ওদিকে দেখেন! গুপ্তদূতদের একজন চেঁচিয়ে উঠে- সদ্য কৈশোর অতিক্রম করেছে- রৌদ্রের চোখ ঝলসানো আলোর হাত থেকে বাঁচতে চোখের দুপাশে হাত দিয়ে আড়াল তৈরী করেছে। বামদিকে!
হুমায়ুন চোখ কুচকে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং দাবদাহের আড়াল থেকে প্রথমে একটা পরে আরো দুটো খেজুর গাছের অস্পষ্ট আকৃতি ভেসে উঠতে সে শ্বাস নিতে ভুলে যায় এবং তারপরে আরেকটু দূরে পানির উপরে সূর্যের আলো পড়ে বোধহয় মুহূর্তের জন্য ঝলকে উঠে। আমি খেজুর গাছ দেখতে পাচ্ছি এবং সম্ভবত একটা নদী। আহমেদ খান, তোমার কি মনে হয়?
হ্যাঁ। ঐ গাছগুলোর আড়ালে সম্ভবত বালতোরা বসতি ঢাকা পড়ে রয়েছে যার কথা আমরা আগেই শুনেছি। সূর্যের আলোয় যে পানিতে পড়ে ঝলসে উঠেছে সেটা সম্ভবত কচ্ছের মরুভূমি দিকে বয়ে চলা লুনী নদী।
বালতোরা বসতি সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানি?
খুবই সামান্য। কিন্তু বসতিটা দেখে মনে হচ্ছে সেটা এখনও পনের মাইল বা সেরকমই দূরে রয়েছে। সুলতান, আপনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে আমি আমাদের সাথের কয়েকজন গুপ্তদূতকে সামনে পাঠিয়ে আমরা আমাদের মূল দলের জন্য অপেক্ষা এবং রাতের মতো এখানে অস্থায়ী ছাউনি স্থাপন করতে পারি।
তাই কর, এবং সামনের বসতিতে মালদেওর লোকেরা ওত পেতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না এই বিষয়ে গুপ্তদূতরা যেন ভালো করে নিশ্চিত হতে।
ভাগ্য এখন পর্যন্ত হুমায়ুনের পক্ষে রয়েছে। কাঁধের উপর দিয়ে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে বহুবার পেছনে তাকান সত্ত্বেও, গত কয়েক সপ্তাহে মারওয়ার থেকে আগত অনুসরণকারীদের এখন পর্যন্ত কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। তাঁর মূল বাহিনীর সাথে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে মিলিত হবার পরে, কয়েক দিনের জন্য হুমায়ুন উত্তরের দিকে তার বাহিনীর মুখ ঘুরিয়ে নেয় মালদেওকে বিভ্রান্ত করার একটা পরিকল্পিত অভিপ্রায়ে। পরবর্তী চারদিনের দুঃসহ যাত্রায় প্রত্যেকের স্নায়ু সতর্কতার চূড়ান্ত সীমা স্পর্শ করে থাকে, সৈন্যসারির চারদিকে প্রতিবন্ধকতা মোতায়েন করা হয়, গুপ্তদূতদের গতিবিধির সীমানা দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত ব্যাপত করা হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের গমন পথে বাতিল উপকরণ- এমনকি মালবাহী শকটও পরিত্যাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় সেখানে আগত মালদেওর গুপ্তদূতদের মনে প্রত্যয় জন্মাতে যে তারা সত্যিই উত্তর দিকে যাচ্ছে, হুমায়ুন এরপরই পূর্বদিকে বৃত্তাকারে ঘুরে যায়। তারপরে সে দক্ষিণ অভিমুখে দিক পরিবর্তন করে, প্রথমদিকে তাঁদের পথচলার চিহ্ন গোপন করতে পদাতিক বাহিনীর সৈন্যরা শুকনো ঝোপঝাড় দিয়ে বালুতে ঝাড় দিতে দিতে অনুসরণ করে।
পুরো যাত্রায় হুমায়ুনের কেবল একবারই মনে হয়েছিল দিগন্তের কাছে সে অশ্বারোহীদের দেখতে পেয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে সেগুলো মরুভূমির এখানে সেখানে দেখতে পাওয়া ঝাকড়া ঝোপঝাড়ে জন্মানো ছোট ছোট টক খাবার লোভে দূরের গ্রাম থেকে আগত ছাগলের একটা পালের চেয়ে বেশী হুমকিদায়ক না। শেরশাহের প্রতিনিধিদের সাথে গোপন বৈঠক শেষে ফিরে এসে অতিথি কাউকে খুঁজে না পেয়ে মালদেওর ক্ষুব্ধ চেহারাটা সে মনে মনে আঁকতে চেষ্টা করে কিন্তু শীঘ্রই নিজের পরিবার আর তার লোকদের জন্য কিভাবে একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করা যায় তার ভাবনার স্রোত সেদিকে ধাবিত হয়। মরুভূমির ভিতরে উদ্দেশ্যহীনভাবে তারা অনন্তকাল ঘুরে বেড়াতে পারে না। রাজপুত তীর আর গাঁদা বন্দুকের গুলির মতো মরুভূমির শ্বাসরুদ্ধকর দাবদাহ এবং তাজা খাবার আর পরিষ্কার পানির স্বল্পতা অনায়াসে তাদের শেষ করে দিতে পারে।
আর সবসময়ে হামিদার জন্য উদ্বেগ তাঁকে বিদ্ধ করে। রাতের বেলা নিষ্ঠুম জেগে থাকার কারণে বিছানায় শুয়ে হামিদার এপাশ ওপাশ আর ছটফট করতে থাকার শব্দ সে শুনতে পায়, সম্ভবত মালদের হাতে ধরা পড়ে নিজের আর তার ভাবী সন্তানের খুন হবার দৃশ্যকল্প তাঁকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করছে। কিন্তু হামিদা কোনো অভিযোগ করে না এবং হুমায়ুন জানতে চাইলে এটা ওটা বলে পাশ কাটিয়ে যায় যে সামান্য বদহজম হয়েছে- গর্ভবতী অবস্থায় সব মেয়েরই নাকি এই সমস্যা হয় হামিদা শুনেছে। গত রাতে হামিদা তাকে বলে, আমরা আমাদের সন্তানের কাছে গল্প করবো যে পরিস্থিতি তখন কেমন ছিল- কিভাবে নরকতুল্য স্থানে আমরা তাঁকে আগলে রেখেছিলাম- আমরা সবাই কিভাবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলাম সেই গল্প থেকে সে মনোবল সংগ্রহ করবে, নাকি করবে না? হুমায়ুন হামিদাকে কাছে টেনে নেয় এবং মেয়েটার সাহস আর অভিযোগহীন মনোভাবে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে।
সুলতান, আহমদ খান, পরের দিন সকালে হুমায়ুন যখন তাঁর তাবুর বাইরে পানিপূর্ণ ছোট একটা পাত্র আর খামিরবিহীন একটুকরো রুটি, সূর্যের আলোয় শুকিয়ে কটকটে হয়ে যাওয়া খুবানি যা চিবোতে গিয়ে হুমায়ুনের মনে হয় তার দাঁত বুঝি ভেঙে যাবে- সহযোগে প্রাতরাশ করছে, তখন এসে হাজির হয়। আমার গুপ্তদূতেরা মাত্র ফিরে এসেছে। জায়গাটা বালোত্রাই, এখান থেকে প্রায় বিশ মাইল দূরে।
মালদেও বা তার লোকদের কোনো চিহ্ন তাঁর দেখতে পায়নি।
না।
সেখানে কতজন অধিবাসী রয়েছে?
সম্ভবত দুইশোজন, সবাই পশুপালক আর কৃষিজীবি।
