হুমায়ুন এখন সৈন্যসারির পেছনে অবস্থানরত হামিদা এবং অন্যান্য মহিলাদের কথা ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠে। সে তার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, গরম বালুর উপর দিয়ে দুলকি চালে ঘোড়া ছোটায় কিন্তু তার নিয়োজিত প্রহরীদের দ্বারা সুরক্ষিত অবস্থায় তারা তখনও শ্লথ কিন্তু সুশৃঙ্খল ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে দেখে স্বস্তির শ্বাস নেয়। সৈন্যসারির অনেক পেছনে তারা অবস্থান করার কারণে আকষ্মিক বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে যেতে পেরেছে। হামিদার পালকির দিকে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে সে ভিতরে উঁকি দেয়। পালকির ভিতরের আলো-আধারিতে তাঁর দীপ্তিমান হাসি দেখে হুমায়ুন বুঝতে পারে চিন্তার কিছু নেই এবং সে অনেক স্বাভাবিক হয়ে উঠে।
শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় লাগে কিন্তু ততক্ষণে পানির কাছে অন্যদের আগে পৌঁছাবার তাগিদের কাছে পরাস্ত হয়ে কিংবা হুড়োহুড়ির ভিতরে থেঁতলে গিয়ে ছয়জন লোক মারা গিয়েছে। অন্যেরা পানি খেয়ে পেট ঢোল করে এখন মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে আর পরিত্রাণ পাবার জন্য চিৎকার করছে। কয়েকজনের বমির সাথে পানি আর পিত্ত উঠছে আর তারা প্রলাপ বকতে শুরু করেছে। নরকের কোনো দৃশ্য যেন পৃথিবীর বুকে অভিনীত হচ্ছে এবং হুমায়ুন মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। হুমায়ুন আর তার সাথের ছোট বাহিনীটা বিপর্যয়ের কোনো অতলে পতিত হয়েছে জানার জন্য তার শত্রু শেরশাহ অনেক দূরে অবস্থান করায় সে মনে মনে ভাগ্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
তিনদিন পরে ধুসর দিগন্তের আড়াল ছিন্ন করে একটা উঁচু, পাথুরে শিলাস্তরের এবড়ো থেবড়ো অবয়ব দৃশ্যমান হলে তাঁর মনোবল পুনরায় চাঙ্গা হয়ে উঠে। শিলাস্তরের চূড়ায়, ঈগলের বাসার মতো একটা দূর্গ শোভা পাচ্ছে- মারওয়ারের রাজার দুর্ভেদ্য দূর্গ। দূর্গটা এখনও অবশ্য পনের কি বিশ মাইল দূরে রয়েছে। হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, শীঘ্রই সে হামিদা, খানজাদা আর গুলবদনকে দূর্গপ্রাকারের নিরাপত্তার ভিতরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। মরুভূমির উপর দিয়ে তাদের বিপদসঙ্কুল যাত্রা শেষে পুনরায় নিরাপত্তা আর স্থিরতার মাঝে প্রীতিকর প্রত্যাবর্তন। মালদেওকে তার শুভেচ্ছা জানিয়ে সে তখনই একজন গুপ্তদূতকে প্রেরণ করে।
গুপ্তদূত পরের দিনই কমলা রঙের আলখাল্লা আর ইস্পাতের বর্ম পরিহিত অবস্থায়, তাদের সাজসজ্জার সাথে মাননসই কালো স্ট্যালিয়নে দর্শনীয়ভঙ্গিতে উপবিষ্ট রাজার চৌকষ প্রহরীদের একটা দলকে নিয়ে ফিরে আসলে দেখা যায়, হুমায়ুন যা আন্দাজ করেছিল কার্যত দূরত্ব তারচেয়ে অনেক কম। যোদ্ধাদের মাথার ঢেউ খেলান লম্বা চুল অনেকটা মেয়েদের মতো করে তাদের মাথার উপরে খোঁপা করে বাঁধা বটে কিন্তু চকচকে ফলার বর্শা বহনকারী বাজপাখির মতো নাকবিশিষ্ট, ছিপছিপে, পেষল দেহের এই লোকগুলোর মাঝে মেয়েলী কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।
কাশিম আর জাহিদ বেগকে দুপাশে নিয়ে হুমায়ুন ঘোড়ায় উপবিষ্ট অবস্থায় সামনের দিকে এগিয়ে যায়। রাজপূত দলপতি ছোঁড়া নেমে নেমে এসে হুমায়ুনের সামনে নতজানু হয়ে গরম বালুতে অল্পক্ষণের জন্য নিজের কপাল স্থাপন করে। সুলতান, মারওয়ারের রাজা, মহামান্য মালদেও আপনাকে তাঁর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি অনেকদিন থেকেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন এবং আপনার যাত্রাপথের শেষ কিছু মাইলগুলোতে রক্ষীবাহিনী হিসাবে আপনার সঙ্গী হতে আমাকে আর আমার অধীনস্থ লোকদের পাঠিয়েছেন।
রাজা মালদেওর এই আন্তরিকতার জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা যত দ্রুত মারওয়ার পৌঁছাতে পারব ততই মঙ্গল- আমার লোকেরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
অবশ্যই, সুলতান। আমরা যদি এখনই যাত্রা করি তবে সূর্যাস্ত নাগাদ আমরা দূর্গে পৌঁছে যাব সেখানে আমার প্রভু আপনি আর আপনার সহযাত্রীদের জন্য বিশ্রামের বন্দোবস্ত করেছেন।
রাজপুত যোদ্ধারা তাঁদের লোকদের কাছে ফিরে যাবার সময় হুমায়ুন তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে, সে মনে মনে ভাবে তার সঙ্গের এই হতশ্রী সেনাবাহিনী কেমন ছাপ ফেলতে পেরেছে। তাঁদের সম্পর্কে অজ্ঞ এমন একজন লোক তার বাহিনীকে এই অবস্থায় দেখলে মোটেই তাদের গর্বিত মোগল বাহিনী বলে ভাববে না বরং পরিশ্রান্ত ঘোড়ায় উপবিষ্ট অপরিচ্ছন্ন একদল লোক, তাঁদের পর্যাণে একটা সময় যেসব উজ্জ্বল ফলাবিশিষ্ট শস্ত্র শোভা পেত তরবারি আর দো-ধারি রণকুঠার- সেগুলো এখন বহুব্যবহারে কার্যকারিতা হারিয়েছে। মরুভূমির গরমে তার লোকদের ভেতরে অনেকেই বৃত্তাকার ধাতব আস্তরণযুক্ত ঢাল ফেলে দিয়েছে বহন না করে এবং তাদের তূণের তীর প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মরুভূমির ভিতর দিয়ে অতিক্রম করার কারণে ভালো কাঠ খুঁজে বের করে তীর তৈরী করার কোনো সুযোগ বা সময় তারা পায়নি। হুমায়ুনের তবকিদের দেখে কেবল মনে হয়- জাহিদ বেগের দ্বারা নিপূণভাবে প্রশিক্ষিত- যে তারা কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু সে যদি একবার কেবল মারওয়ার পৌঁছাতে পারে তাহলে এসব কিছুই বদলে যাবে। তার কাছে এখন বেশ কিছু অর্থসম্পদ রয়েছে যা দিয়ে সে তার সঙ্গের লোকদের পুনরায় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করতে এমনকি নতুন লোক নিয়োগ করতেও পারবে, এবং মারওয়ারের রাজা স্বয়ং তাঁকে লোক সরবরাহ করবে।
