সেই রাতে, সূর্যাস্তের পরে আকাশের কমলাভ-গোলাপী আভার নীচে, হুমায়ুন তাঁর অবশিষ্ট সৈন্যদলের অগ্রভাগে অবস্থান করে মারওয়ারের আঁকাবাঁকা সড়ক দিয়ে শহরের বসতির পেছনের খাড়াভাবে উঠে যাওয়া উচ্চভূমির শীর্ষে অবস্থিত রাজা মালদেও-এর বিশাল দূর্গপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে যায়। বনের শেষভাগ, মাটির বাড়ি আর শিলাস্তরের মধ্যবর্তীস্থানে- যা দেখে মনে হয় সেটা সম্ভবত দেড়শ ফিট উঁচু হবে একটা উন্মুক্ত প্রান্তর রয়েছে যার ডানপাশ দিয়ে একটা শীর্ণকায়া ঝর্ণা বয়ে চলেছে। ঝর্ণা অতিক্রম করে খানিকটা দূরে সারি সারি তাবু আর জ্বালাবার জন্য তৈরী অবস্থায় কাঠ স্তূপ করে রাখা।
সুলতান, আপনার লোকদের বিশ্রামের জন্য নির্মিত ছাউনি, রাজপুত সেনাপতি বিনয়ের সাথে বলে।
হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে না থামিয়ে শিলাস্তরের পাদদেশে অবস্থিত একটা তোরণাকৃতি প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে যায়। হুমায়ুন তাঁর দেহরক্ষী, বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি, অমাত্যবৃন্দ আর রাজ পরিবারের মহিলাদের নিয়ে তোরণদ্বারের নীচ দিয়ে অতিক্রম করার সময় অন্তরাল থেকে অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে জয়ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজ তাঁদের স্বাগত জানায়। তোরণের অপর পার্শ্বে, খাড়া কিন্তু প্রশস্ত একটা পথ বামদিকে তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিয়ে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে এবং পাথরের প্রাকৃতিক বাঁক অনুসরণ করে শিলাস্তরের উপরের দিকে উঠে যায়। হুমায়ুনের ক্লান্ত ঘোড়াটা, নাক দিয়ে ফেস-ফোঁস শব্দ করে, ঢালু পথ বেয়ে মন্থর গতিতে উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করে একটা প্রশস্ত পাথুরে মালভূমির শীর্ষভাগে এসে হাজির হয়। তাঁর সামনে এখন কামানের গোলা নিক্ষেপের জন্য ছিদ্র বিশিষ্ট প্রাকারের একটা বেষ্টনী যা শিলাস্তরের উপরিভাগের প্রায় পুরোটাই ঘিরে রেখেছে। একটা দ্বিতল তোরণগৃহের ভিতর দিয়েই অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যায় হুমায়ুন দেখে প্রাকারের সারি পেছনদিকেও প্রসারিত।
তোরণগৃহটা, সরদলের উপরে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠা ঘোড়ায় উপবিষ্ট এক রাজপুত যোদ্ধার অবয়ব খোদাই করা রয়েছে, দেখতে বেশ প্রাচীন উত্তোলিত ধাতব নিরাপত্তা বেষ্টনীর নিচ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করার সময় হুমায়ুন ভাবে, আগ্রা দূর্গ বা এমনকি কাবুলের দূর্গপ্রাসাদের চেয়েও অনেক প্রাচীন। এই তোরণের নীচে দিয়ে রাজপুত যোদ্ধাদের কতগুলো প্রজন্ম ঘোড়া নিয়ে দুলকি চালে ছুটে বের হয়েছে এবং নিজেদের যোদ্ধা সংহিতার প্রবর্ধনে পাহাড়ের ঢালু পথ দিয়ে নীচের দিকে ছুটে গিয়েছে যুদ্ধের তুলিতে ধ্বংসের চিত্রকল্প নির্মাণে? হিন্দুস্তানের তাবদ অধিবাসীদের ভিতরে এই রাজপুত গোত্রগুলো সত্যিই মোগলদের সাথে অনেক বেশী ঘনিষ্ঠ একটা যোদ্ধা জাতি যাদের কাছে মায়ের বুকের উষ্ণ দুধে শিশুর অধিকারের মতোই যুদ্ধ, সম্মান, গৌরব, বিজয় তাদের একটা স্বতসিদ্ধ অধিকার। কিন্তু তার কৌতূহলী চোখে তখনই এমন কিছু একটা ধরা পড়ে যা সে ঠিক পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না। তোরণগৃহের দুপাশে ভেতরের দিকে প্রসারিত দেয়ালের উপরে রক্ত-রঞ্জিত ছোট ছোট হাতের পাঞ্জার ধারাবাহিক ছাপ রয়েছে।
ঔই ছাপগুলো কি?
রাজপুত সেনাপতির উত্তর শুনে হুমায়ুনের মনে হয় পরানের গহীন থেকে উঠে আসা গর্ব তার কণ্ঠে খেলা করছে। মারওয়ারের রাজপরিবারের মহিলারা নিজের মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় বরণ করতে এগিয়ে যাবার সময় হাতের এই ছাপগুলো রেখে গিয়েছে। একজন রাজপূত রমণীর স্বামী যখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয় বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যুবরণ করে তখন সেই রমণীর দায়িত্ব জীবনের স্পন্দনে নিজের অধিকার পরিত্যাগ করা এবং স্বামীর অন্তেষ্টিক্রিয়ার চিতায় তার সাথে মিলিত হওয়া। আগুনের সর্বগ্রাসী শিখার চাদরে নিজেকে আবৃত করার পূর্বে সেইসব রমণীদের জীবিত অবস্থায় শেষ কর্মকাণ্ড এই চিহ্নগুলো যা আপনি এখানে দেখছেন।
হুমায়ুন এরকম গল্প আগেও শুনেছে। বাবর তাকে বলেছিলেন যে তাঁর হিন্দু প্রজারা এই লোকাঁচারকে সতী বলে এবং অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় যে মেয়েরা মোটেই ব্যাপারটায় উৎসাহী নয়। বাবর এক কিশোরী বিধবাকে বড়জোর যযাল বছর বয়স হবে মেয়েটার দেখেছিল, তেলে চুপচুপে করে ভিজিয়ে আক্ষরিক অর্থেই তাকে আগুনের ভিতরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার আগে মরীয়া হয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে। মেয়েটার মরণ চিৎকারের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না এবং বাবরের লোকেরা ব্যাপারটায় হস্তক্ষেপ করার আগেই বেচারী আগুনে পুড়ে মারা যায়।
হুমায়ুনের মনের ভাবনা যেন লোকটা বুঝতে পারছে এমন ভঙ্গিতে রাজপুত সেনাপতি কথা বলতে থাকে, আমাদের মেয়েদের জন্য এটা অতীব সম্মানের বিষয়…এবং আমরা যদি কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে এমন শোচনীয় পরাজয়বরণ করি যে শত্রুর হাতে আমাদের মেয়েদের নিগৃহিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে, সবচেয়ে বয়স্ক। রাজপুত রাজকুমারী পুরোভাগে থেকে অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সাথে নিয়ে তারা প্রত্যেকে তখন বিয়ের অনুষ্ঠানের উপযোগী জাঁকালো পোষাক আর সেরা অলঙ্কার সজ্জিত-জহরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যায়। বিশাল একটা অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করা হয় এবং মর্যাদাহানির মুখোমুখি হবার চেয়ে তারা হাসিমুখে আগুনের কুণ্ডে লাফিয়ে পড়ে। চমকপ্রদ একটা দৃশ্যকল্প যেন তাঁর চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছে এমন ভঙ্গিতে লোকটা হাসতে থাকে।
