গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নাগাড়ে ভ্রমণ করার ধকলের পরে, হুমায়ুনের কাছে মরুভূমি আর বিন্দুমাত্র আকর্ষণীয় মনে হয় না। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে জওহরকে আদেশ দেয়- কাশিম, জাহিদ বেগ আর অন্যান্য সেনাপতিদের ডেকে আনতে। খবরটা নিশ্চয়ই মালদেও এর কাছেও পৌঁছেছিল কারণ হুমায়ুনের লোকেরা এসে পৌঁছাবার আগেই, রাজার ভূত্যরা নানা ধরনের ফল, বাদাম আর সোনা এবং রূপার তবক দিয়ে মোড়া মিষ্টি বোঝাই পিতলের অতিকায় ট্রে এবং সোনালী জগে শীতল সরবত নিয়ে উপস্থিত হয়। মালদেও নিজে যখন ব্যক্তিগতভাবে সেখানে এসে উপস্থিত হন তাদের পানাহার তখনও শেষ হয়নি। পাতলুন আর গাঢ় বেগুনী রঙের জোব্বা পরিহিত অবস্থায় আজ তাঁকে গতকালের চেয়ে অনেকবেশী মার্জিত দেখায় এবং তাঁর মেদহীন কোমরে একটা সরু ধাতব শিকল থেকে চামড়ার তৈরী সাধারণ কোষের ভেতরে বাঁকান একটা খঞ্জর ঝুলছে।
সুলতান, আমার বিশ্বাস রাতে আপনার ঘুম ভালোই হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহের চেয়ে অনেক আরামে ঘুমিয়েছি। আসুন, অনুগ্রহ করে আমাদের সাথে কিছু একটা মুখে দেন। হুমায়ুন তাঁর পাশে রেশমের কমলা রঙের তাকিয়ার দিকে তাঁকে ইঙ্গিত করে।
মালদেও আরাম করে বসে এবং তবক মোড়ান একটা খুবানি তুলে মুখে দেয়। শিষ্টতার খাতিরে, হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নেয় যে শের শাহের প্রসঙ্গ উত্থাপনের পূর্বে তার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই সঙ্গত হবে, কিন্তু তাঁর নিমন্ত্ৰাতা দেখা যায় ঠিক অতটা বিনয়ী নন।
আপনি নিশ্চয়ই এই দীর্ঘ আর কষ্টকর সফর আমার সাথে শীতল শরবত পান করার অভিপ্রায়ে করেননি। মালদেও সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। আমাদের বোধহয় রাখঢাক না করে কথা বলা উচিত। আমাদের উভয়েই একই শত্রুর মোকাবেলা করছি। শের শাহকে যদি অবাধে বিচরণের সুযোগ দেয়া হয় তাহলে সে আমাদের দুজনকেই ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। আপনি ইতিমধ্যেই জেনেছেন যে মারওয়ার আক্রমণের হুমকি দিয়ে সে আমাকে চূড়ান্ত অপমান করেছে, কিন্তু তার ছিন্ন মস্তক ধূলোয় পড়ে রয়েছে দেখার অভিপ্রায় আমার মাঝে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরো জোরাল হয়েছে তারই আরো অধিকতর ঔদ্ধত্যের কারণে।
তা কী করে হয়?
আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠাবার ধৃষ্টতা সে প্রদর্শন করেছে। রাজস্থানের ত্রিশজন নৃপতির রক্ত আমার মেয়ের ধমনীতে বইছে- সাধারণ এক ঘোড়ার দালালের চৌর্যবৃত্তিতে সিদ্ধহস্ত সন্তানের হাতে আমার মেয়েকে আমি তুলে দিতে পারি না। মালদেও এর চোখ দুটো সংকীর্ণ হয়ে এসেছে এবং তার কণ্ঠস্বরে বিষ ঝরে পড়ছে।
আমার সাথে খুব অল্প সংখ্যক লোক রয়েছে কিন্তু আপনি যদি আমাকে একটা বাহিনী সংগ্রহ করে দিয়ে, আমার সাথে যুদ্ধে অংশ নেন, অন্যেরা তাহলে অনুসরণ করার জন্য উৎসাহবোধ করবে। মোগলদের মতো আপনার লোকেরাও যোদ্ধার জাত। শেরশাহ আর তাঁর নিকৃষ্টতম সঙ্গীসাথীদের আমরা একসাথে নর্দমায় নিক্ষেপ করতে পারবো। মালদেও, আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- আগ্রায় যখন আমি আবারও সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হব, আপনিই হবেন সর্বাগ্রে পুরষ্কার লাভের অধিকারী।
আমার সাধ্যের ভিতরে রয়েছে এমন সবকিছু আমি করবো- পুরষ্কারের জন্য না বরং আপনার আর আমার নিজের ঐতিহ্যের প্রতি আমার বিশ্বাস আর সম্মান আছে বলে।
মালদেও, আমি জানি সেটা। হুমায়ুন রাজার কাঁধ আকড়ে ধরে এবং তাঁকে বুকে টেনে নেয়।
*
আট সপ্তাহ পরে, হুমায়ুন, রাজা আর তাঁকে নিরাপত্তা দানকারী দেহরক্ষী বাহিনীকে দূর্গের তোরণদ্বার দিয়ে বের হয়ে, রুক্ষ প্রান্তরের উপর দিয়ে জয়সলমীরের মরুশহর অভিমুখে হারিয়ে যেতে দেখে যেখানে পৌঁছে মালদেও শের শাহের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য আরো সৈন্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতে, রাতের মতো দূর্গপ্রাকারে একটা আশ্রয়স্থল খুঁজতে ব্যস্ত রাজার পোষা ময়ুরের কর্কশ ডাকে শীতল বাতাস খানখান হয়ে যায়। ভবিষ্যত সম্পর্কে নিবিষ্ট মনে চিন্তা ভাবনা করার সময় হুমায়ুন অনেক দিন পরে অনেকটাই প্রশান্তি অনুভব করে। মালদেও একজন মনোযোগী আতিথ্যকর্তা। শুভেচ্ছা স্মারক হিসাবে উপঢৌকন প্রদান বা কোনো ধরনের বিনোদনের আয়োজন- উটের দৌড়, হাতির লড়াই বা অগ্নি-ভক্ষণের প্রদর্শনী এবং রাজপুত সামরিক কসরত- ব্যাতীত খুব কম দিনই অতিবাহিত হয়। গতকালই যেমন, তার জন্য একটা কারুকার্যখচিত ঘোড়ার মাথার সাজ আর হামিদার জন্য স্বচ্ছ হলুদাভ বাদামী রঙের অ্যাম্বার পাথরের পুতির একটা হার মালদেও পাঠিয়ে দিয়েছে। মালদেও এর বন্ধুত্বের স্মারক হিসাবে এটা যদিও বেশ স্বস্তিদায়ক কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শের শাহের বিরুদ্ধে অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা রাজা আর সে মিলে প্রায় শেষ করে ফেলেছে। হুমায়ুন শীঘ্রই একটা সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে পুনরায় নিজেকে অধিষ্ঠিত দেখবে।
সুলতান… সে ঘুরে তাকিয়ে দেখে হামিদার এক পরিচারিকা, জয়নব, তার সামনে নতজানু হয়ে রয়েছে। মেয়েটার ছোটখাট মুখাবয়বের ডান পাশটা একটা জরুলের মতো জন্মদাগের কারণে মারাত্মকভাবে কুৎসিত দেখায় এবং মারওয়ার অভিমুখে প্রাণান্তকর যাত্রার সময়ে বেচারীর মা জ্বরে মারা গেলে, মেয়েটার পদাতিক সৈন্য বাবা অন্যান্য সন্তানদের ভরণপোষনের নিমিত্তে মেয়েটাকে নিজের সংস্থান নিজেই করার জন্য পরিত্যাগ করে। হামিদা মেয়েটার দুর্ভাগ্যের কথা শুনে আবেগপ্রবন হয়ে উঠে এবং জয়নবকে নিজের পরিচারকা করে নেয়।
