ঘোলাটে চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু কিছু জানতে চায় না। বস্তুতপক্ষে, সে তাঁকে প্রায় কোনো প্রশ্নই করে না এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় হুমায়ুনের গল্পটা সে বিশ্বাস করেছে, যে সে একজন সেনাপতি যে নিজের এলাকা থেকে পথভুল করে বহুদূরে এসে পড়েছে যার সৈন্যদলের বিশ্রাম আর রসদ প্রয়োজন। হুমায়ুন অবশ্য এতকিছুর পরেও সিদ্ভুর অস্বস্তি ঠিকই আঁচ করতে পারে, যে সে আর তাঁর সৈন্যবাহিনী হয়ত তার লোকদের জন্য বড় ধরনের কোনো বিপদ বয়ে আনবে যতই। সে প্রতিশ্রুতি দিক এবং সে টাকা খরচ করুক। তারা যখন এখান থেকে বিদায় নেবে, বৃদ্ধ লোকটা তখন সত্যিই ভারমুক্ত হবে।
হুমায়ুন নিজেও অবশ্য এখান থেকে বিদায় নেবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে যতই দুর্গম আর প্রত্যন্তস্থান হোক, বেশীদিন একস্থানে অবস্থান করাটা বড্ডবেশী বিপজ্জনক- কিন্তু মুশকিল হল সে কোথায় যাবে? কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা সামলে নেবার ক্ষমতা এখন তার নেই। তাঁর সমস্থ অনুভূতি চাইছে- এখন যখন তাঁর মনে হচ্ছে যে অনুসরণরত মালদেবের লোকদের সে খসিয়ে ফেলতে পেরেছে উত্তরে খাইবার গিরিপথের দিকে অগ্রসর হতে এবং সেখানের পাহাড়ী গোত্রগুলো। যারা তাঁর কাছে আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ, তাদের একত্রিত করে কাবুল অভিমুখে রওয়ানা দেয়া এবং আসকারি আর কামরান সেখানে নিজেদের আধিপত্য জোরদার করার আগেই শহরটা তাঁদের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার প্রয়াস নেয়া। কাবুলে নিজের কর্তৃত্ব যতক্ষণ সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না করছে এবং পেছন থেকে ধেয়ে আসা হুমকি অপসারিত করছে, ততক্ষণ শেরশাহকে মোকাবেলা করা নিয়ে সে কিছু ভাবতেই পারছে না।
উত্তরদিকে অগ্রসর হলে অবশ্য তাকে পুনরায় মারওয়ারের কাছাকাছি যাবার ঝুঁকি নিতে হবে কিন্তু তাঁর সামনে অন্য যেসব বিকল্প পথ রয়েছে সেগুলোর কোনোটাই তাকে দ্রুত কাবুলে ফিরে যাবার সুবিধা দেবে না কিন্তু সমান ঝুঁকিপূর্ণ। সে যদি পূর্বদিকে অগ্রসর হয় তাহলে সে অচিরেই মেবার আর আম্বারের রাজপুত রাজত্বে প্রবেশ করবে যাদের শাসকদের, সে যতটুকু জানে, মালদেবের সাথে যোগ দেবার জোরাল সম্ভাবনা রয়েছে। একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যদিও রাজপুতদের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে কিন্তু কোনো লোককে যদি তারা নিজেদের সাধারণ শত্রু হিসাবে বিবেচনা করে তবে তার বিরুদ্ধে তারা দ্রুতই নিজেদের একতাবদ্ধও করতে জানে বা শেরশাহের দেয়া উৎকোচের প্রতিশ্রুতির অঙ্কটা যদি বিশাল হয়।
হুমায়ুন দক্ষিণে অগ্রসর হলে সামনে গুজরাত পড়বে যা এখন শেরশাহের করতলগত সেইসাথে পশ্চিম অভিমুখী পথও ঝুঁকিশূন্য নয়। সিস্তুর ভাষ্য অনুযায়ী, লুনী নদীর অপর তীরে পশ্চিমদিকে সিন্ধ পর্যন্ত প্রায় তিনশ মাইল প্রসারিত আরেকটা মরুভূমি রয়েছে- চোরাবালি আর বিক্ষিপ্ত বাতাসের একটা প্রতারক প্রতিবেশ যেখানে অসতর্ক অভিযাত্রী নিমেষেই মৃত্যুর বরাভয়ে সিক্ত হতে পারে। মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচীন মরুদ্যান, অমরকো অভিমুখী পুরো কাফেলা মরুভূমির বুকে হারিয়ে গেছে এমনটাও শোনা যায়। বালত্রোরা অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অমরকে আসা যাওয়া করে এবং একটা নিরাপদ রাস্তাও তারা চেনে কিন্তু সিন্ধু তার অভিজ্ঞতঋদ্ধ বুড়ো মাথাটা গম্ভীরভাবে ঝাঁকিয়ে হুমায়ুনকে সতর্ক করে দেয়, যাত্রাটাকে হাল্কাভাবে নেয়াটা মোটেই ঠিক হবে না।
