হুমায়ুন তাঁকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসে এবং তাঁকে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বুকের কাছে ধরে রাখে। হামিদা, পুরোটা আমায় বল। আমাকে সবকিছু তোমায় অবশ্যই বলতে হবে…।
নিজেকে সামলে নিয়ে হামিদা এবার হুমায়ুনের বুকে মুখ রেখে চাপা স্বরে পুনরায় বলতে থাকে। মালদেওকে শেরশাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে রাজা যদি আপনার ছিন্ন মস্তক…এবং আমার গর্ভের অজাত সন্তানকে…তার কাছে। পাঠায়…অর্থ আর ধনসম্পদ দিয়েই সে তাঁকে পুরস্কৃত করবে না সেই সাথে তাঁকে নতুন শহর আর ভূখণ্ড দান করবে যা সে শেরশাহের সাম্রাজ্যের বাইরে স্বাধীনভাবে নিজের দখলে রাখতে পারবে। সুলতানা যখন আমাকে এই কথাগুলো জানায় আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি…কিছুক্ষণের জন্য আমি ঠিকমতো চিন্তাভাবনাও করতে পারছিলাম, কিন্তু আমি মনে মনে জানতাম যে আমাকে শক্ত থাকতে হবে…আমাদের জন্য এবং আমার গর্ভে আমি যাকে বহন করছি তার জন্য…
মালদেও এর হাস্যোজ্জ্বল মুখ, তাঁর কপটতাপূর্ণ মিথ্যাচারের কথা হুমায়ুন যখন চিন্তা করে, তার ভেতরে ক্রোধ আর বিরক্তির মাত্রা এতোই প্রবল হয়ে উঠে যে তাঁর মনে হয় উন্মত্ততায় বুঝি সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়বে। শেরশাহের প্রস্তাব গ্রহণের অভিপ্রায় কি মালদেওর রয়েছে? সে কোনোমতে জিজ্ঞেস করে।
সুলতানা বলেছে রাজা ভীষণ সতর্ক। শের শাহের প্রতিনিধিকে এ কারণেই সে মরুভূমির অভ্যন্তরে অবস্থিত দূর্গে ডেকে পাঠিয়েছে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য যাতে সে নিজে তাঁকে প্রশ্ন করতে পারে। কিন্তু সে যদি একবার বিশ্বাস করে যে শেরশাহ যা বলেছে সেটাই বোঝাতে চেয়েছে, আমাদের হত্যা করতে মালদেও ইতস্তত করবে না। আজ সন্ধ্যাবেলা মালদেও দূর্গ ত্যাগ করার সাথে সাথে, সুলতানা আমার সাথে দেখা করার জন্য একটা অজুহাত তৈরী করে…
তোমার এই সুলতানা বিশ্বস্ত তুমি কি এই বিষয়ে নিশ্চিত? আমাদের জন্য সে এতো বড় ঝুঁকি কেন নেবে?
মেয়েটার প্রতি মালদেও উদাসীন বলে সে তাকে ঘৃণা করে… মালদেও তাকে তৃণভূমি থেকে আগত বর্বর প্রেয়সী বলে সম্বোধন করে। কিন্তু রাজার প্রতি তাঁর বিদ্বেষের কারণ এরচেয়েও গভীরে প্রোথিত। আমার উদরে মেয়েটা যখন হাত রেখেছিল তখন আমি তার ভেতরে নিদারুণ একটা যন্ত্রণা লক্ষ্য করেছি…মেয়েটা আমাকে বলেছে যে মালদেওর একটা পুত্রসন্তানকে যখন সে গর্ভে ধারণ করে তখন সে বলেছিল ছেলেটা প্রাসাদে মানুষ হবার যোগ্য না এবং সে তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়। ছেলেটা বেঁচে আছে না মারা গেছে এটাও মা হিসাবে মেয়েটা জানতে পারেনি। আমাদের ভাবী সন্তান এবং আমাকে একজন মা হিসাবে খাতির করার কারণে সে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সে নিজেকে আমার রক্ত-সম্বন্ধীয় বোন বলে ঘোষণা করেছে এবং আমি তাকে বিশ্বাস করি।
হুমায়ুন আলতো করে হামিদাকে ছেড়ে দেয়। হুমায়ুনের দিকে হামিদা উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকলে, রাজপুত ঐতিহ্যের মূল দ্যোতনা আতিথিয়তা আর সম্মানের সমস্ত রীতিনীতির মর্যাদাহানি এবং মালদেওর কপটতার কারণে তাঁর ক্রোধের উন্মত্ততা ধীরে ধীরে একটা শীতল সংকল্পে পর্যবসিত হয়। সে যদি তার নিজের পরিবার আর লোকদের জীবন বাঁচাতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে কেবল একটা বিষয়ের প্রতি তাঁর সমস্ত কেন্দ্রীভূত করতে হবে- যে কোনো মূল্যে বেঁচে থাকা।
তোমাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- তোমার বা তোমার অনাগত সন্তানের কোনো ক্ষতি হবে না। আমার সম্রাজ্ঞী করবো বলে আমি তোমায় বিয়ে করেছি এবং সম্রাজ্ঞীই তুমি হবে। আর আমাদের সন্তান আমার পরে ম্রাট হবে। মালদেওর নীতিবিগর্হিত ষড়যন্ত্র এসব পরিবর্তিত করতে পারবে না।
হুমায়ুনের এই কথায়, হামিদা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের এখন কি করা উচিত?
এই বিষয়ে তুমি কি আর কারো সাথে আলাপ করেছো? গুলবদন কিংবা খানজাদা?
কারো সাথে আলাপ করিনি।
তোমার খেদমতকারী জয়নব এসব সম্বন্ধে কি জানে?
সে কেবল এটুকু জানে যে সুলতানার সাথে কথা বলে আমার মেজাজ খারাপ হয়েছে…
তুমি কি সুলতানাকে আরেকবার ডেকে আনতে পারবে?
হ্যাঁ। তাঁর কক্ষ কাছেই অবস্থিত এবং প্রাসাদের ভিতরে সে অবাধে চলাফেরা করতে পারে।
নিজের চেহারা দেখাবার খাতিরে আমাকে অবশ্যই কিছুক্ষণের জন্য তোমায় একলা রেখে যেতে হচ্ছে। মালদেওর কতিপয় সেনাপতির আমার এবং আমার আধিকারিকদের সাথে আহার করার কথা রয়েছে সেখানে শেরশাহের বিরুদ্ধে আসন্ন অভিযান নিয়ে আলোচনা হবে। সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে এমন কিছুই আমি এখন করবো না। কিন্তু এখন থেকে ঠিক দুই ঘন্টা পরে সুলতানাকে এখানে আসতে বলো এবং আমার পক্ষে যত শীঘ্রি সম্ভব আমি তোমার সাথে মিলিত হবো। এই মেয়েটাকে আমি নিজে একবার ভালো করে দেখতে চাই। সে ঝুঁকে এসে, হামিদার কোমল অধরে আলতো করে চুমু দেয়। ভয় পেয়ো না, সে ফিসফিস করে বলে, আমি বলছি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে…
তার পক্ষে যত দ্রুত সম্ভব বটে কিন্তু হুমায়ুন যেমনটা আশা করেছিল তার চেয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরে, তাঁকে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে হামিদার আবাসন কক্ষে পুনরায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। কয়েকশ পিতলের দিয়ায় জ্বলন্ত শলতে এবং দেয়ালের কুলঙ্গিতে রক্ষিত মশালের আলোয় হুমায়ুন যাকে আশ্রয়স্থল ভেবেছিল সেই স্থানের রুক্ষ পাথুরে দেয়ালের উপরিভাগ নমনীয় দেখায় কিন্তু সুলতানা যদি সত্যি কথা বলে থাকে- এটা কেবল বন্দিশালাই নয় হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য স্থান। ভোজসভায় অবস্থান করার সময় সারাক্ষণ- যদিও হাবেভাবে মালদেওর লোকদের প্রতি মনোযোগী আর বিনয়ী ছিল- সে নিজের ভেতরে বারবার কেবল একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছিলো তার কি করা উচিত এবং অবশেষে একটা সাহসী আর বেপরোয়া পরিকল্পনা ধীরে ধীরে তার মাথায় পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্ত হতে থাকে…
