কি ব্যাপার?
জয়নব তখনও নতজানু অবস্থায়, দ্রুত কথা বলতে থাকে। সুলতান, মহামান্য রাজমহিষী যত দ্রুত সম্ভব আপনাকে তার সাথে দেখা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
হুমায়ুন হাসে। আজরাতে সে হামিদার কাছে যাবার কথা চিন্তা করছিলো। তারা এখন যখন নিরাপদ আর আরামে রয়েছে এবং হামিদাও পুনরায় সুস্থবোধ করতে শুরু করায়, তার মন আজকাল প্রায়ই শারীরিক আনন্দের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে যদিও হামিদার উদর মাতৃত্বের লক্ষণ নিয়ে দ্রুত বেড়ে উঠতে শুরু করায় তাকে শীঘই হামিদার জন্য নিজের আবেগ সংযত করতে অভ্যস্ত হতে হবে। কোনো কারণে যেন অনাগত সন্তানের কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে জয়নাব যখন কথা শেষ করে তার দিকে চোখ তুলে তাকায় সেখানে সমস্যার সম্ভাবনা ফুটে থাকতে দেখা যায় এবং সে সাথে সাথে বুঝতে পারে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে।
জয়নবকে অযথা প্রশ্ন করার জন্য সময় নষ্ট না করে, হুমায়ুন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে দুই তলা নীচে হাওয়া মহলের সাথে সংযোগকারী দরদালানের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে মালদেও এর রাজপুত রমণীদের আবাসন কক্ষের সংলগ্ন কক্ষগুলোতে হামিদা আর অন্যান্যদের থাকবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। হামিদার কক্ষের চন্দনকাঠের দরজার সামনে অবস্থানরত তাঁর নিজস্ব দেহরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের তোয়াক্কা না করে, হুমায়ুন নিজেই দরজার পাল্লা ধাক্কা দিয়ে খুলে এবং ভিতরে প্রবেশ করে।
হুমায়ুন… হামিদা দৌড়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে এবং দুই হাতে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে। হামিদার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে এবং হুমায়ুন তার পরনের ফিনফিনে রেশমের জোব্বার নীচে উত্তেজনায় অস্বাভাবিক গতিতে স্পন্দিত হতে থাকা হামিদার হৃৎপিণ্ডের কম্পন অনুভব করে।
কি ব্যাপার? তোমার বাচ্চার…
হামিদা কোনো কথা না বলে দরজার পাল্লা বন্ধ হয়ে কক্ষে তারা কেবল দুজন না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। হুমায়ুনের কাছ থেকে কয়েক পা পেছনে সরে গিয়ে আলগে রাখার ভঙ্গিতে সে দুহাত দিয়ে নিজের স্ফীত উদর আড়াল করে। আমাদের সন্তান নিরাপদেই আমার কাছে রয়েছে…অন্তত এই মুহূর্তের জন্য হলেও। কিন্তু আমরা যদি সতর্ক না হই তাহলে আমরা সবাই হয়ত শীঘই মারা পড়ব। হামিদার গলার স্বর এতোই নীচু যে প্রায় শোনাই যায় না এবং কথা বলার সময় সে কক্ষের চারদিকে এমন ভঙ্গিতে খুটিয়ে দেখতে থাকে যেন দেয়ালের ঝুলন্ত ঝালরের পেছনে কেউ আঁড়িপেতে রয়েছে তাঁদের কথোপকথন শুনতে।
কি সব আবোল-তাবোল কথা বলছো?
হামিদা পুনরায় হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে আসে। আমি জানতে পেরেছি যে আমাদের আশ্রয়দানকারী এই রাজা মোটেই আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নয়। তিনি সবসময়ে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ফন্দি করছেন। এমনকি তিনি এখনও মরুভূমির দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত একটা দূর্গে আগ্রা থেকে শের শাহের প্রেরিত দূতের সাথে গোপন আলোচনায় মিলিত হতে চলেছেন। সৈন্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাঁর জয়সলমীর যাবার গল্পটা আর কিছুই না আমাদের কাছ থেকে নিজের আসল অভিপ্রায় আড়াল করার একটা ফন্দি।
কিন্তু সে আমার মিত্র এবং আমার নিমন্ত্রাতা এবং যথাযথ সম্মানের সাথেই আমাদের আচরণ করা হয়েছে। গত দুই মাস ধরে আমরা তার মুঠোর ভিতরেই রয়েছি। সে যদি ইচ্ছা করতো তাহলে অসংখ্যবার সে আমাদের হত্যা করতে পারতো… হুমায়ুন এক দৃষ্টিতে হামিদার দিকে তাকিয়ে থাকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে যে গর্ভধারণের কারণে মেয়েটার বিবেচনাবোধ একেবারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে।
রাজার লোভই আমাদের এতোদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে- নিজের পারিশ্রমিকের বিষয়ে তিনি দর কষাকষি করছিলেন। নিজেকে সন্তুষ্ট করতেই যে তার সব দাবী পূরণ করা হবে, তিনি শের শাহের প্রেরিত দূতের সাথে এ বিষয়ে মুখোমুখি আলোচনার জন্য এবার তিনি নিজেই গিয়েছেন। সেখান থেকে ফিরে আসা মাত্রই…নিজে পৌঁছাবার আগে যদি তিনি কোনো বার্তা প্রেরণ করেন তাহলে আরো আগেই…তিনি আমাদের সবাইকে হত্যা করবেনই।
হামিদার মুখ ভয়ে টানটান হয়ে আছে যদিও তার কণ্ঠস্বর সংযত। হুমায়ুন তার হাত ধরে, সেগুলোর মর্মর শীতলতা অনুভব করে।
তুমি এতোসব কি করে জানতে পারলে?
একটা মেয়ে তার নাম সুলতানা রাজার হারেম থেকে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। মেয়েটা আমাদের গোত্রের একজন- কাবুলের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী একজন আফ্রিদি। পানিপথের যুদ্ধে তার আব্বাজান শহীদ হলে, সে তাঁর মায়ের সাথে কাবুলগামী একটা কাফেলায় যোগ দেয় কিন্তু সিন্ধু নদী অতিক্রম করার সময়ে দস্যুরা তাদের আক্রমণ করে। বাজারে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করার জন্য সুলতানাকে অন্যান আরো সব যুবতী মেয়েদের সাথে বন্দি করা হয়। মেয়েটা দেখতে অসাধারণ সুন্দরী। রাজার অনুগত এক অভিজাত ব্যক্তি তাকে কিনে নেয় এবং ভেট হিসাবে মালদেও এর কাছে পাঠিয়ে দেয়।
এই মেয়েটা তোমাকে আর ঠিক কি কি বলেছে?
বলেছে যে মোগলদের প্রতি সে তার অন্তরে বিদ্বেষ পুষে রেখেছে। সে আমাদের একদল বর্বর হানাদার ছাড়া আর কিছুই মনে করে না যাদের হিন্দুস্তানের উপরে কোনো অধিকারই নেই। রাজার মেয়েকে শের শাহর বিয়ে করতে চাওয়ার গল্পটা পুরোপুরি মিথ্যা। আমরা নিশ্চিতভাবেই এখানে আসার জন্য রাস্তায় রয়েছি এই খবরটা পাবার সাথে সাথে, সে আত্মতৃপ্তিতে ঢেকুর তুলতে তুলতে শের শাহকে লিখে পাঠায় যে অচিরেই সে আমাদের তার কর্তৃত্বের বলয়ের ভেতরে পাবে এবং শের শাহর কাছে জানতে চায় আমাদের বিনিময়ে সে তাকে কি দিবে। কিছুদিনের জন্য দুপক্ষের মাঝে কথা চালাচালি বন্ধ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত- সুলতানার ভাষ্য অনুযায়ী দুই দিন আগে মারওয়ার রাজ্যের সীমান্তের নিকটে শের শাহের প্রেরিত প্রতিনিধি এসে উপস্থিত হয় এবং মালদেও এর উদ্দেশ্যে একটা বার্তা প্রেরণ করে শের শাহের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে তাকে অবহিত করে। শের শাহ যা বলেছে… ভয়ঙ্কর সব কথাবার্তা…এই প্রথমবারের মতো হামিদার কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভাঙা ভাঙা শোনায়।
