আমার রক্ত-সম্পর্কিত বোন, তোমায় আমি কখনও ভুলতে পারবো না। আর আগ্রায় আমি যখন সম্রাজ্ঞী হব, তোমায় সেখানে নিয়ে যাবার জন্য আমি লোক পাঠাব… এবং তখন যদি তোমার যাবার ইচ্ছা হয় তাহলে তোমার সাথে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আচরণ করা হবে। হামিদা সুলতানার গালে আলতো করে একটা চুমু দেয়। আল্লাহ তোমার সহায় হন।
*
আকাশের পূর্বদিকে মাত্র ভোরের লালচে আভা ফুটতে আরম্ভ করেছে, তখনই পুরোদস্তুর শিকারের পোষাকে সজ্জিত হুমায়ুনকে সমকেন্দ্রিক দেয়ালের ভিতর দিয়ে সঙ্গীসাথী পরিবেষ্টিত অবস্থায় তাদের পরনেও শিকারের পোষাক, প্রধান তোরণগৃহের দিকে ধীরে ধীরে ঘোড়া চেপে এগিয়ে যেতে দেখা যায়, দূর্গ থেকে সেটাই একমাত্র বের হবার রাস্তা। মালদেবের দেয়া একটা চমৎকার কালো রঙের বাজপাখি তাঁর কব্জিতে বসে রয়েছে, হলুদ চামড়ার তৈরী পাথরখচিত গোছা বাঁধা টোপরের নীচে পাখিটার উজ্জ্বল চোখ ঢাকা রয়েছে। তার পেছনে, হামিদা, খানজাদা, গুলবদন আর অন্যান্য মেয়েদের বহনকারী পালকিগুলো কাশিম আর তার অন্যান্য অমাত্য এবং সেনাপতিরা ঘিরে রেখেছে। গতরাতে হামিদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে সোজা তার ফুপিজান এবং গুলবদনের সাথে দেখা করে এই বিপদ সম্পর্কে এবং তাদের এখন কি করা উচিত সে সম্পর্কে অবহিত করে। মোগল রাজকুমারীর সহজাত প্রবৃত্তির অধিকারী হবার কারণে, তারা সাথে সাথে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারে এবং কোনো প্রশ্ন না করে আর সংযত হয়ে তাঁর কথামতো কাজ করে।
হুমায়ুন তার দলবল নিয়ে তোরণগৃহের নিকটবর্তী হবার সাথে সাথে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো সমান দ্রুততায় তার শরীরে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। ভোরের কোমল আলোয় দূর থেকেই সে দেখতে পায় যে ধাতব বেষ্টনী তখনও নামান রয়েছে। তার চোখ সম্ভাব্য অতর্কিত আক্রমণের হুমকি চিহ্নিত করতে দ্রুত ডানে বায়ে তাকাতে থাকে। সুলতানার প্রতিটা কথা সে যদিও বিশ্বাস করেছে কিন্তু এই স্থানে সে আগেও প্রতারিত হয়েছে। সুলতানা নিজেও সম্ভবত হারেমের ভিতরে কোনো শত্রুর দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে পারে, মোগল সম্রাজ্ঞীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎকার যাকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। কিন্তু সবকিছু যেমনটা আশা করা হয়েছিল দেখে তেমনই মনে হয়। তোরণগুহের কোনো আড়াল থেকে তবকির গাঁদা বন্দুক গর্জে উঠে না বা মৃত্যু মুখে নিয়ে তীরের ফলা বাতাসে শিহরন তোলে না। সচরাচর যেমন থাকে তেমনই প্রহরী মোতায়েন রয়েছে। আপাত অমনোযোগী ভঙ্গিতে হুমায়ুন জওহরকে ইশারা করতে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে, ধাতব বেষ্টনী তুলে দাও। মহামান্য সম্রাট বাজপাখি নিয়ে শিকারে যেতে আগ্রহী। কমলা রঙের জোব্বা আর পাগড়ি পরিহিত এক দীর্ঘদেহী যোদ্ধা, সম্ভবত প্রহরীদের দলনেতা ইতস্তত করে। হুমায়ুন টের পায় তার শিরদাঁড়া দিয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে নামছে এবং আড়চোখে বামপাশে ঝুলন্ত আলমগীরের দিকে তাকায়। তার পিঠে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে তীর ভর্তি তূণীর। কিন্তু শক্তি প্রদর্শনের কোনো দরকার হয় না। দুই কি এক সেকেণ্ড পরেই রাজপুত দলনেতা চিৎকার করে আদেশ দেয়, বেষ্টনী উত্তোলন কর।
তোরণের উপরে অবস্থানরত লোকেরা কপিকলের চাকা ঘোরাতে শুরু করে মোটা কালো শিকল গুটিয়ে নিতে, যেটার সাথে ধাতব বেষ্টনী ঝুলে আছে। যন্ত্রণাদায়ক ধীরগতিতে বা হুমায়ুনের তেমনই মনে হয়- কাঁচকাঁচ, ঘড়ঘড় শব্দ তুলে ভারী ধাতব বেষ্টনী শূন্যে উঠে যায়। কপিকলের চাকা প্রতিবার ঘোরার সাথে সাথে হুমায়ুনের আশাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে যদিও সে অনেক কষ্টে চোখে মুখে সামান্য বিরক্তিমিশ্রিত অমনোযোগী একটা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে রাখে।
ধাতব বেষ্টনী পুরোপুরি উত্তোলিত হবার পরেও হুমায়ুন কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো প্রদর্শন করে না বরং সে তার বাজপাখির টোপর ঠিক করতে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপরে, তার হাতের এক ঝটিকা ইঙ্গিতে, সে তার গুটিকয়েক সফরসঙ্গীদের নিয়ে দুলকি চালে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ধীর গতিতে, শিলাস্তরের ধার দিয়ে খাড়া ভাবে নেমে যাওয়া ঢালু রাস্তা দিয়ে, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই ঢালু পথ দিয়েই তারা বিপরীত দিকে আশায় বুক বেধে উঠে গিয়েছিল, তারা নীচের দিকে নামতে থাকে, যাতে এখনও কেউ সন্দিগ্ধ না হয়, এবং পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত খিলানাকৃতি আনুষ্ঠানিক তোরণের নীচে দিয়ে বের হয়ে তখনও ঘুমিয়ে থাকা শহরের নিরব জনমানবহীন সড়ক দিয়ে এগিয়ে যায়। ছোট দলটা অচিরেই পূর্বদিকে যাত্রা করে, তাদের সামনের এলাকা উদীয়মান সূর্যের সোনালী আলোয় উদ্ভাসিত, এবং বালুকাবৃত এই পতিত প্রান্তর যা যদিও মানব অস্তিত্বে পক্ষে বিরূপ এখন তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ।
২.৮ মরুভূমির পিশাচনৃত্য
১৩. মরুভূমির পিশাচনৃত্য
হুমায়ুন হাতের ইশারায় ক্ষুদ্র রেকীকারী দলটাকে থামতে ইঙ্গিত করে, যার সাথে সে তাঁর মূল সৈন্যসারি ত্যাগ করে অনেকটাই সামনে এগিয়ে এসেছে। সে তাঁর ঘোড়ার পর্যানের একপাশে চামড়ার মশকে রক্ষিত মহামূল্যবান পানি থেকে এক ঢোক গলাধঃকরণ করে তারপরে ঘামের তেলতেলে দাগে ছোপ ছোপ হয়ে থাকা ঘোড়ার গলায় আলতো করে চাপড় দেয়। তার চারপাশে যে দিকে দৃষ্টি যায় দাবদাহে চোখ ধাধিয়ে দেয়া মরুভূমি, নিরব, সীমাহীন এবং সর্বগ্রাসী।
