এই মুহূর্তে অবশ্য তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম পানির স্বল্পতা, তাঁর আধিকারিকেরা এখন সতর্কতার সাথে পানির সংবিভাগ তদারক করছে। তিন রাত্রি আগে, তাঁর দুজন লোক পানির বদলে কড়া মদ পান করেছিল। তারপরে, তাঁদের তৃষ্ণা মাত্রা ছাড়াতে এবং নিজেদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে পড়লে, পুতিগন্ধময় কয়েক টোক পানি অবশিষ্ট আছে এমন একটা মশকের দখল নিয়ে নিজেদের ভিতরে লড়াই শুরু করে, যার ফলে একজনের মৃত্যু হয় অপর মাতালের খঞ্জরের আঘাত নিজের গলায় ধারণ করায়। হুমায়ুন বেঁচে যাওয়া অপর সৌভাগ্যবানকে তখনই কবন্ধ করার আদেশ দেয় কিন্তু দণ্ডাদেশ প্রত্যক্ষ করতে সমবেত হওয়া সৈন্যদের চোখে সে চাপাক্রোধ ধিকিধিকি করে জ্বলতে দেখে। মরুভূমির হানাদারদের যেকোনো আক্রমণের মতোই বিশৃঙ্খলা আর অবাধ্যতাও সমান বিপজ্জনক…
তার নিজের ঘোড়াও রীতিমতো ধুকছে। বেচারীর গায়ে একটা সময় ছিল যখন সেটা চকচক করতো, এখন কেবল শুকনো ঘামের দাগ আর বালি জমে রয়েছে এবং ঘনঘন হোঁচট খাচ্ছে। হুমায়ুন ভ্রূ কুচকে ঘোড়াটার চারপাশে পায়চারি করে। সূর্যের কমলা রঙের গোলকটা থেকে বিচ্ছুরিত অসহনীয় আলোর তীব্রতা চারপাশের ভূপ্রকৃতিকে মৃতবৎ করে রেখেছে, বালিয়াড়ির সারিগুলোকে চেটালো করে তুলেছে এবং সবকিছুকে চোখে জ্বলুনি ধরান একঘেয়েমী আর হতোদ্যম করে তুলেছে যে কিছুই আগ্রহী সৃষ্টি করা বা মনোবল তাজা করে না। ঘোড়াটাকে কিছুক্ষণের জন্য একটু বিশ্রাম দিতে হুমায়ুন মাটিতে নেমে পড়ে এবং বামহাতে ঘোড়ার লাগামটা ধরে বিশ্বস্ত প্রাণীটার পাশে পাশে হাঁটতে থাকে।
হুমায়ুন সহসা সামনে কোথাও থেকে ভেসে আসা একটা বিশৃঙ্খলার শব্দ শুনতে পায়। তিন কি চারশ গজ দূরে সৈন্যসারির সম্মুখভাগে কি ঘটেছে দেখতে চোখের উপরে হাত দিয়ে একটা আড়াল তৈরী করে কিন্তু সূর্যের দাবদাহের কারণে কিছুই বোঝা যায় না। ওখানে কি ঘটেছে দেখে এসো, সে চিৎকার করে জওহরকে আদেশ দেয়। কিন্তু জওহর তাঁর বাহন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার আগেই তাদের চারপাশে মানুষ আর প্রাণীর একটা সম্মিলিত ঊর্ধ্বশ্বাস ধাবন শুরু হয়। ভারবাহী প্রাণীগুলো এতক্ষণ যারা নির্জীবভঙ্গিতে পেছন পেছন অনুসরণ করে আসছিলো, সহসা তারা উন্মত্তের মতো তাদের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যায়,নাক বরাবর দাবড়ে যাবার সময় তারা বালুকে কোনোরকম প্রতিবন্ধক হিসাবে গ্রাহ্য করে না। হুমায়ুন বুঝতে পারে, প্রাণীগুলো নিশ্চিতভাবে পানির গন্ধ পেয়েছে এবং তাঁর আত্মা ধক করে উঠে।
সে তার ঘোড়ার পিঠে পুনরায় আরোহন করে, প্রাণীটা উত্তেজনায় এখন চিহি রব করছে, সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সে নিজের হাতে হামিদার জন্য এক পেয়ালা শীতল পানি নিয়ে আসবে। কিন্তু সে যতই কাছাকাছি পৌঁছে, তার চোখে বিশৃঙ্খলা ধরা পড়তে থাকে। প্রথমেতো উন্মত্তের মতো হুড়োহুড়ি করতে থাকা এতগুলো দেহের ভীড়ে- মানুষ আর প্রাণী নির্বিশেষে বোঝাই যায় না ধুলো মলিন কয়েকটা গাট্টাগোট্টা খেজুর গাছের আড়ালে আসলে ঠিক কি ঘটেছে। তারপরে সে কয়েকটা উঁচু হয়ে থাকা মাটির দেয়ালের পার্শ্বভাগ দেখতে পায় যা দেখতে অনেকটা ছোটখাট একটা কুয়োর সমষ্টি বলে প্রতিয়মান হয় এবং একপাশে একটা ঝর্ণা থেকে পানির ধারা নুড়িপাথরের উপর দিয়ে একটা ছোট স্রোতধারা হয়ে গড়িয়ে এসে বালিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। কুয়ো থেকে ভোলা পানি ভর্তি মশকের দখল নিতে তার লোকেরা ইতিমধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু করে মূল্যবান পানি অপচয় করছে।
ভারবাহী প্রাণীগুলো যাদের যত্ন নেয়া তাদের উচিত ছিলো সেগুলোও এখন কেমন খাপছাড়া আচরণ করছে। উটের বহর থুতু ছিটাচ্ছে এবং উন্মত্তের ন্যায় পা। দিয়ে লাথি ছুড়ছে। একটা লোকের পেটে এতো জোরে লাথি লাগে যে বেচারা বালিতে ছিটকে পড়ে এবং নিমেষের ভিতরে ধাবমান পায়ের নীচে পদদলিত হয়ে থেঁতলে যায়। হুমায়ুন তাঁর মাথাটা গুঁড়িয়ে যেতে দেখে, গা গুলিয়ে উঠা একটা দৃশ্যের অবতারণা করে মগজ আর রক্ত মরুভূমির বালুতে ছিটকে গেলে সাথে সাথে তার বাহিনীর সাথে আগত কুকুরের পাল হামলে পড়ে সেটা চাটতে আরম্ভ করে। ভারবাহী খচ্চরের পাল ঝর্ণার কাছে দ্রুত পৌঁছাতে, তাঁদের পিঠের বোঝার কথা ধর্তব্যে ভিতরে না এনে, সবাই তাঁদের বীভৎস হলুদ দাঁত বের করে এবং একে অপরকে কামড়াতে চেষ্টা করে, সবাই একসাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকে।
হুমায়ুন ক্রোধে আত্মহারা হয়ে পড়ে। তাঁর আধিকারিকেরা কি ভেবেছে…? শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার সংকল্প নিয়ে সে যখন ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে গিয়ে, সে দেখে উন্মত্ত, বিশৃঙ্খল মানুষের ভীড়ের ভিতরে সাধারণ লোকদের সাথে তাঁর আধিকারিকেরাও রয়েছে। সে চিৎকার করে তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেষ্টা করে কিন্তু তাঁরা পাত্তাও দেয় না। মাথার উপরে আলমগীর আন্দোলিত করতে করতে সে বল প্রয়োগ করে জটলার আরো ভিতরে প্রবেশ করে এবং চিৎকার করে তিরস্কারের তুবড়ি ফোঁটাতে থাকলে অবশেষে সে নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে সক্ষম হয়। লজ্জিত-মুখে তার আধিকারিকেরা পানির জন্য নিজেদের ভিতরে লড়াই বন্ধ করে এবং নিজেদের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শুরু করে।
