পরমানন্দ বা হতাশায় নেয়া লাল ছাপচিত্রের উপর থেকে হুমায়ুন তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। সহজাত প্রবৃত্তির বশে, সে অনুভব করে যে একজন স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি যতই নিবেদিত প্রাণ কিংবা পরিস্থিতি যতই ভয়াবহ হোক, একটা মেয়ের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মতো আপন অস্তিত্ব রয়েছে, তার নিজস্ব কিছু বাধ্যবাধকতাও রয়েছে নিজের প্রতি, যদি সে মা হয় তবে তাঁর সন্তানের প্রতি, এবং তার চারপাশে যারা রয়েছে। খানজাদার অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা যায় যে এমন পরিস্থিতিতে একটা অদম্য সত্ত্বা টিকে থাকতে এবং সেই পরিস্থিতি থেকে, হয়তো। অক্ষত অবস্থায় না কিন্তু আত্মার বলে আরো বলীয়ান হয়ে, বের হয়ে আসতে পারে। তার যদি এখন মৃত্যু হয় তাহলে হামিদা আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হচ্ছে এমন ভাবনাই তার রক্তকে শীতল করে তোলে। রাজপুতরা হিন্দু হিসাবে পুনরুত্থানে বিশ্বাস করে এবং সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করার অর্থই হল আরো উঁচু মর্যাদা নিয়ে পুনরায় ভূমিষ্ঠ হওয়া, যেখানে সে বিশ্বাস করে যে প্রত্যেক মানুষ একবারই জন্ম। গ্রহণ করবে, তাই প্রত্যেকের উচিত সেই জীবনের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, এটাই সম্ভবত আচরনগদ ভিন্নতার মূল কারণ।
তাদের ঠিক সামনে নাক বরাবর, নতুন পর্দা দিয়ে আবৃত দেয়ালের ঠিক মধ্যেখানে ছয়ফুট প্রশস্ত একটা গলি দেখা যায় যার ঠিক মাঝবরাবর প্রায় সমকোণী একটা বাঁক রয়েছে বিপুল সংখ্যায় শত্রুপক্ষের সৈন্যদের ধেয়ে আসা প্রতিরোধ করতেই এমনটা করা হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গলিটা গিয়ে কুচকাওয়াজের জন্য ব্যবহৃত একটা বিশাল মাঠে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে এখন একদল রণহস্তী অনুশীলন করছে। মাঠের বিপরীত দিকেও আরেকপ্রস্থ দেয়াল দেখা যায়, এরও ঠিক মধ্যে একটা সরু গলিপথ আছে। মোগল দূর্গের নক্সা থেকে একেবারে আলাদা এইসব সমকেন্দ্রিক দেয়াল, হুমায়ুনকে কাবুলের বাজারে কাশগর থেকে আগত ঢুলু ঢুলু চোখের বণিকদের বিক্রি করা জটিল বাক্সের ভিতরে অবস্থিত বাক্সের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
দেয়ালের এই তৃতীয় সারিটাই কিন্তু শেষ বাঁধা। আগের মতো একই ধরনের গলিপথ দিয়ে এগিয়ে যেতে হুমায়ুন চতুষ্কোণাকৃতি একটা বিশাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়- এটাই মালদেও দূর্গের কেন্দ্রস্থল। প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে একটা বিশাল প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে, সৌন্দর্যের চেয়ে যার দুর্ভেদ্যতার দিকেই বেশী লক্ষ্য করা হয়েছে। প্রাসাদটার বর্হিভাগের দেয়ালে খিলানযুক্ত ছোট ছোট জানালা যত্রতত্র ইচ্ছামতো যেন কেউ বসিয়ে দিয়েছে, ফলে বাইরে থেকে দেখে কারো পক্ষে অনুমান করাটা অসম্ভব ভবনটা কত তলা। প্রাসাদের একদিকে একটা চওড়া, মজবুত দর্শন মিনার রয়েছে- যার শীর্ষভাগে রয়েছে পাথরের তৈরী একটা অভিজাত রুচিশীল কক্ষ।
হুমায়ুন তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে। তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য এখানে তার নিমন্ত্রাতার অবস্থান করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই উচ্চনাদে অদৃশ্য এক তূর্যবাদকের তৃর্যধ্বনি ভেসে আসে এবং প্রাসাদের কারুকার্যময় সিংহদ্বার দিয়ে কমলা আলখাল্লা পরিহিত রাজপুত যোদ্ধারা সারিবদ্ধভাবে বের হয়ে আসে এবং হুমায়ুনের দুই পাশে দুটো সারিতে সাবলীল দক্ষতায় বিন্যস্ত হয়। যোদ্ধাদলের ঠিক পেছনেই দীর্ঘদেহী, শক্তিশালী দর্শন একটা লোককে দেখা যায়, পরনে পরিকরযুক্ত কমলা আলখাল্লা যার প্রান্তদেশ রাজকীয় মহিমায় মাটি ছুঁয়ে রয়েছে, মাথার হীরকশোভিত সোনার জরির কারুকাজ করা কাপড়ের পাগড়ির নীচে কালো চুল টানটান করে বাঁধা, রাজা মালদেও। দুহাত বুকের উপরে স্থাপন করে, তিনি হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে আসেন এবং মাথা নত করে অভিবাদন। জানান।
সম্রাটের জয় হোক। মারওয়ারে আপনাকে স্বাগত জানাই।
রাজা মালদেও, আপনার আতিথিয়তার জন্য আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।
আমাদের রাজপুত প্রথা অনুযায়ী আমার পরিবারের রাজমহিষীদের আবাসন কক্ষের পাশেই আপনার সাথে আগত মোগল রাজবংশের রমণীদের আবাসন কক্ষের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আপনি আর আপনার সাথে আগত অমাত্যবৃন্দ এবং সেনাপতিদের জন্য হাওয়া মহলে কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। মালদেও মিনারের দিকে ইশারা করে। আপনার কক্ষটা মিনারের একেবারে শীর্ষদেশে অবস্থিত যেখানে চারপাশ থেকে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।
আমি আবার একবার আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আর মালদেও আগামীকাল আমরা আলোচনায় বসবো।
অবশ্যই।
*
পরের দিন নরম গদিঅলা বিছানার চারপাশে মিহি তাঁর দিয়ে তৈরী পর্দার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত উষ্ণ বাতাসের একটা আমেজ অনুভব করতে হুমায়ুন ঘুম থেকে জেগে উঠে, গত রাতে পরিশ্রান্ত অবস্থায় যেখানে স্বপ্নহীন এক দীর্ঘ সুপ্তিতে তাঁর দেহ ভেঙে পড়েছিল। কয়েক মুহূর্ত সে নিথর হয়ে সেখানেই শুয়ে থাকে, নিজের পরিবার আর তার অনুগত লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ে আনতে পারার কারণে স্বস্তি আর সন্তুষ্টিবোধের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে। তারা সবাই কিছুক্ষণের জন্য হলেও অন্তত বিশ্রাম নিতে পারবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হামিদা তার প্রয়োজনীয় সেবা আর বিশ্রাম পাবে। হুমায়ুন উঠে বসে এবং বাইরের প্রশস্ত বারান্দায় বের হয়ে এসে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বরাবর যা নীচের বালুকাময় সমভূমিতে নিজের আপন বোনর সাথে বিশ্বাসঘাতকও, একেবারে সরাসরি নেমে গিয়েছে নিজের তাকিয়ে থাকতে থাকতে, সূর্য আকাশে অবশ্য অনেকটা উঁচুতে নেমে আসতে এবং ভবনগুলো মেখগুলো নিথর দাঁড়িয়ে থাকে। সূর্যকে, ইতিমধ্যে বেশ অনেকটা উপরে উঠে গিয়েছে, দেখে মনে হয় প্রান্তের দিকটা লাল রঙে রঞ্জিত হয়ে রয়েছে, অনেকটা রক্তাক্ত কমলার আঁশের মতো দেখায়।
