সুলতান। হামিদার আবাসন কক্ষে প্রবেশ করতেই একটা মেয়ে তার সামনে নতজানু হয়।
উঠে দাঁড়াও। মেয়েটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, হাত ভাজ করে অপেক্ষা করার মাঝে হুমায়ুন তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। সুলতানার বয়স প্রায় ত্রিশ বছর হবে কিন্তু তাঁর মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিম্নাংশ প্রশস্ত, যা আফ্রিদি লোকদের বৈশিষ্ট্য এখনও রীতিমতো সুন্দরী এবং মাথার কালো চুলে এখনও রূপালি ক্ষত সৃষ্টি হয়নি। মেয়েটা স্বচ্ছ, লালচে-বাদামি রঙের চোখে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে হুমায়ুনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে যেন ভাবছে সম্রাটের আবেক্ষণ উতরানোর মতো যোগ্যতা কি তার রয়েছে।
সম্রাজ্ঞী তোমার কথা আমাকে বলেছে। সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমরা তোমার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবো…
সুলতান, আমি সত্যি কথাই বলেছি। আমি শপথ করে বলছি।
রাজা তার গোপন পরিকল্পনার কথা হঠাৎ তোমায় কেন বলতে গেলেন?
তিনি হারেমে- নিজের সম্বন্ধে মাত্রাতিরিক্ত আত্মগর্ব আর আত্মতুষ্টির আকাঙ্খয়- এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করে থাকেন। সুলতান,এমনকি মরুভূমির উপর দিয়ে আপনার এদিকে আসবার সময়, সে যখন জানতে পারে যে আপনার সাথে খুব সামান্য পরিমাণ রসদ রয়েছে, সে বলেছিল আপনাকে আক্রমণ করতে তাঁর ভীষণ ইচ্ছে করছে। কিন্তু মিষ্টি কথা আর প্রতিশ্রুতির ছলনায় আপনাকে প্রলুব্ধ করাটা তাকে বেশী প্রীত করেছে। লোকটা একজন ওস্তাদ কৈতব আর ষড়যন্ত্রের জটিল পরিকল্পনা করতে পছন্দ করে…আপনাকে সে পুরোপুরি নিজের আয়ত্তের ভেতরে এই বিষয়ে সে একেবারে নিশ্চিত হতে চেয়েছে। সুলতানার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠে, সুলতান, লোকটা একটা সাক্ষাৎ পিশাচ…
সুলতানার চোখে ফুটে উঠা আতঙ্ক আর মানসিক সংক্ষোভ হুমায়ুন যা সহজেই পড়তে পারে, তাকে বলে দেয় যে মেয়েটা আর যাই হোক মিথ্যা কথা বলছে না।
আমাদের রক্ষা করতে আল্লাহ্তালাই তোমায় এখানে পাঠিয়েছেন, সুলতানা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লে সে বলে।
সুলতান, আমি আশা করি যেন সেটাই হয়। আপনাকে সাহায্য করতে আমার পক্ষে যা সম্ভব সবকিছু আমি করবো।
বেশ, আমার পরিকল্পনার কথা আমাকে তোমায় বলতে দাও… মালদেবের আতিথ্য গ্রহণ করার পরে আমি বাজপাখি নিয়ে বেশ কয়েকবার শিকার করতে গিয়েছি। আমি যদি আবারও শিকারে যেতে চাই তাহলে এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কিছুই হতে পারে না? আগামীকাল, ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করার সাথে সাথে, আমি এবং আমার সব অমাত্য আর সেনাপতি যারা এখানে এই প্রাসাদে অবস্থান করছে, সবাই এমনভাবে সজ্জিত হবে যেন আমরা সারাদিনের জন্য শিকারে যাচ্ছি। আমাদের মেয়েদের জন্য আমি পালকি প্রস্তুত রাখার আদেশ দেব, বলবো যে আমি চাই সারা দিনব্যাপী আমোদ-প্রমোদ তারাও উপভোগ করুক। আমার সাথে তারা আগেও শিকারে গিয়েছে, তাই তাদের এবারের যাত্রার ভেতরে কেউ বিচিত্র কিছু খুঁজে পাবে না। দূর্গ থেকে আমরা নীচের সমতলে নেমে যাওয়া মাত্র আমরা পূর্বদিকে মরুভূমি অভিমুখে রওয়ানা দেব।
অবশ্য সেই সাথে আমার বাহিনীকেও আমি সরিয়ে দিতে চাই। আমার ব্যক্তিগত পরিচারক জওহরকে আজ রাতেই আমি জাহিদ বেগের কাছে পাঠাব, সে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শহরের বাইরে আমাদের অস্থায়ী সেনাছাউনির নেতৃত্বে রয়েছে। জওহর প্রায়শই আমার কাছ থেকে জাহিদ বেগের কাছে বার্তা নিয়ে যায়, তাই এবারও কারও মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার কথা না। সে জাহিদ বেগকে গিয়ে তখনই লোকদের কিছু বলতে নিষেধ করবে কিন্তু আগামী কাল খুব সকালে সে যেন তাদের নিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা করে, পুরো ব্যাপারটা যেন এমনভাবে সাজান হয় যে দেখে মনে হয় তারা সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য যাচ্ছে। অস্থায়ী ছাউনি স্থাপনের বেশীর ভাগ সরঞ্জাম তাদের ফেলে আসতে হবে। সেই সাথে আমাদের কামানগুলোও- কিন্তু এছাড়া আর কোনো পথ নেই। মারওয়ারের দৃষ্টি সীমার বাইরে একবার পৌঁছে গেলে, তাদের বৃত্তাকারে ঘুরে এসে আমাদের বাকি লোকদের সাথে যোগ দিতে হবে। হুমায়ুন চুপ করে থেকে কিছু ভাবে। সুলতানা, তোমার কি মনে হয়? মালদেবের অনুপস্থিতিতে প্রহরীরা কি আমাকে আমার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে দূর্গ ত্যাগ করার অনুমতি দেবে?
আপনি শিকারে যাবেন পুরো ব্যাপারটা যদি এমন দেখায়, তাহলে আপনাকে বাধা দেবার কোনো কারণ তাদের নেই। আমি যত দূর জানি, মালদেব দূর্গের অভ্যন্তরে আপনাকে আটকে রাখার কোনো আদেশ দেয়নি- আপনার সন্দেহ হতে পারে এমন কিছুই করার কোনো অভিপ্রায় তার নেই।
কিন্তু সুলতানা তুমি? হামিদা মেয়েটার বাহু স্পর্শ করে। আমাদের সাথে তোমারও আসা উচিত…এখানে থেকে যাওয়াটা তোমার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তুমি কি করেছে মালদেব এটা ঠিকই অনুমান করবে…
হুমায়ুনকে বিস্মিত করে দিয়ে সুলতানা অসম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে।
কিন্তু নিজের লোকদের সাথে তোমার পুনরায় মিলিত হবার এটা একটা সুযোগ…
মালদেবের হাতে এখানে আমার সাথে যা কিছু হয়েছে তারপরে আমার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না…আমার জীবনের ঐ অংশটার সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু আমি যখন দেখবো তার লোভ, উচ্চাকাঙ্খ বাধা প্রাপ্ত হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে সেটাই হবে আমার পুরষ্কার, পরম প্রাপ্তি… একটা দুখী কিন্তু একই সাথে সাফল্যে উদ্ভাসিত হাসিতে ক্ষনিকের জন্য তার মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠে। আর আমার মনে হয় না আমাকে সে সন্দেহ করবে… আমি যা করেছি সেটা করার মতো বুদ্ধি বা সাহস কোনোটা আমার আছে বলে সে মনেই করে না…
